এ্যাডভোকেট আবু হাসিন

আধুনিক বিশ্ব কি গণতান্ত্রিক বিশ্ব। গণতন্ত্র আমাদের সংবিধানেরও অন্যতম মূলনীতি। গণতন্ত্রের অতিগুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ হচ্ছে বাকস্বাধীনতা ও স্বাধীন গণমাধ্যম। কিন্তু স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরও আমাদের দেশে স্বাধীন গণমাধ্যমের স্বপ্ন পূরুণ হয়নি। ফলে গণতন্ত্রও বিকশিত হতে পারেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ অবস্থার বড় ধরনের অবনতিই ঘটেছে। বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রায় সব সূচকেই পরিস্থিতির উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, বিশ্বজুড়ে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ২৫ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। সাংবাদিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা প্যারিসভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংগঠন রিপোর্টার্স সানস ফ্রন্টিয়ার্স (আরএসএফ) এ তথ্য জানিয়েছে। ২০২৬ সালের সূচকে গত বছরের তুলনায় তিন ধাপ পিছিয়ে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ১৫২তম। আরএসএফ প্রতিবছর বিশ্বের ১৮০টি দেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার চিত্র নিয়ে একটি সূচক প্রকাশ করেছে সম্প্রতি। এতে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর গণমাধ্যমের স্বাধীনতা পরিস্থিতিকে ‘খুবই উদ্বেগজনক’ থেকে শুরু করে ‘ভালো’ এ পাঁচটি স্তরে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিশ্ব গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। ২০২৫ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৪৯তম। মূলত, এক বছরে সূচকে আরও তিন ধাপ অবনতি হয়েছে বাংলাদেশের। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের ১৬ কোটি ৯০ লাখ মানুষের ২০ শতাংশের বেশি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন। তাঁদের বড় একটি অংশেরই মূলধারার গণমাধ্যমের নাগাল পাওয়ার সুযোগ কম। তবে দেশে সংবাদ ও তথ্য আদান-প্রদানে ইন্টারনেটের ভূমিকা ক্রমে বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, দেশের প্রধান দুই রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতার কোনো ধরনের সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নেই। এসব প্রতিষ্ঠান সরকারি প্রচারযন্ত্র হিসেবে কাজ করে। রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংগঠন বাসসের অবস্থাও একই বৃত্তে। বেসরকারি খাতের চিত্র তুলে ধরে আরএসএফ জানায়, বাংলাদেশে বর্তমানে ৩ হাজার সংবাদপত্র ও সাময়িকী, কিছু কমিউনিটি রেডিওসহ ৩০টি রেডিও, ৩০টি টেলিভিশন চ্যানেল এবং কয়েক শ নিউজ পোর্টাল রয়েছে।

আরএসএফ বলছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সব সরকারই গণমাধ্যমকে নিজেদের প্রচারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারও এর ব্যতিক্রম ছিল না। ওই সময় সেন্সরশিপ, সাইবার হয়রানি, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার চাপ, বিচারিক হয়রানি, দমন-পীড়নমূলক আইন ও পুলিশের সহিংসতার মুখে সাংবাদিকতা চরম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। এরপর নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে। পরবর্তী সময়ে সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ক্ষমতায় আসে।

