পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক হালচাল ক্রমেই আরো প্রশ্নবোধক হয়ে ওঠছে। মুসলিম কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের পর বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে। আমাদের একটি জাতীয় দৈনিকে কলকাতার বিশেষ প্রতিনিধির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পশ্চিবঙ্গের বারুইপুরে মুসলিম কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় পুলিশের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ ঘিরে রাজ্য-রাজনীতিতে ‘যোগী মডেল’-এর তত্ত্ব জোরালো হচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, উত্তর প্রদেশের ধাঁচে এনকাউন্টারের মাধ্যমে অভিযুক্ত এবং সাক্ষীদের খতম করে দেওয়া হচ্ছে। এদিকে বিজেপি নেতা ও পশ্চিবঙ্গেরমন্ত্রী দিলীপ ঘোষের মন্তব্যে উঠে এলো মুসলমানদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ। একই সুরে নৈরাজ্য, ভাঙচুর ও গণপিটুনির মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীও।

কলকাতা প্রতিনিধির প্রতিবেদনে বলা হয়, গত রোববার সকালে সূর্যপুর এলাকার একটি পুকুর থেকে ওই কিশোরীর লাশ উদ্ধার হওয়ার পর থেকেই এলাকা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সিসিটিভি ফুটেজের সূত্র ধরে পুলিশ প্রথমে প্রভাস মণ্ডলকে গ্রেফতার করে। পুলিশের দাবি, মঙ্গলবার রাতে পৌণে একটা নাগাদ ঘটনা তদন্তে প্রবাসকে নিয়ে সূর্যপুর গেলে সে পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে এবং এক রাউণ্ড গুলীও চালায়। এরপর পুলিশের পাল্টা গুলীতে প্রভাসের মৃত্যু হয়। এ ঘটনাকে অনেকেই উত্তর প্রদেশের যোগী মডেলের এনকাউন্টার বলে অভিহিত করছেন। তারা বিচার প্রক্রিয়ার আগেই মূল অভিযুক্ত বা সাক্ষীকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।

উল্লেখ্য, ঘটনাটি তদন্তের মধ্যেই এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। জানা গেছে, পুলিশি হেফাজতে জেরাকালে রাজা নামে এক বিজেপি নেতার নাম উল্লেখ করেছিল প্রভাষ। এ নারকীয় ঘটনায় জড়িত থাকার সরাসরি ইঙ্গিত থাকা সত্ত্বেও পুলিশ রাজাকে গ্রেফতার করেনি। একদিকে মূল অভিযুুক্তের এনকাউন্টারে মৃত্যু এবং অন্যদিকে জেরায় নাম উঠে আসা বিজেপি নেতার অধরা থাকা-এই দুইয়ে মিলে গোটা তদন্ত প্রক্রিয়া এবং পুলিলেশর ভূমিকা নিয়ে বড় প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে। এদিকে গত মঙ্গলনবার বারইপুরে যান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সেখানে এসপি অফিসে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি জানান, এ ঘটনায় প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে। আর ঘটনার পর বিক্ষোভের নামে পুলিশের ওপর যারা হামলা চালিয়েছে এবং গাড়ি ভাঙচুর করেছে, তাদের বিরুদ্ধেও কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ হুমকি দেওয়ার কাজটা তিনি সেরে নিলেন। বিজেপির বর্ষীয়ান নেতা ও পশ্চিবঙ্গেরমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ দিলেন আরেক বয়ান। তিনি বলেন, একটা নির্দিষ্ট শ্রেণীর রাজনৈতিক নেতারা কেবল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর আঘাত এলেই পথে নামেন। তার মতে, মুসলিম বা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের কোনো বিষয় হলেই যেভাবে রাস্তায় নেমে আন্দোলন হয়, হিন্দু নারী বা বিজেপি কর্মীদের নির্মম হত্যা ও বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় সে একই তথাকথিত প্রতিবাদীরা আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থাকেন। দিলীপ ঘোষের বক্তব্য থেকে উপলব্ধি করা যায়, মুসলিম কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যা ঘটনার প্রতিবাদ তার পছন্দ হয়নি। এখানে অপরাধের বিচার চাওয়ার বদলে, যারা বিচার চাইছেন তাদের অভিযুক্ত করার চেষ্টা করলেন তিনি। এমন সাম্প্রদায়িক চেতনারমন্ত্রী দিয়ে পশ্চিবঙ্গের মজলুম মানুষদের কোনো কল্যাণ হবে কি? পশ্চিবঙ্গে বিজেপি সরকারের যাত্রার শুরুতেই উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের যে আস্ফালন শুরু হয়েছে, তা বিজেপির সাথে গেলেও ভারতের সংবিধানের সাথে যায় না। এবার কুরবানি নিয়ে যে উগ্রতা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে, তাতে শুধু মুসলিমরা অসন্তুষ্ট হয়নি, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন হিন্দু ব্যবসায়ী ও সাধারণ নাগরিকরাও। এভাবে কি সমাজ চলে, রাষ্ট্র চলে? দেশ ও গণবিরোধী এমন আচরণে ধর্মের প্রভুও সন্তুষ্ট হতে পারেন না।