বিশ্বকাপ ফুটবল মানে এক উত্তাল আবহ। সেই আবহ এখনো আছে। ফুটবল নিয়ে কত আলোচনা, কত বিশ্লেষণ। অনভিজ্ঞ নতুন নায়কদেরও দেখা যাচ্ছে, যেমন ‘কেপ ভার্দের’ বিশ্বকাপ স্কোয়াড। তবে বিশ্ব ফুটবলে এখনো এগিয়ে আছে ইউরোপই। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফুটবলে চারটি দেশ সেমিফাইনালে উঠেছে। এরমধ্যে স্পেন, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড ইউরোপীয় দেশ। এর বাইরে দক্ষিণ আমেরিকার দেশটি হলো আর্জেন্টিনা। ইউরোপীয় ফুটবলের নানা পরিচয় আছে, বৈশিষ্ট্য আছে। তবে ইউরোপীয় ফুটবলের সাম্প্রতিক ইতিহাসে মুসলিম পরিচয়ের একটা উত্থান লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শুধু ফুটবলে নয়, ইউরোপের রাজনীতিতেও ইসলাম একটি প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে উঠেছে। রয়টার্স ও মিডলইস্ট আই-এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত কয়েক দশক ধরেই ইউরোপের রাজনীতিতে ইসলাম একটি প্রধান স্পর্শকাতর বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এছাড়া ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ওয়ার্ল্ড কাপে নতুন প্রজন্মের ফুটবলাররা প্রমাণ করে দিচ্ছেন যে, ইসলাম ধর্ম এখন এই মহাদেশের সামগ্রিক কাঠামোরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। বিশ্বজুড়ে বর্তমানে প্রায় ২০০ কোটি মুসলিম রয়েছেন, যা বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ। ফলে ১৩টি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ২০২৬-এর ফুটবল বিশ্বকাপে ইসলাম ধর্মের ধর্মীয় অনুভূতির প্রকাশ্য বহিঃপ্রকাশ কোনো বিষ্ময়কর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে না। এছাড়া ইসলাম ধর্মের সবচেয়ে আলোচিত নিদর্শনগুলোর কয়েকটি এসেছে খৃস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের প্রতিনিধিত্ব করা খেলোয়াড়দের কাছ থেকেও।
উল্লেখ্য, স্পেন ও বার্সেলোনার আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দেওয়া বিস্ময়বালক লামিন ইয়ামান সৌদি আরবের বিরুদ্ধে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম গোল করার পর ‘সেজদা’ দিয়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হন। এর আগে গত মার্চে ইয়ামালের নিজ শহর বার্সেলোনায় স্পেন ও মিসরের মধ্যকার একটি প্রীতি ম্যাচের সময় তার ধর্মবিশ্বাস লাইমলাইটে আসে। তখন গ্যালারির একাংশ থেকে চ্যান্ট বা স্লোগান দেওয়া হয়, ‘যে লাফায় না সে মুসলিম’। জবাবে ইয়ামাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমি একজন মুসলিম... ... ফুটবল মানুষকে বিনোদন ও অনুপ্রাণিত করার জন্য, কারও বিশ্বাসের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনের জন্য নয়।’ এই স্লোগান বা বিদ্রƒপগুলো হুট করে তৈরি হয়নি। পুরো ইউরোপজুড়ে উগ্র ডানপন্থিরা এবং বর্তমানে বেশ কয়েকটি মূলধারার রাজনৈতিক দলও একটি কৃত্রিম বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে, আর সেটি হলো-খৃস্টান ইউরোপ বনাম তথাকথিত বহিরাগত ইসলামী শক্তি। অথচ স্বয়ং খৃস্টধর্মের উৎপত্তি হয়েছিল সেই একই অ-ইউরোপীয় উপদ্বীপে, যেখানে যিশুখৃস্টের কথিত ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার প্রায় ছয় শতাব্দী পর ইসলামের আবির্ভাব ঘটেছিল।
একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো-আইয়ারি, ইয়ামাল বা রুডিগাররা তাদের অভিবাসী পরিবারের কাছ থেকে ইসলামের ধর্মবিশ্বাস পেলেও, ইউরোপের অনেক ফুটবলার আবার ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন নেদারল্যান্ডসের মিডফিল্ডার ও চারবারের উয়েফা চ্যাম্পিয়নস লিগ বিজয়ী ক্লারেন্স সিডর্ফ, ফ্রান্সে জন্মগ্রহণকারী মালির স্ট্রাইকার ফ্রেডেরিক কানুতে এবং ২০১৮ সালের বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্সের মিডফিল্ডার পল পগবা। আরেক ধর্মান্তরিত খেলোয়াড় ডেড স্পেন্স এই বিশ্বকাপে ইংলান্ডের লেফট ব্যাক হিসেবে খেলছেন। ইউরোপের এমন পরিবেশ কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ স্কোয়াডের তিন সদস্যকেও ইসলামের পথ দেখিয়েছে। স্পেন, উরুগুয়ে ও আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে দুর্দান্ত পারফর্ম করে টুর্নামেন্টে চমক সৃষ্টিকারী ছোট এই দ্বীপরাষ্ট্রটি মূলত রোমান ক্যাথলিক সংখ্যাগরিষ্ঠ। তবে ইতিহাস গড়া এই দলটির প্রায় অর্ধেক খেলোয়াড়াই কেপ ভার্দের বাইরে জন্মগ্রহণকারী প্রবাসী। ৩২ বছর বয়সি জামিরো মন্তেইরো ২০১৬ সালে প্রথম কেপ ভার্দের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং এর পাঁচ বছর পর নিজের জন্মশহর রটারডামে ইসলাম গ্রহণ করেন। ফ্রান্সে জন্মগ্রহণকারী তার সতীর্থ লোগান কস্তা এবং স্টিভেন মোরেইরাও তাদের পেশাদার ক্যারিয়ার চলাকালীন সময়ে ইসলামে দীক্ষিত হন। নিজের আধ্যাত্মিক যাত্রার বর্ণনা দিয়ে ২৫ বছর বয়সি ডিফেন্ডার কস্তা বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই ধর্মের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল এবং আমি ইসলাম নিয়ে পড়াশোনা করেছি। পরে একজন মুসলিম খেলোয়াড়ের সঙ্গে থাকতাম এবং সে আমাকে তার সঙ্গে নামায পড়তে উৎসাহ দেয়। তখনই আমি ভেতরে কিছু একটা অনুভব করি।’ কস্তা ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলাম গ্রহণ করেন। উপলব্ধি করা যায়, কিছু রাজনীতিক কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা করলেও ইউরোপীয় ফুটবলে মুসলিম পরিচয়ের উত্থান ঘটেছে।