একথা কারো অজানা নয় যে, শেখ হাসিনা সরকার বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আদলে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) প্রবর্তন করেছিল। এ আইন সাংবাদিকদের জন্য অত্যন্ত দমনমূলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মাধ্যমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কোনো ধরনের পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেপ্তার, ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ এবং সোর্সের গোপনীয়তা লঙ্ঘনের সুযোগ দেয়। এমন পরিবেশে সম্পাদকেরা প্রায়ই ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ বা নিজেদের লেখায় নিজেরা কাঁচি চালাতে বাধ্য হতেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি খাতের অধিকাংশ বড় গণমাধ্যম এখন গুটিকয় বড় ব্যবসায়ীর মালিকানায়। তাঁরা গণমাধ্যমকে প্রভাব খাটানো ও মুনাফার হাতিয়ার ব্যবহার করেন। ফলে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার চেয়ে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখাকেই তাঁরা বেশি গুরুত্ব দেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ‘ভালো’ অবস্থায় রয়েছে, এমন দেশের তালিকায় শীর্ষে আছে মাত্র সাতটি দেশ। তালিকার প্রথম তিনটি দেশ হলো নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস ও এস্তোনিয়া। ফ্রান্স ‘সন্তোষজনক’ ২৫তম অবস্থানে থাকলেও এ তালিকায় যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ৬৪তম। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা নেওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সাত ধাপ নিচে নেমেছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সূচকে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে আর্জেন্টিনার অবস্থানে বড় পতন হয়েছে। ১১ ধাপ পিছিয়ে দেশটির অবস্থান এখন ৯৮তম। অন্যদিকে অপরাধী চক্র ‘মারাস গ্যাং’-এর বিরুদ্ধে অভিযানের জেরে ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ১০৫ ধাপ নিচে নেমেছে এল সালভাদর। দেশটির বর্তমান অবস্থান ১৪৩তম। ২৫ বছর ধরে সাংবাদিকদের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে শীর্ষে রয়েছে পূর্ব ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য। সূচকের তলানিতে থাকা ১০টি দেশের মধ্যে রাশিয়া ১৭২তম এবং ইরান ১৭৭তম অবস্থানে রয়েছে।

আরএসএফ জানিয়েছে, ‘২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরাইলী বাহিনীর হামলায় ২২০ জনের বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৭০ জন পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় প্রাণ হারিয়েছেন।’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাংবাদিকতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা এখন এক বৈশ্বিক প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণমাধ্যমের জন্য নির্ধারিত আইনগুলোকে পাশ কাটিয়ে জরুরি অবস্থা এবং প্রচলিত আইনের অপপ্রয়োগের মাধ্যমে এখন বিশ্বজুড়ে সাংবাদিকদের নিশানা করা হচ্ছে।

মূলত গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত না হওয়ায় আমাদের গণতন্ত্র ও সুশাসনের পথচলাও মসৃণ হয়নি। নিকট অতীতে আমাদের দেশে ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতা একেবারে প্রান্তিক পর্যায়ে এসে ঠেকেছিলো। শুধুমাত্র ভিন্নমতের কারণে গত ১৫ বছরে দেড় হাজারের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। একই কারণে ৪৫ লাখ মানুষকে বিভিন্ন মামলার আসামী করা হয়েছে। মামলা দেয়া হয়েছে প্রায় দেড় লাখ। ২০০৯ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের শিকার ২ হাজার ৫২৬ জন। গুম হয়েছেন ৮৮১ জন। বিরোধী দলগুলোর পক্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে এমন অভিযোগ করা হলেও সরকার এই দাবি নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেনি। ফলে অভিযোগগুলোকে ভিত্তিহীন বলার সুযোগ থাকছে না।

আমাদের দেশে যেভাবে গণতন্ত্রের চর্চা হচ্ছে তা রুশোর কথায় বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। ফরাসি দার্শনিক রুশো প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলতে রাজী হননি। তার ভাষায়, জনপ্রতিনিধিরা জনস্বার্থে কাজ করেন না। তারা কাজ করেন নিজেদের স্বার্থে। তিনি প্রত্যক্ষ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন, যাতে জনগণের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে। পক্ষান্তরে প্লেটো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে সবচেয়ে অযোগ্য শাসনব্যবস্থা মনে করতেন। তার মতে, যেহেতু গণতন্ত্র বেশিরভাগ জনগোষ্ঠী দ্বারা পরিচালিত শাসনব্যবস্থা সেহেতু গণতন্ত্র কখনই উন্নতমানের শাসনব্যবস্থা হতে পারে না। কারণ প্রত্যেক জাতি-রাষ্ট্রেই বিজ্ঞানী, সুপন্ডিত এবং যোগ্য লোকের তুলনায় অযোগ্য অশিক্ষিত এবং অজ্ঞ লোকের সংখ্যাই বেশি। তাই বেশিরভাগ লোকের শাসন অর্থই অযোগ্য লোকের শাসন। গণতন্ত্র সংখ্যায় বিশ্বাসী, গুণে নয়। গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নিয়ে এসব কথা শ্রুতিকটু মনে হলেও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে তা একেবারে উপেক্ষা করার মত নয় বরং অনেকটাই বাস্তবসম্মত।

সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও উদার গণতন্ত্র চর্চার উদ্দেশ্য পূরুণের জন্য আমরা মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করেছি। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরও এখনো আমাদেরকে গণতন্ত্র ও ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারকে নির্বিঘ্ন করা সম্ভব হয়নি। গণতন্ত্রে চিন্তার স্বাধীনতা, কথা বলার স্বাধীনতা, কাজের স্বাধীনতা আর উপাসনার স্বাধীনতা নিশ্চিত হওয়ার কথা থাকলেও এসব ক্ষেত্রে আমাদের অর্জন নিতান্তই গৌণ। মূলত শাসনকাজে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করা না গেলে সে সমাজ আর গণতান্ত্রিক থাকে না। এক্ষেত্রে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের ‘গেটিসবার্গ এড্রেস’ বেশ প্রাসঙ্গিক। তার ভাষায়, ‘গণতন্ত্র জনগণের সরকার, জনগণের দ্বারা গঠিত সরকার, জনগণের জন্য সরকার।’

আমাদের দেশের প্রচলিত গণতন্ত্রে জনগণের শাসনের নামে গুটিকয়েক ব্যক্তিই রাষ্ট্রের শাসনকার্য পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগটা দীর্ঘদিনের। জুলাই বিপ্লবের পর সে অবস্থার খানিকটা উন্নতি হলেও রাজনৈতিক ব্যর্থতার কারণে তাও ভেস্তে যেতে বসেছে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত করা যায়নি। যা দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে বেশ বাজারও পেয়েছে। তাই এমন অশুভ বৃত্ত ভাঙার জন্য জাতীয় ঐক্যমত প্রতিষ্ঠার আবশ্যকতা দেখা দিয়েছে। কিন্তু রাজনীতিকরা সে আশাবাদের সৃষ্টি করতে পারেননি। ফলে সবকিছু অনেকটা পুরনো বৃত্তেই রয়ে গেছে।

মানবসভ্যতায় গণতন্ত্রের ইতিহাস অতিপ্রাচীন। প্রাচীন গ্রিস এবং রোমে গণতন্ত্রের উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটেছিল। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নগর রাষ্ট্রগুলো ছিল ক্ষুদ্রায়তন এবং স্বল্প জনসংখ্যার। সে কারণে সভা-সমিতির মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সরাসরি জনগণের মতামত নেয়া সম্ভব ছিল। এটাই ছিল প্রত্যক্ষ বা বিশুদ্ধ গণতন্ত্র। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় রাজ্যসমূহের আয়তন এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধি ঘটেছে। বর্তমানে রাষ্ট্রগুলোর বিশাল আয়তন ও বিপুল জনসংখ্যার কারণে সকল ক্ষেত্রে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র সম্ভব নয়। এমতাবস্থায় জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই জনগণের হয়ে, জনগণের কল্যাণে রাষ্ট্রীয় শাসনকার্য পরিচালনা করেন। তারা নির্বাচিত হয়ে জনগণের স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে আশা করা হয়। এটাকে পরোক্ষ বা প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র বলা হয়। এ প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাই আধুনিক গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার ভিত্তি। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে এর প্রতিফলনটা খুবই গৌণ। সঙ্গত কারণেই সুশাসন আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করেনি।

