সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরের (২০২৫-২০২৬) মূল বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে তা সংশোধন করে ৫ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। অর্থবছর শেষে ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউ (এনবিআর) মোট ৪ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ে সক্ষম হয়েছে। অর্থাৎ রাজস্ব আদায়ের মূল লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৮৮ হাজার কোটি টাকা কম রাজস্ব আহরিত হয়েছে। রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই ব্যর্থতা এবারই যে প্রথম ঘটলো তা নয়। বছরের পর বছর একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে এ পর্যন্ত কোন বছরই রাজস্ব আদায়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ২০০৭-২০০৮ সেনা শাসিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলটি। সেই সময় রাজস্ব আদায়ের মোট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত ছিল ৩৭ হাজার কোটি টাকা। আর বাস্তবে রাজস্ব আদায় হয়েছিল ৪৭ হাজার কোটি টাকা। সেই সময় এক বিশেষ ধরনের সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসীন ছিলেন। সরকার কোন ধরনের অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে রাজস্ব আদায়ের উপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছিলেন। এনবিআর’র কর্মকর্তারাও আগের যে কোন সময়ের তুলনায় দায়িত্বশীলতার সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে তৎপর হয়েছিলেন। সম্ভাব্য করদাতাগণও বুঝতে পেরেছিলেন কর ফাঁকি দিলে পরিণতি ভালো হবে না। যারা কর ফাঁকি দিতে অভ্যস্ত তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক বিরাজ করছিল। ফলে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে গিয়েছিল। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোন রাজনৈতিক সরকার আমলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি।
যেকোন দেশের টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রত্যাশিত মাত্রায় রাজস্ব আহরণের কোন বিকল্প নেই। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়নের জন্য মূলত রাজস্ব আহরণের উপর নির্ভর করতে হয়। কোন কারণে চাহিদা মতো রাজস্ব আহরণ করতে না পারলে সরকারকে তার উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের জন্য স্থানীয় ও বিদেশী উৎস থেকে ঋণ গ্রহণ করতে হয়। স্থানীয় উৎস থেকে ঋণ গ্রহণের জন্য সরকারকে মূলত ব্যাংকিং সেক্টরের উপর নির্ভর করতে হয়। ব্যাংকিং সেক্টর থেকে উচ্চমাত্রায় ঋণ গ্রহণ করলে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ সংকুচিত হয়ে পড়ে। ব্যাংকগুলো চাইলেই ব্যক্তি খাতের উদ্যোক্তাদের তাদের চাহিদা মতো ঋণ দিতে পারে না। আর বিদেশী সূত্র থেকে ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এখন চাইলেই উন্নয়ন সহযোগীদের নিকট থেকে ঋণ পাওয়া যায় না। আর তারা ঋণ দিলেও বাজারভিত্তিক সুদ হারে ঋণ প্রদান করে, যা উন্নয়নশীল দেশের জন্য সত্যি এক সমস্যা। আগের মতো সফ্ট লোন এখন আর তেমন একটা পাওয়া যায় না। এছাড়া ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর নিকট থেকে ঋণ নিলে এমন সব শর্ত মেনে নিতে হয় তা ঋণগ্রহীতা দেশের দ্রুত এবং টেকসই উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। কোন দেশই বিদেশী ঋণদানকারী সংস্থার নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করে ঋণভারে জর্জরিত হতে চায় না। ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির যেমন স্বাধীনতা এবং আত্মমর্যাদা থাকে না ঠিক তেমনি ঋণগ্রস্ত দেশেরও স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা থাকে না। তাদের প্রতিনিয়তই ঋণদানকারী সংস্থার মর্জির ওপর নির্ভর করে চলতে হয়। তাই কোন মর্যাদাবান দেশই দীর্ঘদিন বিদেশী ঋণগ্রস্ত হয়ে থাকতে চায় না। কিন্তু অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ রাজস্ব আহরণ করতে না পারলে বিদেশী ঋণ গ্রহণের কোন বিকল্প থাকে না।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক দিক থেকে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে কিন্তু উন্নয়ন অর্থায়নের জন্য এখনো বিদেশী ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। চলতি অর্থবছরের (২০২৬-২০২৭) বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ৩লাখ কোটি টাকা ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে। মোট বাজেট ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশীক সূত্র থেকে ১ লাখ ৫৫ কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্থানীয় উৎস থেকে ঋণ নেয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ইতোপূর্বে গৃহীত ঋণের সুদ এবং কিস্তি বাবদ পরিশোধ করতে হবে ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে বাংলাদেশের নিট বৈদেশিক ঋণের স্থিতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আগামী কয়েক বছর পর নতুন করে ঋণ নিয়ে বিদেশী ঋণের কিস্তি ও পরিশোধ করতে হবে। ঢালাওভাবে বিদেশী ঋণ গ্রহণ করা হলে তার পরিণতি কি হতে পারে তা আমরা দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করেছি। বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণের স্থিতির পরিমাণ হচ্ছে জিডিপি’র ২২ শতাংশের মতো। অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশী ঋণ মিলিয়ে বাংলাদেশের মোট ঋণের স্থিতি জিডিপি’র ৪২ শতাংশের মতো। মোট ঋণের স্থিতি জিডিপি’র ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশ হলে তাকে উদ্বগজনক বলা যেতে পারে। আর এককভাবে বৈদেশীক স্থিতি জিডিপি’র ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ হলে তাকে উদ্বেগজনক বলা যেতে পারে। বাংলাদেশের ঋণের স্থিতি (বৈদেশিক এবং স্থানীয়) এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে উপনীত না হলেও অচিরেই তা বিপদজনক সীমার কাছাকাছি চলে যেতে পারে। দুর্যোগময় পরিস্থিতি এড়ানোর জন্য অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে রাজস্ব^ আহরণের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে ঠিকই কিন্তু অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে উন্নয়নের জন্য অর্থায়ন যোগানদানের ক্ষেত্রে আমরা ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছি। সর্বশেষ হিসাব মোতাবেক, বাংলাদেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও হচ্ছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ মোট জিডিপি’র আকার যদি হয় একশত টাকা তাহলে আমাদের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ হচ্ছে ৬টাকা ৮০ পয়সা। দক্ষিণ এশিয়াতো বটেই বিশ্বে যেসব দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও সবচেয়ে কম বাংলাদেশ তার মধ্যে অন্যতম। ভারতের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও হচ্ছে ১২ শতাংশ, চীনের ক্ষেত্রে এটা ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। নেপালের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও হচ্ছে ২৩ শতাংশ। এমনকি উগান্ডার মতো দেশের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১২ দশমিক ২৫ শতাংশ। বিশ্বে সবচেয়ে কম ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও সম্বলিত দেশের মধ্যে কাতারের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ১দশমিক ৫ শতাংশ, সোমালিয়ার ক্ষেত্রে এটা ২ দশমিক ২ শতাংশ, মিয়ানমারের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও হচ্ছে ২ দশমিক ২৮ শতাংশ। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোর ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও সবচেয়ে কম। কারণ তারা অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। তারা সাধারণ মানুষের উপর উচ্চ হারে করারোপ করে না। ফলে তাদের ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও তুলনামূলকভাবে খুবই কম। আবার উন্নত দেশগুলোতে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বেশি হবার কারণ হচ্ছে তারা জনগণের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাসেবা বিনামূল্যে প্রদান করে থাকে। চলতি অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাবনা উপস্থাপনকালে অর্থমন্ত্রী ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও বাড়ানোর প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছেন। সরকার আগামী ৫ বছরের মধ্যে ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১০ শতাংশে উন্নীতকরণ এবং ২০২৫ সালের মধ্যে তা ১৫ শতাংশে উন্ন্নীত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। আন্তর্জাতিক স্টান্ডার্ড মোতাবেক বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য ট্যাক্স-জিডিপি রেশিও ১৪ থেকে ১৫ শতাংশ হওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ যদি প্রত্যাশিত মাত্রায় ট্যাক্স আদায় করতে চায় তাহলে পুরো সিস্টেমকে সংস্কার ও আধুনিকায়ন করতে হবে। উচ্চ হারে ট্যাক্স ধার্য করার পরবর্তে করজাল বিস্তৃত করতে হবে। ট্যাক্স প্রদানযোগ্যদের মধ্যে অনেকেই নিয়মিত ট্যাক্স প্রদান করেন না। দেশে মোট টিআইনএনধারী আছেন ১ কোটি ২ লাখ। এর মধ্যে প্রতিবছর গড়ে ৩৬ থেকে ৪২ লাখ বা টিআইএনধারীদের মধ্যে মাত্র ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ রিটার্ন দাখিল করেন। জমাকৃত রিটার্নের ৬৬ শতাংশই শূন্য রিটার্ন। অর্থাৎ এই বিপুল সংখ্যক রিটার্ন থেকে সরকার কার্যত কোন ট্যাক্স পান না। বাংলাদেশের ট্যাক্স সিস্টেমের অন্যতম দুর্বলতা হচ্ছে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ খুবই কম। উন্নত দেশগুলোতে করজাল সম্প্রসারণের পাশাপাশি প্রত্যক্ষ কর নির্ধারণের পরিমাণ বাড়ানো হয়। প্রত্যক্ষ কর হচ্ছে আধুনিকতম কর ব্যবস্থা এবং এটা প্রগ্রেসিভ বা প্রগতিশীল। মানুষের আয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কর আদায়ের পরিমাণ বাড়তে থাকে এবং যার আয় যত বেশি তাকে তত বেশি পরিমাণে ট্যাক্স প্রদান করতে হয়। প্রত্যক্ষ কর হচ্ছে সেই কর ব্যবস্থা যেখানে একজন করদাতা নিজে সরাসরি সরকারের নিকট কর পরিশোধ করে থাকেন। ফলে সেখানে কর ফাঁকি দেবার প্রবণতা থাকে তুলনামূলকভাবে কম। কিন্তু পরোক্ষ কর সবাইকে একই হারে প্রদান করতে হয়। পরোক্ষ কর করদাতা নিজে সরাসরি প্রদান করেন না। তিনি অন্যের মাধ্যমে কর প্রদান করেন। পরোক্ষ কর ব্যবস্থায় চূড়ান্ত পর্যায়ে যিনি সরকারের নিকট কর প্রদান করেন তিনি সেই করের দায় অন্যের উপর চাপাতে পারেন। যেমন কোন ব্যক্তি যদি বাজার থেকে চকলেট বা অন্য কোন খাবার কিনে তাহলে বিক্রেতা মূল্যের সঙ্গে কর আরোপ করে থাকে। সেই কর তিনি পরবর্তীতে সরকারের কোষাগারে জমা প্রদান করেন। এটা পরোক্ষ কর। আর কোন ব্যক্তি তার আয়ের উপর প্রতি বছর যে কর প্রদান করেন তা তিনি নিজেই সরকারের কোষাগারে জমা দেন। এটা প্রত্যক্ষ কর। পণ্য বিক্রেতা যদি ভোক্তাকে মানি রিসিট প্রদান না করেন তাহলে খুব সহজেই ভোক্তার নিকট থেকে আদায়কৃত করের অর্থ আত্মসাৎ করতে পারবেন। বিশ্বে প্রত্যক্ষ করের সবচেয়ে বেশি ডেনমার্কে ৬০দশমিক ৫শতাংশ। আইভরিকোস্টে প্রত্যক্ষ কর ৬০ শতাংশ, ফিনল্যান্ডে ৫৭দশমিক ৬৫ শতাংশ এবং জাপানে ৫৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এমনকি ভারতে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ ৫৬ থেকে ৫৮ শতাংশ, চীনে ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ। এর বিপরীতে বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ করের পরিমাণ মাত্র ৩০ শতাংশ।
বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাপনা এখনো সেকেলে ধরনের। কর ব্যবস্থাপনাকে ডিজিটালাইজেশন করতে হবে। করের আওতা বাড়ানো খুবই জরুরি। বর্তমানে কর প্রদানযোগ্য অনেকেই আছেন যারা কর দিচ্ছেন না। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তাদের অধিকাংশই এখনো ইনফর্মাল সেক্টরে রয়েছেন। এটাকে ফর্মাল সেক্টরে নিয়ে আসতে হবে। করজাল উপজেলা পর্যায়ে বিস্তৃত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ন্যাশনাল বোর্ড অব রেভিনিউয়ের অভ্যন্তরীণ সংস্কার সাধন করতে হবে। কেউ যাতে ব্যক্তি স্বার্থ উদ্ধারের জন্য করদাতাদের কর ফাঁকি দানে সহায়তা না করে তা নিশ্চিত করতে হবে। ছাগলকাণ্ডে বিতর্কিত মতিউর রহমানের মতো আরো অনেক মতিউর রহমান এনবিআরে রয়েছেন। এদের কঠিন শস্তির আওতায় নিয়ে আসতে হবে। কথায় বলে, ‘পিছনে শত্রু রেখে যুদ্ধযাত্রা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।’ ঠিক তেমনি এনবিআরের অভ্যন্তরে সুশাসন প্রতিষ্ঠা না করে কর আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ কোনভাবেই পরিপূর্ণভাবে সফল হতে পারে না।