কলকাতার নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পাশের ১৩৬ বছরের পুরোনো বাঁকড়া এয়ারপোর্ট মসজিদে নামায আদায় সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা শুধু একটি ধর্মীয় স্থাপনায় প্রবেশাধিকার সীমিত করার প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার উপলক্ষও বটে। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিক বিমান নিরাপত্তা বিধি, রানওয়ের নিরাপত্তা এবং সিআইএসএফের আপত্তিকে সামনে এনে মসজিদটি স্থানান্তরের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছে। নিরাপত্তা অবশ্যই রাষ্ট্রের বৈধ দায়িত্ব। কিন্তু একটি ঐতিহাসিক উপাসনালয়ের প্রবেশপথ পূর্বঘোষণা ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া, বিকল্প ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা এবং সংশ্লিষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে আস্থাপূর্ণ সমাধানে পৌঁছাতে ব্যর্থ হওয়া প্রশাসনিক সংবেদনশীলতার ঘাটতিকেই প্রকাশ করে।

এ ঘটনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। গৌরীপুর জামে মসজিদ নামে পরিচিত এ মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৯০ সালে, অর্থাৎ কলকাতা বিমানবন্দর নির্মাণের বহু আগে। ইতিহাসের বিচারে বিমানবন্দর এসেছে পরে, মসজিদ ছিল আগে। সে কারণে প্রশ্ন উঠতেই পারে, দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বিদ্যমান একটি ধর্মীয় স্থাপনা হঠাৎ করে এমন সংকটের মুখে কেন পড়ল? যদি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদ-ের সঙ্গে এর অবস্থান সাংঘর্ষিক হয়ে থাকে, তবে প্রশাসনের দায়িত্ব ছিল বহু আগেই সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে স্বচ্ছ, সম্মানজনক ও গ্রহণযোগ্য সমাধান নিশ্চিত করা। কোনো ধর্মীয় স্থাপনার দরজা হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া কখনোই আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করে না।

পশ্চিমবঙ্গ দীর্ঘদিন ধরে ভারতের ধর্মীয় সহাবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে পরিচিত ছিল। বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি এবং বহুত্ববাদী সামাজিক ঐতিহ্য এই রাজ্যের রাজনৈতিক পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু গত এক দশকে সে চিত্রে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। জাতীয় রাজনীতিতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির উত্থানের প্রভাব পশ্চিমবঙ্গেও ক্রমশ গভীর হয়েছে। ধর্মীয় মেরুকরণ, নির্বাচনী প্রচারণায় সাম্প্রদায়িক ভাষার ব্যবহার, মুসলিম জনগোষ্ঠীকে ঘিরে সন্দেহ ও বিভাজনের রাজনীতি এবং সংখ্যালঘু পরিচয়কে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে, সর্বশেষ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় আসা এবং মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীসহ বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের মুসলিম বিরোধী একাধিক বক্তব্য ও অবস্থানের কারণে মুসলিমদের জন্য অনেক বেশি শংকা তৈরি হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলোকেও অনেক সময় সাধারণ মানুষ নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতার আলোকে বিচার করছেন।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনমনে আস্থার সংকট। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ বলছে, মসজিদের জন্য বিকল্প জায়গা দেওয়া হবে এবং স্থানান্তর নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। যদি তা-ই হয়ে থাকে, তবে প্রশ্ন হলো, আলোচনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই কেন মুসল্লিদের প্রবেশের পথ বন্ধ করা হলো? কেন আগাম নোটিশ দেওয়া হলো না? কেন এমন একটি পদক্ষেপ নেওয়া হলো, যা স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে? প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বৈধতা শুধু আইনি ভিত্তির ওপর নির্ভর করে না; তা নির্ভর করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা, অংশীজনের সঙ্গে যোগাযোগ এবং মানবিক আচরণের ওপরও।

ভারতের সংবিধান ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দিয়েছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং নাগরিকের ধর্মীয় অধিকার, উভয়ই সাংবিধানিক মূল্যবোধের অংশ। একটিকে রক্ষা করতে গিয়ে অন্যটিকে অযথা ক্ষুণœ করা হলে গণতান্ত্রিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। নিরাপত্তাজনিত কারণে যদি সত্যিই মসজিদটি স্থানান্তর অপরিহার্য হয়, তবে তা অবশ্যই হতে হবে সংশ্লিষ্ট মুসলিম সম্প্রদায়ের সম্মতি, মর্যাদা এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি পূর্ণ সম্মান রেখে। বিকল্প স্থাপনা নির্মাণ, নিরবচ্ছিন্নভাবে নামাজ আদায়ের ব্যবস্থা এবং স্বচ্ছ সময়সূচি নিশ্চিত না করে কেবল প্রবেশপথ বন্ধ করে দেওয়া একটি অপ্রয়োজনীয় সংকট সৃষ্টি করেছে। ধর্মীয় সম্প্রীতি কেবল আইন দিয়ে রক্ষা করা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ আচরণ, রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্বশীল ভাষা এবং প্রশাসনের সংবেদনশীলতা। পশ্চিমবঙ্গে বহু শতাব্দী ধরে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষেরা বসবাস করে আসছেন। সেই ঐতিহ্য ক্ষুণœ হওয়ার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। একটি ঐতিহাসিক মসজিদকে ঘিরে সৃষ্ট এই সংকট দ্রুত, ন্যায়সঙ্গত ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে সমাধান করা এখন শুধু প্রশাসনিক প্রয়োজন নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত।