আজ ১৫ জুলাই বুধবার। ২০২৪ইং বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের জন্য ছিল ভয়াবহ একদিন। আজ বুধবার হলেও ২০২৪ সালের এই দিন সোমবার ছিল। এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দিনে দুপুরে শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগের হামলার শিকার হন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। বহিরাগত লোকজন এনে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় ন্যাক্কারজনক হামলা চালানো হয় আন্দোলনরতদের ওপর। বিশেষ করে নারীদের ওপর যে হামলা করা হয় তার বর্ণনা শুনলে গা শিউরে ওঠে। ছাত্রলীগ নামের নরপশুগুলোর নারীদের ওপর হামলার পাশাপাশি শ্লীলতাহানি করতেও অন্তর কাঁপেনি। এদিন আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর হামলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলায় আহতরা ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হলে সেখানেও আরেক দফা হামলা চালানো হয়। ছাত্রলীগের এই হামলায় সারাদেশে শত শত শিক্ষার্থী আহত হন। এর মধ্যে শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আহত হয় প্রায় তিন শত শিক্ষার্থী। তারা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। এরকম ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটলেও হাসিনার সুবিধাভোগী পা চাটা দালাল প্রশাসন কোনো শব্দ করেনি। তারা পুলিশ এবং ছাত্রলীগকে সহায়তা করে। হামলার জন্য সারা দুনিয়া থেকে ছি ছি ধিক্কার এলেও তাদের কোনো কথাই শোনা যায়নি সেদিন। ক্যাম্পাসকে নিজেদের শিক্ষার্থীদের রক্তে রঞ্জিত করে একধরনের পৈশাচিক মজা পেয়েছে হাসিনার সুবিধাভোগীরা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর ব্যঙ্গ করে নানা স্লোগান দিলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা প্রতিক্রিয়া দেখায়। মজার বিষয় হলো বিগত ৫৩ বছর ধরে যে শব্দটি গালি হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছিল এবং মানুষকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য ব্যবহার হয়ে আসছিল সেই শব্দটি বলে মানুষ মজা পাচ্ছিল। বলতে গেলে আওয়ামী লীগকে চেতানোর জন্য রাজাকার শব্দটি ব্যবহার করছিল হাসিনা বিরোধীরা। পরদিন কোটি মানুষের মুখে রাজাকার শব্দটি উচ্চারিত হয় বার বার। এতে রীতিমত ক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া জানান আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা। তারা এই স্লোগান দেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের শায়েস্তা করার ঘোষণা দেন। ছাত্রলীগ এক ধাপ এগিয়ে হামলা করে বসে।

১৫ জুলাই বেলা ১২টার পর থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর অধিভুক্ত সাত কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে রাজু ভাস্কর্যের সামনে জড়ো হন। বিকেল ৩টার দিকে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের হলপাড়ার দিকে মিছিল নিয়ে যান। এদিন দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, রোববার রাতে ক্যাম্পাসে যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ হয়েছে, তার জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগ প্রস্তুত। ওবায়দুল কাদের বলেন, ছাত্রদের বিষয় ক্যাম্পাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। কিন্তু তারা ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ দেখিয়েছে। আমরা দেখি, কারা রাজনৈতিকভাবে প্রকাশ্যে আসে। আমরাও মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘কোটাবিরোধী কতিপয় নেতা যেসব বক্তব্য দিয়েছেন, এর জবাব দেওয়ার জন্য ছাত্রলীগ প্রস্তুত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠে ভ্রান্ত পথে পরিচালিত শিক্ষার্থীদের রাজাকার পরিচয়-সংশ্লিষ্ট স্লোগান আমাদের জাতীয় মৌলিক চেতনার সঙ্গে ধৃষ্টতার শামিল। ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, কোটা সংস্কারের চলমান আন্দোলন নিয়ে আমাদের অবস্থান জানিয়েছি। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই মতামত ব্যক্ত করেছেন। যে বিষয়টি উচ্চ আদালতে বিচারাধীন, সে বিষয় নিয়ে এই মুহূর্তে কিছু বলা সমীচীন নয়। বারবার আন্দোলনকারীদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছি। আন্দোলনের নামে শিক্ষার্থীদের অনেকের রাজনৈতিক বক্তব্য ও কুৎসিত স্লোগান আমরা শুনেছি। এত দিন আমরা যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিলাম, কোটা সংস্কার আন্দোলনের নামে তারা আসলে সরকারবিরোধী আন্দোলনই করতে যাচ্ছে। এর সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতসহ সরকারবিরোধী বিভিন্ন দলের অংশগ্রহণ আছে। সমর্থন তারা প্রকাশ্যেই করেছে। কাজেই আমাদের যে আশঙ্কা, সেটা গতকাল রাতেই আরও স্পষ্ট হয়েছে, তাদের মুক্তিযুদ্ধবিরোধী স্লোগানে সত্য বলেই প্রমাণিত হয়েছে।

সড়ক পরিবহনমন্ত্রী বলেন, ‘ভুলে গেলে চলবে না, বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবিসংবাদিত নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য আত্মত্যাগ করেছে সর্বোচ্চ। মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে আমরা অত্যন্ত সংবেদনশীল। আমরা মনে করি, ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে চিহ্নিত অপশক্তি সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত করতে চায়। তাদের কারসাজিতে তাদের ক্রীড়ানকেরা গতকাল রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের অস্তিত্বকে আঘাত করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী স্লোগান উচ্চারণ করেছে। তারা সমগ্র ছাত্রসমাজকে সরকারের বিপক্ষ শক্তি হিসেবে দাঁড় করানোর অপচেষ্টা করেছে। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য আন্দোলনের নেপথ্যে থাকা মতলববাজ কুশীলবেরা নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বিক্রীত করেছে।

সেতুমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিরা পাবে না তো কি রাজাকারের নাতিÑপুতিরা পাবেÑএ কথা তিনি যথার্থই বলেছেন। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তস্নাত বাংলাদেশের পবিত্র মাটিতে রাজাকারের ঠাঁই দেব না। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে চাই, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কোনো অপমান বাঙালি জাতি সহ্য করবে না। পরাজিত অপশক্তির কোনো প্রকার আস্ফালন আমরা মেনে নেব না। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা কিংবা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কর্মী বেঁচে থাকতে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে স্বাধীনতার পরাজিত অপশক্তির অপতৎপরতা প্রতিরোধ করব।

তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ১৫ জুলাই দুপুরে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন, কোটা আন্দোলনে যারা নিজেদেরকে রাজাকার বলে স্লোগান দিচ্ছে তারা এ যুগের রাজাকার। এ যুগের রাজাকারদের পরিণতি ওই যুগের রাজাকারদের মতোই হবে। তিনি বলেন, যারা প্রকাশ্যে নিজের আত্মপরিচয়, জন্মপরিচয়, ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে, ‘তুমি কে, আমি কে; রাজাকার! রাজাকার!’ স্লোগান দিয়েছে, এরা সবাই এই যুগের রাজাকার। এরা রাষ্ট্র মানে না, আদালত মানে না, ইতিহাস মানে না, এবং সর্বোপরি এই দেশকেই মানে না! তার মন্তব্য রাজাকার আগেও ছিল এবং এর ধারাবাহিকতায় এখনো আছে! ১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে প্রায় ২০% শতাংশ ভোট পড়েছিল নেজামি ইসলামী, মুসলিম লীগ ইত্যাদি মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী পক্ষ তথা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। এই ২০% এর অর্ধেক ১০% ধরে আজকের ১৬ কোটি মানুষের সঙ্গে মেলালে আসবে ১.৬ কোটি। এর মধ্যে ০.৬ কোটিও যদি সারাদিন নিজের রাজাকারির অরাজকতা প্রকাশ করে, বাকি জনগোষ্ঠীর তুলনায় এরা নগণ্যই থাকবে! এদের আওয়াজে বিভ্রান্ত হলে চলবে না! ঘৃণা, ধিক্কার, আর ক্রোধ এদের প্রতি! রাজাকারের দল তোরা, এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ছাড়!