যেহেতু আমাদের দেশে সাংবিধানিকভাবেই প্রতিনিধিত্বমূলক গণতন্ত্র চালু আছে। কিন্তু নেতিবাচক রাজনীতির কারণেই এর যথাযথ প্রয়োগটা বারবারই বাধাগ্রস্থ হয়েছে। ফলে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ বারবার মুখ থুবড়ে পড়েছে। তাই আমাদের দেশের নির্বাচনগুলো জনমতের যথাযথ প্রতিফলন ঘটছে না বলে জোরালো প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষের রাজনীতির সাথে বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের সাথে দুরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। জুলাই পক্ষগুলোকে অনেকটা কাছাকাছি আনলে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার কারণে আবারও দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।

আমাদের রাজনীতি গণমুখী চরিত্র হারিয়েছে বেশ আগেই। ক্ষমতাসীনদের একটি অংশ জনগণের কল্যাণে কাজ করার পরিবর্তে অনেক বেশি ব্যস্ত থাকছেন নিজেদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি নিয়ে । মূলত দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক বোধের অনুপস্থিতির কারণেই রাষ্ট্রের কোন ক্ষেত্রেই জবাবদিহীতা নেই। তাই সুশাসনের আশাবাদটা আজও আমাদের কাছে অধরাই থেকে যাচ্ছে। ফলে জনজীবনে শান্তি ফিরে আনা সম্ভব হচ্ছে না।

অনেক সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি সত্ত্বেও সারাবিশ্বে গণতন্ত্র এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় ও জননন্দিত শাসনব্যবস্থা। কারণ, এ পদ্ধতিতে ভোটের মাধ্যমে সরকার গঠনের সুযোগ থাকে। ফলে জনগণের কাছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়। আর এটিই গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মৌলিকত্ব, বিশেষত্ব ও বৈশিষ্ট্য। ভোটের মাধ্যমে জনগণ মতপ্রকাশের বা সঠিক রায় প্রদানে ভুল করলেও সেটা গণতন্ত্র এবং জনগণের শাসন। অনাকাক্সিক্ষতভাবে গণমাধ্যমগুলোকে ফরমায়েসী বা আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার মহড়াও প্রত্যক্ষ করছি। কিন্তু গণমাধ্যম হচ্ছে সমাজ-রাষ্ট্রের দর্পণ। তাই গণতন্ত্রকে সার্থক ও সফল করতে হলে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে সবার আগে।

এ বিষয়ে নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের একটি বক্তব্য বেশ চমকপ্রদ। তিনি ২০০৪ সালে বিশ্ব মুক্তগণমাধ্যম দিবস উপলক্ষে লিখিত ‘What's the Pointof Press Freedom?’ প্রবন্ধে ইংরেজ শাসনের শেষের দিকে ১৯৪৩ সালে সংঘঠিত ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে গণতন্ত্র এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার অনুপস্থিতিকেই দায়ী করেন। ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর অপ্রয়োজনীয় আইনি বাধ্যবাধকতা থাকায় ব্রিটেনের তৎকালীন পার্লামেন্ট ভারতের প্রকৃত সমস্যার কথা জানতে পারেনি। ফলে শাসকগোষ্ঠী দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় যথাযথ ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে সম্ভব হয়নি।

গণতন্ত্র ও গণমাধ্যম সম্পর্কে আমেরিকার ফেডারেল কোর্টের বিচারপতি রবার্ট এইচ জ্যাকসনের বক্তব্য খুবই গুরুত্বপূণ। তার ভাষায়, ‘নাগরিকদের ভুল করা থেকে রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব নয়; বরং নাগরিকদের দায়িত্ব হলো সরকারকে ভুল করা থেকে রক্ষা করা।’ মূলত নাগরিক জীবনের সমস্যা, সম্ভবনা ও মতামতের প্রতিফলনের উল্লেখযোগ্য অনুসঙ্গ হচ্ছে গণমাধ্যম। তাই গণতন্ত্রকে অর্থবহ ও ফলপ্রসূ করতে হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় স্বাধীনতার স্বপ্নগুলো অধরাই থেকে যাবে।

লেখক : আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক।