মূল্যায়নসহ নতুন ছয় দফা দাবি
শিক্ষামন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের পদত্যাগের দাবি থেকে সরে এসেছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। নতুন করে ছয়টি দাবি উত্থাপন করেছেন তারা। সে দাবিগুলো নিয়ে সচিবালয়ে গেছেন শিক্ষার্থী প্রতিনিধিরা। গতকাল বুধবার বিকেলে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ছয়জন প্রতিনিধি দাবিগুলো নিয়ে সচিবালয়ে প্রবেশ করেন।
এর আগে বিকেল ৪টার দিকে শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছালে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। পরে আলোচনার জন্য ছয়জন প্রতিনিধিকে সচিবালয়ে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তারা শিক্ষা ভবনের সামনে থেকে সচিবালয়ের উদ্দেশে রওনা দেন। এর আগে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে শিক্ষার্থীরা সচিবালয় অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। বেলা ১১টার দিকে সায়েন্সল্যাব মোড়ে সড়ক অবরোধ করে তারা বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। এতে আশপাশের সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। আন্দোলন চলাকালে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন। তারা অভিযোগ করেন, চলমান দুর্যোগ, টানা বৃষ্টি, জলাবদ্ধতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির মধ্যে পরীক্ষা নেওয়ায় বহু শিক্ষার্থী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কেউ সময়মতো কেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেনি, আবার অনেককে মানসিক চাপের মধ্যেই পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়েছে।
তবে সচিবালয়ে আলোচনার জন্য উপস্থাপিত দাবির তালিকায় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি রাখা হয়নি। এর পরিবর্তে পরীক্ষা ও মূল্যায়নসংক্রান্ত ছয় দফা দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ৬ দফা দাবি
১. দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় যারা পুনরায় অংশ নিতে চায়, তাদের সেই সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
২. একই বিষয়ের পুনঃপরীক্ষা হলে আগের পরীক্ষা ও পুনঃপরীক্ষার মধ্যে যে পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়া যাবে, সেটিকেই চূড়ান্ত ফল হিসেবে গণ্য করতে হবে।
৩. প্রশ্নপত্রে ভুল বা অসঙ্গতি থাকা প্রশ্নের জন্য সব পরীক্ষার্থীকে পূর্ণ নম্বর দিতে হবে।
৪. বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের মানসিকভাবে প্রস্তুতির জন্য কিছু সময় দিয়ে পরে পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
৫. পূর্বঘোষণা ছাড়া প্রশ্নপত্রের ধরনে পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নম্বর মূল্যায়ন করতে হবে।
৬. পরীক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষার্থীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এবং ‘সচেতন গার্ড’-এর নামে শিক্ষকদের অপ্রয়োজনীয় কঠোর ও বিভ্রান্তিকর আচরণ বন্ধ করতে হবে।
খুলে দেওয়া হয়েছে সচিবালয়মুখী রাস্তা
সন্ধ্যা সোয়া ছয় ঘণ্টা পর বিকেল পৌনে ৬টায় সেই রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছে। ফলে সড়কটিতে স্বাভাবিক হয়েছে যানবাহন চলাচল। রাস্তা খুলে দেওয়ার সময় ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার নাসির উদ্দীন, ওমর ফারুক এবং রমনা এলাকার অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) জাহিদসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তার আগে শিক্ষার্থীদের ছয়জন পৌনে ৫টার দিকে সচিবালয়ে ঢুকে। পরে তারা আধা ঘণ্টা পর বেরিয়ে এলে শিক্ষা ভবনের সড়কে অবস্থান নেওয়া আন্দোলনকারীরা গিয়ে মোড়ে দাঁড়ায়। পরে তারা সেখান থেকে শাহবাগ হয়ে চলে যায়। তারা যাওয়ার ১৫ মিনিট পর সচিবালয়ের রাস্তাটি খুলে দেওয়া হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থী এ কে এম রিয়াজুল বলেন, আগামীকাল যেহেতু পরীক্ষা আছে, তাই এখানের কর্মসূচি আমরা শেষ করেছি। তবে আমাদের দাবি বহাল থাকবে।
রমনা বিভাগের উপ পুলিশ কমিশনার (ডিসি) শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা প্রধানমন্ত্রী এখানে অফিস করেন। এখানকার কোনো বিষয়কে আমরা ছোট করে দেখি না। যার কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা সড়কটিকে বন্ধ করে দিয়েছি। ছাত্ররা নিজেদের মধ্যে সমন্বয় হীনতায় পরবর্তীতে নিজেরাই সড়ক ছেড়ে চলে যায়। এরপর আমরা সড়কে দেওয়া ব্যারিকেড সরিয়ে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেই। এই আন্দোলনে ছাত্র ছাড়া অন্য কেউ প্রবেশ করেছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই আন্দোলন ছাত্ররা বা অন্য কেউ প্রবেশ করেছে কিনা সেটা আমরা যাচাই করতে পারিনি। তথ্য প্রমাণ ছাড়া এ বিষয়ে কথা বলা ঠিক হবে না। উল্লেখ্য, আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে ছিল দুর্যোগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত পরীক্ষা স্থগিত রাখা, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের জন্য পুনঃপরীক্ষার ব্যবস্থা এবং শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ।
তিন দফা দাবিতে শাহবাগ অবরোধ
এদিকে, সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিন দফা দাবিতে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের আরেকটি দল রাজধানীর শাহবাগ মোড়ে অবস্থান নিয়ে সড়ক অবরোধ শুরু করেন। এতে শাহবাগ মোড় দিয়ে সব ধরনের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে আশপাশের সড়কে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়। এর আগে একই দিন দুপুরে শিক্ষার্থীরা রাজধানীর সায়েন্স ল্যাবরেটরি মোড়ে প্রায় আধা ঘণ্টা অবস্থান করে সড়ক অবরোধ করেন। পরে সেখান থেকে সচিবালয়ের উদ্দেশে লংমার্চ শুরু করেন তারা। মিছিলটি শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছে সন্ধ্যা প্রায় ৬টা পর্যন্ত অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন। তবে সচিবালয়ের প্রবেশমুখে পুলিশের ব্যারিকেডের মুখে পড়লে তারা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। সচিবালয়ে প্রবেশে বাধা পেয়ে শিক্ষার্থীরা শাহবাগ মোড়ে গিয়ে নতুন করে অবস্থান নেন এবং সড়ক অবরোধ করেন। শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে শাহবাগ মোড় দিয়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে শাহবাগ, মৎস্য ভবন, বাংলামোটর, কাকরাইল, টিএসসি, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে। যানজটে আটকা পড়ে দুর্ভোগে পড়েন অফিসফেরত যাত্রী, রোগীবাহী যানবাহনসহ সাধারণ মানুষ। দীর্ঘ সময় যানবাহনে আটকে থাকায় অনেক যাত্রীকে চরম ভোগান্তি পোহাতে দেখা যায়। কেউ কেউ যানজট এড়িয়ে হেঁটে গন্তব্যে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে সড়কে চলাচলকারী সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। যানজটে বসে থাকা শহীন আলম বলেন, সকাল থেকে এখন পর্যন্ত পুরো ঢাকায় যানজট। একবার একেক জায়গায় অবরোধ করা হচ্ছে। এটা কোন দেশ? এভাবে দেশ চলতে পারে? সাধারণ মানুষের কষ্ট ছাড়া আর কিছুই না। এদিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে শাহবাগ এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।