এদিকে ‘১৫ জুলাই দুপুর বারোটায় আমরা রাজু ভাস্কর্যে একটি কর্মসূচি দেয় বৈষম্যবিরোধীরা। একইদিনে ছাত্রলীগ পাল্টা কর্মসূচি দেয়। রাজু ভাস্কর্য থেকে প্রতিদিনকার মতো যখন হলের দিকে মিছিল নিয়ে আসতে থাকে, তখনই বিজয় একাত্তর হলে ছাত্রলীগ নৃশংসভাবে শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা চালায়। এটি দীর্ঘ সময় ধরে চলে। ধারাবাহিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে শিক্ষার্থীরা ১৫ জুলাই ঢাকা কলেজের সামণে দাঁড়ালে ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কলেজের ভিতরে অবস্থান নেয়। পরে খবর আসে ইডেন কলেজের শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসে অবরুদ্ধ করে রেখেছে ছাত্রলীগ। শিক্ষার্থীরা তাদের মুক্ত দুপুরে টিএসসিতে যোগ দেয়। রাজুতে আসার পর খবর পাওয়া যায় কিছু শিক্ষার্থীকে ঢাবির হল পাড়ায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা আটকে রেখেছে। অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে তাদেরকে মুক্ত করতে গেলে হলপাড়ায় ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। পরবর্তীতে হল থেকে বের হয়ে ভিসি চত্বরে গেলে হঠাৎ করেই ছাত্রলীগের মহানগর উত্তর-দক্ষিণ ও ঢাকা কলেজের সন্ত্রাসীরা হামলা চালায়। রাস্তায় ফেলে উপর্যুপরি মারধর করে। সেদিন তারা হাসপাতালে গিয়েও হামলা করে। নারী শিক্ষার্থীদেরও তারা ছাড় দেয়নি।

ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের ওপর বেপরোয়াভাবে আক্রমণ করে। তারা নারী শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের পিটিয়ে আহত করে। বেধড়ক পিটায়। সেদিন নারী শিক্ষার্থীদের ওপর অতর্কিতভাবে হামলা করা হয়। নারী শিক্ষার্থীদের আহত হওয়ার এই ফুটেজ সারাদেশের প্রত্যেকটি বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত করে।

১৫ জুলাই আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গণমাধ্যমকে বলেন, দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ শিক্ষার্থীদের ‘উচিত জবাব’ দেবে। ওবায়দুল কাদেরের নির্দেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হামলা চালায় এবং নির্বিচারে তাদের পিটিয়ে অন্তত ৩০০ বিক্ষোভকারীকে আহত করে। হেলমেট পরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে জোর করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রড ও চাইনিজ কুড়াল নিয়ে প্রবেশ করে এবং পরে ঢামেক হাসপাতালের ভেতরে ও বাইরে আহত বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালায়। হাসপাতালের ভিতরে পার্ক করা বেশ কয়েকটি অ্যাম্বুলেন্স ভাঙচুর করে।

কয়েক ঘণ্টার সংঘর্ষের পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনটি ছাত্রাবাস- ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হল, ফজলুল হক মুসলিম হল ও অমর একুশে হলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এদিকে, সন্ধ্যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের রাজশাহী শাখার হামলায় ছয় শিক্ষার্থী আহত হয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ককে ফোনে পরীক্ষার করার কথা বলে ডেকে ছাত্রলীগের লোকজন তাকে লাঞ্ছিত ও মারধর করে। আন্দোলনকারীরা ১৬ জুলাই বিকাল ৩টায় দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেশব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের ডাক দেন।

এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দফায় দফায় ছাত্রলীগ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ঢাবি এলাকা। নিরীহ ছাত্রীদের ওপর লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলার ছবি আর ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানায় সাধারণ মানুষ। একই দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর বিভিন্ন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। সেইসঙ্গে পুলিশও লাঠি, রাবার বুলেট দিয়ে হামলা করে। দেওয়ালে দেওয়ালে স্বৈরাচারবিরোধী স্লোগান দিয়ে গ্রাফিতি আঁকা শুরু হয়।

১৫ জুলাই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন তার বক্তব্যে বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনে যারা ‘আমি রাজাকার’ স্লোগান দিচ্ছেন, তাদের শেষ দেখে ছাড়বেন? অবশ্য ওই হামলাটাই আন্দোলনকে গতিশীল করে। তারা ভেবেছিল শিক্ষার্থীরা আতঙ্কে ও ভয়ে আর রাস্তায় নামবে না। পূর্বের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চেয়েছিল। ১৫ তারিখে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী আহত হয়। ঢামেকে গাজার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। ছাত্রলীগ হাসপাতালে ঢুকে আহতদের উপর নির্যাতন করে।

