একটি দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুধু অর্থ লেনদেনের মাধ্যম নয়; এটি জনগণের আস্থা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের অন্যতম ভিত্তি। মানুষ তাদের সারা জীবনের সঞ্চয়, ব্যবসার মূলধন, সন্তানের শিক্ষা কিংবা চিকিৎসার জন্য জমিয়ে রাখা অর্থ ব্যাংকে রাখে এ বিশ্বাসে যে, প্রয়োজনের সময় সে অর্থ তারা নিরাপদে ফিরে পাবে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সাম্প্রতিক বাস্তবতা সে বিশ্বাসকে গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। দেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে অন্যতম বড় আর্থিক কেলেঙ্কারির পর আজও হাজার হাজার আমানতকারী নিজেদের অর্থ উত্তোলনের জন্য ব্যাংকের শাখা থেকে শাখায় ঘুরছেন। অন্যদিকে যেসব ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীগোষ্ঠী হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণের নামে ব্যাংক থেকে বের করে নিয়েছে, তাদের বিপুল সম্পদের বড় অংশ এখনো কার্যকরভাবে বিক্রি বা নগদায়নের আওতায় আসেনি। এ বৈপরীত্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহির প্রশ্নও।
বর্তমানে একীভূতকরণের আওতায় আসতে যাওয়া কয়েকটি ইসলামী ধারার ব্যাংক গুরুতর তারল্য সংকটে রয়েছে। এসব ব্যাংকের বিপুল পরিমাণ অর্থ কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে বলে বিভিন্ন তদন্ত ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। বহু ক্ষেত্রে অর্থপাচার, জালিয়াতি ও অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু অভিযোগের পর অভিযোগ, মামলা ও তদন্তের পর তদন্ত চললেও অর্থ উদ্ধারের দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি।
বিশেষভাবে আলোচিত এস আলম গ্রুপের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবেদনে যে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ ও অর্থপাচারের অভিযোগ উঠে এসেছে, তা ব্যাংক খাতের জন্য এক গভীর সতর্কবার্তা। একইভাবে আরও কয়েকটি ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর বিরুদ্ধেও বড় অঙ্কের ঋণ অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের প্রশ্ন হলো, যদি এসব ঋণের বিপরীতে সম্পদ থেকে থাকে, তাহলে সে সম্পদ দ্রুত বিক্রি করে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে না কেন?
বাস্তবতা হলো, বিদ্যমান আইনি কাঠামো এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া অর্থ উদ্ধারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থঋণ আদালতে একটি মামলা নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর সময় লেগে যায়। এ সময়ের মধ্যে সম্পদের মূল্য কমে যায়, অনেক সম্পদ নষ্ট হয় কিংবা মালিকানা নিয়ে নতুন জটিলতা সৃষ্টি হয়। ফলে ব্যাংক যেমন অর্থ ফিরে পায় না, তেমনি আমানতকারীরাও ভোগান্তির শিকার হন। এ অবস্থায় বড় ঋণ কেলেঙ্কারির মামলাগুলোর জন্য বিশেষ আদালত গঠনের দাবি অত্যন্ত যৌক্তিক। পৃথক আদালত, নির্দিষ্ট বিচারক এবং দ্রুত বিচারপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যাংক-সংক্রান্ত মামলাগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। অর্থনৈতিক অপরাধের বিচার যদি বছরের পর বছর ঝুলে থাকে, তাহলে অপরাধীদের জন্য সেটি এক ধরনের পরোক্ষ সুবিধায় পরিণত হয়।
এর পাশাপাশি বড় ঋণখেলাপিদের সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করা জরুরি। কোন সম্পদ বাজেয়াপ্ত হয়েছে, কোন সম্পদ অবরুদ্ধ রয়েছে, সেগুলোর বর্তমান বাজারমূল্য কত এবং অর্থ উদ্ধারে কী অগ্রগতি হয়েছে, তা জনগণের সামনে নিয়মিত প্রকাশ করতে হবে। স্বচ্ছতার অভাব আস্থার সংকটকে আরও গভীর করে। একটি কেন্দ্রীয় টাস্কফোর্স গঠনও সময়ের দাবি। বাংলাদেশ ব্যাংক, দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, আদালত এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত এমন একটি কাঠামো সম্পদ শনাক্তকরণ, মূল্যায়ন, বাজেয়াপ্তকরণ এবং নিলাম কার্যক্রমকে দ্রুততর করতে পারে। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের জন্য বাধ্যতামূলক সময়সীমা নির্ধারণ এবং ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্পদ নিলামের ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, উদ্ধার হওয়া অর্থের ব্যবহার। বিক্রীত সম্পদের অর্থ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ব্যবহার করতে হবে। কারণ ব্যাংকের সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার তারাই। অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, প্রবাসী পরিবারের সদস্য এবং মধ্যবিত্ত সঞ্চয়কারীরা কোনো অপরাধ করেননি। তারা কেবল রাষ্ট্র ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা রেখেছিলেন।
ব্যাংক একীভূতকরণ হয়তো প্রশাসনিক ও কাঠামোগত কিছু সমস্যার সমাধান করতে পারে। কিন্তু এটি কোনোভাবেই মূল সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। প্রকৃত সমাধান হলো লুট হওয়া অর্থ উদ্ধার, দায়ীদের বিচারের মুখোমুখি করা এবং আমানতকারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। জনগণ দেখতে চায়, যারা ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়েছে তারা আইনের আওতায় এসেছে এবং তাদের সম্পদ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের পাওনা পরিশোধ করা হচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। যদি ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি হবে। আর যদি লুটেরাদের সম্পদ অক্ষত থাকে এবং আমানতকারীরা বছরের পর বছর নিজেদের অর্থের জন্য দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকে, তাহলে আস্থার এই সংকট আরও গভীর হবে। একটি সুস্থ অর্থনীতির স্বার্থে এখনই দ্রুত, কঠোর এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই।