নবম জাতীয় পে-স্কেল ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার ঘোষণা এসেছে। এতে উপকৃত হবেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা। সঙ্গত কারণেই পে-স্কেলের সুবিধাভোগীরা বেশ উচ্চসিত। ১৮ কোটি মানুষের দেশে এদের সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি নয়। কিন্তু এত হতাশ হয়ে পড়েছেন বেসরকারি চাকুরিজীবী ও সাধারণ মানুষ। কার, নতুন বেতন স্কেল বাস্তবায়নের সাথে সাথে হু হু করে মূল্যস্ফীতি ঘটবে। কিন্তু এদের আয়-রোজগার বাড়বে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারি বাদে অন্যসব শ্রেণি ও পেশার মানুষ চরম এক বাস্তবতার মুখোমুখি হবেন।

এমনিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা অনেকটাই বিপর্যস্ত। সর্বোপরি বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির সবুজ সঙ্কেট দিয়েছে সরকার। ফলে বেসরকারি চাকরিজীবী ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে রীতিমত হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের লোকসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি হলেও সরকারি সুবিধা সংখ্যা মাত্র ১৪ লাখ। ফলে বড় অংশের মানুষের আয় বাড়ছে না। হিসাব পালটাচ্ছে শুধু সরকারি কর্মকর্তার। ফলে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব তথা মূল্যস্ফীতির বোঝা সরাসরি সাধারণ মানুষের কাঁধে এসে পড়ছে।

এদিকে ঈদুল ফিতরে একদফা পণ্যের দাম বেড়েছিল। পরে কুরবানির ঈদ ঘিরে আরও কিছু পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু বাজারে এসব পণ্যের কোনো সংকট না থাকলেও এগুলোর আর দাম কমেনি। এতে নিম্নবিত্ত ছাড়াও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার ওপর বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। আর খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের অনেকে এখন সাধ ও সাধ্যের মধ্যে মাছ-গোস্ত পর্যন্ত কিনতে পারছেন না। গরিবের জন্য বাজার করা এখন সবচেয়ে কষ্ট আর হতাশার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যা খুবই বাস্তবসম্মত।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) প্রকাশিত জুন-২০২৬ মাসের ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) প্রতিবেদনে দেখা গেছে, জুনে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ মূল্যস্ফীতি কমে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। আগের মে-তে এ হার ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি দশমিক ২৬ শতাংশ কমলেও তা এখনো ৯ শতাংশের ওপরে রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে সাধারণ মানুষের ওপরও চাপ বাড়তে পারে। কারণ দেশের সাড়ে ১৪ লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বাড়লে শুধু মূল্যস্ফীতিই নয়, বৈষম্য, দারিদ্র্য, তারল্য সংকটসহ আর্থসামাজিক নানা ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য যে ধরনের পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি প্রয়োজন, তা কিন্তু এখনো দৃশ্যমান নয়।

রাজধানীর বাজার সংশ্লিষ্টরা জানাচ্ছেন, এখন প্রতিকেজি সরুচাল ৮৫-৯০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। মাঝারি আকারের চাল বিক্রি হয়েছে ৬৮ টাকা। আর মোটা চাল বিক্রি হয়েছে ৫৫-৬০ টাকা। পাশাপাশি প্রতিকেজি সরু দানার মসুর ডাল বিক্রি হয়েছে ১৬০ টাকা। খুচরা বাজারে প্রতিকেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৮০-২০০ টাকা, যা এক সপ্তাহ আগেও ১৬০-১৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। পাশাপাশি প্রতি ডজন ফার্মের ডিম বিক্রি হচ্ছে ১২০-১৩০ টাকা। যা গত সপ্তাহে ছিল ১১৫-১২৫ টাকা। এছাড়া গরুর ও খাসির গোস্তের দাম যেন ক্রেতার নাগালের বাইরে। গরুর মাংসের কেজি বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৮৫০ ও খাসির মাংস ১২০০ টাকায়। সপ্তাহের ব্যবধানে কেজি প্রতি ৫ টাকা বেড়ে দেশি পেঁয়াজ সর্বোচ্চ ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লিটারপ্রতি বোতলজাত সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে ২০০ টাকায়।

খুচরা পর্যায়ে প্রতিকেজি লম্বা বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০-৯০ টাকা, যা গত সপ্তাহে ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। এছাড়া গোল বেগুনের কেজি বিক্রি হচ্ছে ৯০-১০০ টাকা। মানভেদে প্রতিকেজি করলা বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকা। চিচিংগা প্রতিকেজি ৬০ টাকা, কচুরমুখি ৬৫-৭০ টাকা কেজিদরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে সব ধরনের মাছ। খুচরায় মানভেদে চিংড়ির কেজি বিক্রি হচ্ছে ৬০০-৮০০, পাবদা ৩০০-৪০০, বড় আকারের রুই কেজিপ্রতি ৪০০-৪৫০, ট্যাংরা ৬০০-৮০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিকেজি ভেটকি ৪০০-৫৫০ টাকা, তেলাপিয়া ২২০-২৩০ টাকা, পাঙাশ ২০০-২২০ টাকা, মৃগেল ২৫০-৩০০ টাকা, বাইম ৬০০-৮০০ টাকা, কৈ ৪০০-৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকার সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ঘোষিত নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে। ফলে ১৪ লাখ কর্মকর্তা সুবিধা পাবেন। তারা নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম কিছুটা হলেও সামাল দিতে পারবেন। কিন্তু অন্যদের জন্য কোনো সুখবর নেই। বাজারে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়েছে। ফলে এ অবস্থা থেকে তাদের বের করে আনতে হবে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে।

রাষ্ট্র কোন শ্রেণি বা গোষ্ঠীর নয় বরং সকল শ্রেণি ও পেশার মানুষের। সরকারি কর্মকর্তাদের নতুন করে পে-স্কেল প্রদান যেমন বাস্তবসম্মত, ঠিক তেমনি অন্য শ্রেণি ও পেশার মানুষকে নিয়েও সরকারকে ভাবতে হবে। বিশেষ করে বেসরকারি চাকুরিজীবি সহ নিম্ন আয়ের মানুষের কথা ভেবে উচ্চমূল্য স্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এখন সময়ে দাবি। একই বৈষম্য ও ব্যবধান দূর করার জন্য নেওয়া দরকার যুৎসই ও কার্যকর পদক্ষেপ। শুধু উচ্ছ্বাস নয় বরং বাস্তবতা উপলব্ধি করাও জরুরি।