এদিন কোটা সংস্কার আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৫ জুলাই ছাত্রলীগ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের ওপরহামলা শুরু করে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে তারা ন্যক্কারজনক ভাবে হামলা করে। তারপরই অভূতপূর্ব একটা প্রতিরোধের ইতিহাস সৃষ্টি হয়েছিলো। জাহাঙ্গীরনগরের সকল হল থেকে সকল শিক্ষার্থী রাস্তায় নেমে আসে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। সন্ত্রাসী ছাত্রলীগকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করে ক্যাম্পাসকে মুক্ত করে।

এর ফলশ্রুতিতে, পরবর্তী সময়ে যে বৃহৎ জায়গা থেকে আমরা আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল সত্যিকার অর্থে সেই জায়গাটায় আন্দোলনটা পৌঁছে যায় এবং জনগণ আন্দোলনে ওতোপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত হয়। বৈষম্য বিরোধী একটা সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে তখন আন্দোলনটা সামনের দিকে এগিয়ে যায়।

১৫ তারিখে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে। এর প্রতিবাদে একটা মিছিল ডাকা হয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্ট্রাল লাইব্রেরী থেকে তখন মিছিলগুলো শুরু হতো। তাই সেদিনও ওখানে সমবেত হয় শিক্ষার্থীরা। ঐ সময় খবর আসে, ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে বলা হয় কিছু নির্দিষ্ট স্লোগান না দিলে তারা ওপর হামলা করবে না। তারা কিছু শর্ত দেয় এবং মিছিল করার স্থান নির্দিষ্ট করে দেয়। সে শর্তগুলো মানা হলে মিছিল করতে দেয়া হবে বলে জানায় তারা। তখনই শিক্ষার্থীরা বুঝতে পাওে ছাত্রলীগ হামলা করবে।

২০২৪ এর ১৫ জুলাই যখন ছাত্রলীগ আক্রমণ শুরু করে অলরেডি তখন সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একটা সাংগঠনিক শক্তি তৈরী হয়। সেই শক্তি ও শিক্ষার্থীদের চাওয়ার সংযুক্তিতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা সহজে আন্দোলনে যুক্ত হতে পেরেছিলো।

২৪’র আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ ছিলো অসাধারণ ও অভূতপূর্ব। সেদিন সবগুলো হল থেকে শিক্ষার্থীরা বের হয়ে এসে মিছিলে যোগ দেয়। সেদিন পুরোপুরিভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে মেয়েদের হলগুলো। মেয়েদের হলগুলো থেকে নারী শিক্ষার্থীরা দলে দলে মিছিলে যুক্ত হয়েছিলো।

১৫ জুলাই রাতেও যখন ছাত্রলীগ হামলা করে তখন কিছু আওয়ামী পন্থী শিক্ষক প্রস্তাব দেয় যে নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপদে হলে পৌঁছে দিবে। কিন্তু নারী শিক্ষার্থীরা সেটা মেনে নেয়নি। কারণ তারা চলে গেলে ছেলেদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালানো হবে। তাই তারা সেখানে অবস্থান করে নিজেরাও হামলার সম্মুখীন হয়েছিলো, তবুও ছেলে শিক্ষার্থীদের ছেড়ে যায়নি।

ছাত্রলীগ ১৫ জুলাই আরো ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। সামাজিক মাধ্যমে তারা নানা হুমকি দিতে থাকে। বিকেলে পুনরায় বিক্ষোভ মিছিল বের করলে, মিছিলটি শেখ মুজিবুর রহমান হলের সামনে পৌঁছালে ছাত্রলীগ লাঠি ও দেশীয় অস্ত্র দিয়ে আমাদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। সেখানে বেশ কিছু নারী শিক্ষার্থীসহ অনেকেই আহত হন।

হামলার প্রতিবাদে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয় শিক্ষার্থীরা এবং নিরাপত্তা ও বিচার দাবি করি। কিন্তু প্রশাসন নীরব থাকে। এসময় জানা যায় ছাত্রলীগ বাইরের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের এনে পুনরায় হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেসময়ও ছাত্রলীগ উপাচার্য ভবনে আশ্রয় নেয়া ক্লান্তশ্রান্ত আন্দোলনকারীদের ওপর নারকীয় হামলা চালায়। অসংখ্য শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। হামলার খবর দ্রুত সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো সাধারণ শিক্ষার্থী রাতেই রাস্তায় নামে। মিছিল করে তারা উপাচার্য ভবনের সামনে যায় এবং আন্দোলনকারীদের উদ্ধার করে আনে। সে রাতেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রথমবারের মতো ‘ছাত্রলীগ মুক্ত’ ঘোষণা করা হয়।

