বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতি লক্ষ্য করে কেউ কেউ বলছেন, আমরা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই আছি। মাঝে মাঝে যতি টানা হলেও যুদ্ধ তো থামছে না। বিষয়টা কি আসলেই তা-ই, অর্থাৎ আমরা কি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যেই আছি? ট্রাম্প যখন বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি শেষ’ তখন তো তেমনটাই মনে হয়। আরো বড় ব্যাপার হলো, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় কারো প্রতি কারো আস্থা নেই। ‘হাসি-খুশি বৈঠকের’ পরও পরাশক্তি বলয়ের দাম্ভিক নেতাদের দেখা যায় মারণাস্ত্রে শান দিতে। মারণাস্ত্র প্রতিযোগিতা বেড়েই চলেছে। আস্থার এমন সংকটের কারণ নৈতিক-দুর্ভিক্ষ। মানুষ হিসেবে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য এই বিষয়টি সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় নৈতিকতাকে যেন নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে। এর জায়গা দখল করেছে চাতুর্য ও নৃশংসতা। এমন ব্যবস্থা আমাদের উপহার দিচ্ছে-আস্থার সংকট, নব নব মারণাস্ত্র এবং যুদ্ধ ও ধ্বংস।
তেহরান থেকে বার্তাসংস্থা এএফপি জানায়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আবার পাল্টাপাল্টি হামলার পর তৈরি হয়েছে নতুন উত্তেজনা। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার হুমকি দিয়ে বলেছেন, তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে এতদিন ধরে চলা যুদ্ধ বিরতি ‘শেষ হয়ে গেছে’। আর যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লংঘনের অভিযোগ তুলে ইরান বলছে, এ উত্তেজনার দায় ওয়াশিংটনের। গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ইরানে একযোগে ৮০টির বেশি নিশানায় হামলা চালায় মার্কিন সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, হরমুজ প্রণালিতে অন্তত তিনটি তেলবাহী ট্যাংকারে ইরানের হামলার জবাবে এ হামলা চালিয়েছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর একে যুদ্ধবিরতির ‘গুরুতর লংঘন’ আখ্যা দিয়ে ‘বিধ্বংসী জবাবের’ হুমকি দেয় ইরান। পরে তেহরান জানায়, বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে পাল্টা ৮৫টি হামলা চালিয়েছে তারা।
আমরা জানলাম, ইরানের সাথে ‘যুদ্ধবিরতি’ শেষ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ব্যাপারে বুধবার ঘোষণা দেন ট্রাম্প। তুরস্কে ন্যাটো সম্মেলনে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, এটা (যুদ্ধবিরতি) শেষ হয়েছে। আমার বিবেচনায়, তাদের (ইরান) সঙ্গে আলোচনা করা মানে শুধু সময়ের অপচয়। তারা মিথ্যাবাদী, তারা জঘণ্য।’ এদিকে উত্তেজনা বৃদ্ধির জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী বলে অভিযোগ করেছে ইরান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ‘চুক্তিভঙ্গের’ অভিযোগ তুলে এক বিবৃতিতে বলেছে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কারণে যুদ্ধ অবসানে দুই পক্ষের সই করা সমাঝোতা চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক অংশগুলো ‘কার্যত অকার্যকর’ হয়ে পড়েছে। এদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি বলেছেন, ‘ইরান সম্পর্কে ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের নীতির ব্যর্থতাই তুলে ধরেছে। ট্রাম্প যে ভাষায় কথা বলেছেন, তার সঙ্গে ইরানেরও একই বাসায় কথা বলতে হবে। কারণ, বলপ্রয়েগের ভাষা তিনিই সবচেয়ে ভালো বোঝেন।
উল্লেখ্য, পাল্টাপাল্টি হামলার পর বিশ্ববাজারে ইরানের তেলবিক্রির সাময়িক সুবিধা বাতিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ঘোষণা ও ট্রাম্পের মন্তব্যের জেরে জ¦ালানি তেলের দাম ৫ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৭৫ ডলার পার করেছে। উত্তেজনা কমিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে আবার আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। তিনি বলেছেন, দুই পক্ষকে সংযম দেখাতে হবে। উত্তেজনা কমাতে দুই পক্ষকে নিতে হবে কার্যকর পদক্ষেপ। বেচারা মহাসচিব, এমন কাগুজে নসিহত ছাড়া তিনি আর কিইবা করতে পারেন! ‘আক্রমণকারী’ ও ‘আক্রান্তের’ মধ্যে পার্থক্য করার সামর্থ্যটুকুও তার নেই। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় পরাশক্তিবর্গ তার এমন হাল করে রেখেছেন। জাতিসংঘও এখন আর কোনো কার্যকর প্রতিষ্ঠান নয়। পরাশক্তির দাম্ভিক নেতারা যখন-তখন ইচ্ছেমতো হামলা চালাতে পারেন। নৈতিক দুর্ভিক্ষের বিশ্বে এটাই এখন বাস্তবতা।