সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোটের্র দেয়া রায় বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। দেড় দশক পর ফিরে এলো তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা, পুনর্বহাল হলো গণভোটের বিধান। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে কার্যত দেশে একদলীয় সরকার ব্যবস্থার পথ প্রশস্ত হয়, হরণ করা হয় মানুষের ভোটাধিকার। এর পরের সাড়ে ষোল বছরে জাতি সেই যন্ত্রণা ভোগ করেছে। ২০২৪ এর জুলাই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে জাতি তা থেকে মুক্তি পায়। ঝরে যায় ১৪০০ প্রাণ। এর পর হাইকোর্ট উক্ত সংশোধনী বাতিল করে রায় দেন। আপিল বিভাগ সে রায় বহাল রাখার মাধ্যমে বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হলো। জনগণ ফিরে পেল তার অধিকার। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীকে আংশিক অসাংবিধানিক ঘোষণা করে হাইকোর্ট বিভাগের দেয়া ঐতিহাসিক রায় বহাল রেখেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর মধ্য দিয়ে প্রায় দেড় দশক পর দেশের সাংবিধানিক কাঠামোয় ফিরে এলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রায়ের ফলে শুধু একটি নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা ফিরল তা নয়; বরং ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে আনা বহু মৌলিক পরিবর্তনের সাংবিধানিক ভিত্তিই নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এতে বলা হয়, বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীবিষয়ক হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে করা তিনটি আপিল খারিজ করে দেন। ফলে হাইকোর্টের রায়ই চূড়ান্তভাবে বহাল থাকে এবং সেটিই এখন কার্যকর সাংবিধানিক অবস্থান হিসেবে বিবেচিত হবে। রায়ের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনর্বহাল। এর ফলে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হওয়ার সাংবিধানিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। তবে এ সরকার কিভাবে গঠিত হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ত্রয়োদশ সংশোধনীর বিধান অনুযায়ী সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার যে ব্যবস্থা ছিল, সেটি হুবহু কার্যকর হবে, নাকি বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা ও আদালতের পর্যবেক্ষণের আলোকে নতুন কোনো কাঠামো নির্ধারণ করা হবে- এ প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। আইনজ্ঞদের মতে, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় বহাল রাখলেও সরকার গঠনের পদ্ধতি নিয়ে সংসদের আইন প্রণয়নের সুযোগ থাকলে সেখানে প্রয়োজনীয় সংস্কার আনা যেতে পারে।

রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সংবিধানে গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হওয়া। এর ফলে সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক অনুচ্ছেদ- বিশেষ করে ৮, ৪৮, ৫৬, ৫৮, ৮০, ৯২(ক) ও ১৪২- পরিবর্তনের ক্ষেত্রে শুধু সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট হবে না; জনগণের প্রত্যক্ষ অনুমোদনের জন্য গণভোটও প্রয়োজন হবে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এর মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সাংবিধানিক ব্যবস্থা আবারো ফিরে এলো। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করে সংবিধানের নির্দিষ্ট কিছু বিষয়কে কার্যত অপরিবর্তনীয় ঘোষণা করা হয়েছিল। এমনকি এসব পরিবর্তনের উদ্যোগকে ‘সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে বিবেচনার বিধানও যুক্ত করা হয়। হাইকোর্ট সেই বিধানকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। আপিল বিভাগ সেই সিদ্ধান্ত বহাল রাখায় এখন সংবিধানের কোনো অংশকেই জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার বাইরে রাখা যাবে না। সংবিধান বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, সংবিধান একটি ‘লিভিং ডকুমেন্ট’; সময় ও জনগণের প্রয়োজন অনুযায়ী এর পরিবর্তনের সুযোগ থাকাই সাংবিধানিক গণতন্ত্রের মৌলিক বৈশিষ্ট্য।

রায়ের মাধ্যমে আরেকটি সাংবিধানিক প্রশ্নও নিষ্পত্তি হয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর পর নিম্ন আদালতকে সীমিত পরিসরে রিট শুনানির ক্ষমতা দেয়ার যে বিধান যুক্ত হয়েছিল, সেটিও বহাল থাকেনি। ফলে সংবিধানের ৪৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে রিট শুনানির একচ্ছত্র এখতিয়ার আবারো হাইকোর্ট বিভাগের কাছেই রইল।

আমরা মনে করি এ রায়ের মধ্য দিয়ে জনগণের জয় হয়েছে। তারা ফিরে পেয়েছেন হারিয়ে যাওয়া অধিকার। ৫ বছর পর পর অবাধ নির্বাচনে ভোট দিয়ে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা হবে। আমরা এ রায়কে স্বাগত জানাই। আইনজীবীরা বলছেন, সাংবিধানিক সংস্কারের একটি বিস্তৃত ক্ষেত্র এখন সংসদের জন্য উন্মুক্ত হলো। আমরা মনে করি যে সব বিষয় সংসদের হাতে ছেড়ে দেয়া হয়েছে তা সরকার ও বিরোধী দল আলোচনার মাধ্যমে দেশের জন্য যা ভাল হবে সেটা করবেন। এ ব্যাপারে আমরা আশাবাদী।