ছাত্রলীগের হামলার বিষয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘৫ শতাধিক শিক্ষার্থীর ওপর হামলা করা হয়েছে। আহতদের মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার পরও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা হামলা করেছে। ককটেল নিক্ষেপ করেছে। পুলিশ কোনো ধরনের সহযোগিতা করেনি। আমাদের ওপর এ হামলা পরিকল্পিত। এ হামলার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।’ ক্যাম্পাসের সহিংসতার ঘটনায় করণীয় ঠিক করতে এদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব হলের প্রাধ্যক্ষদের নিয়ে বেঠক করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম মাকসুদ কামাল। বৈঠক শেষে উপাচার্য বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার জন্য আমাদের প্রাধ্যক্ষরা রাতভর হলে অবস্থান করবেন।’

সংঘর্ষের পর ক্যাম্পাসের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয় পুলিশ। সন্ধ্যার পরপরই ক্যাম্পাসে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন করা হয়। ১৫ জুলাই রাত ১০টার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মোবাইল তল্লাশি ও মারধর করে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। স্যার এ এফ রহমান হল, বিজয় একাত্তর হল, মাস্টারদা সূর্যসেন হল ও শহীদ সার্জেন্ট জহরুল হক হলে এমন ঘটনা ঘটে। শিক্ষার্থীরা কোটা আন্দোলন যুক্ত কি না, তা যাচাই করতে শিক্ষার্থীদের মোবাইল তল্লাশি করা হয়। আন্দোলনে সম্পৃক্ততা পেলেই মারধর করা হয়। এদিন রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে যেতে বাধা ও মারধর করেকলেজ ছাত্রলীগের নেত্রীরা।

কোটা আন্দোলনকারীদের নিয়ে শেখ হাসিনার কটুক্তির প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পুলিশি বাধা অতিক্রম করে পুরান ঢাকা থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে এসে বিক্ষোভে যোগ দেন। এর আগে জবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ ও কোটা আন্দোলনকারীদের পাল্টাপাল্টি সংঘর্ষে পাঁচ শিক্ষার্থী আহত হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পূর্বঘোষিত বিক্ষোভ মিছিলে দফায় দফায় হামলা করে শাখা ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। ছাত্রলীগের হামলায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জাবি শাখার সমন্বয়ক আবদুর রশিদ জিতুসহ ১৫ জন আহত হন। এর আগে ১৪ জুলাই মধ্যরাতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। রাত সাড়ে ১২টার দিকে শতাধিক বহিরাগত নিয়ে এ হামলা চালানো হয়। এতে অর্ধশত শিক্ষার্থী আহত হন। পরে তারা ভিসির বাসভবনে আশ্রয় নেন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর সেদিন দুই দফা হামলা চালায় ছাত্রলীগ। এতে ১০ জন শিক্ষার্থী আহত হয়। বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার ও কাটাপাহাড় সড়কে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এছাড়াও চট্টগ্রাম শহরেও কোটাবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষ হয়। এতে সাংবাদিক ও পুলিশসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হন। এদিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ বাম ছাত্রসংগঠনের নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালায়। এতে কয়েকজন আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মমতাজ উদ্দিন কলাভবনের সামনে এ ঘটনা ঘটে। যশোরে এম এম কলেজের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ মিছিলে হামলা করে ছাত্রলীগ। দুপুুরে আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কাছাকাছি পৌঁছালে ছাত্রলীগ তাদের ওপর হামলা চালায়। এদিন শিক্ষার্থীদের ওপর হামলায় জড়িত ছাত্রলীগ নেতাদের বিচারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর বরাবর স্মারকলিপি দেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা।

এদিকে কোটা সংস্কারের দাবিতে রাজধানীর নতুন বাজার, কুড়িল বিশ্বরোড এলাকায় সড়ক অবরোধ করেন বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এদিন দুপুর থেকে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন। এছাড়া রাজধানীর বাইরে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি), কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (খুবি), খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেন।