বেনাপোল (যশোর) সংবাদদাতা : দেশের সর্ববৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবিতে ছাত্র জনতার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচীতে উত্তাল হয়ে ওঠে সীমান্তবর্তী এই জনপদ।
রবিবার ১৯ এপ্রিল বেনাপোল বলফিল্ড এলাকায় ‘বেনাপোলবাসী’ ব্যানারে এ কর্মসূচী শুরু হয়। এতে ছাত্র-যুবসমাজ, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ, গণমাধ্যম কর্মীসহ সর্বস্তরের জন গণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখা যায়।
বিক্ষোভকারীরা বলেন, আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর ও প্রথম শ্রেণির পৌরসভা হওয়া সত্ত্বেও বেনাপোলে এখনো একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি হাসপাতাল গড়ে ওঠেনি,যা স্থানীয়দের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।জরুরি চিকিৎসার জন্য রোগীদের শার্শা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নাভারণ কিংবা প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরের যশোর জেনারেল হাসপাতালে নিতে হয়।দীর্ঘ পথ,যানজট ও সময় ক্ষেপণের কারণে অনেক রোগী পথেই মারা যায়।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা আধুনিক বেনাপোল চাই, যেখানে মানুষের জীবন রক্ষার ন্যূনতম ব্যবস্থা থাকবে।একটি হাস পাতাল আমাদের মৌলিক অধিকার।একব্যবসায়ী বলেন, বেনাপোল থেকে সরকার বছরে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব পায়,এখানকার মানুষের জন্য চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই, এটা অত্যন্ত দুঃখ জনক।
বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল- বেনাপোলে হাসপাতাল চাই রক্ত দেব রাজ পথে, তবুও হাসপাতাল গড়ব, ওহে মহারাজ, আর কত প্রাণ বিসর্জন দিলে আপনার নিরবতা ভাঙবে এমন নানা স্লোগানে দুঃখ-ভারক্রান্ত হয়ে ওঠেপুরো এলাকা।
এদিন বেনাপোল-যশোর মহাসড়কে কর্মসূচির কারণে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।প্রায় ৩ঘন্টা চল মান কর্মসূচীতে বেনাপোল স্থলবন্দরের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যে মারাত্বকভাবে প্রভাব পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ সদস্যদের পাশা পাশি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদেরও মাঠে দেখা যায়।তবে পুরো কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়।
যশোরের নাভারণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার এএসপি আরিফ হোসেন বলেন,হাসপাতাল এর দাবিতে জনগণের কর্মসূচি ছিল শান্তিপূর্ণ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আমরা সতর্ক অবস্থানে ছিলাম, সড়কে যানচলাচল স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ কাজ করেছে এবং বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
আন্দোলনের সময় তিনি ছাত্র-জনতার উদ্দেশ্যে বলেন, বেনাপোলবাসীর হাসপাতালের দাবি দীর্ঘ দিনের। বিষয়টি আমরা গুরুত্বসহকারে দেখছি এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ইতোমধ্যে অবহিত করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তার প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ইতিমধ্যে শার্শা উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কাছে পৌঁছেগেছে।
মানববন্ধন শেষে আন্দোলনকারীরা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সরকারের উচ্চপর্যায়ে স্মারক লিপি দেওয়ার ঘোষণা দেন।পাশাপাশি দ্রুত হাস পাতাল নির্মাণে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দেন তারা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষের বসবাসকারী শার্শা উপজেলায় বর্তমানে মাত্র একটি হাসপাতাল রয়েছে, যা ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠিত। দীর্ঘদিন ধরে অবহেলায় হাসপাতাল ভবনটি জরাজীর্ণ, ঝুঁকিপূর্ণ ও নাজুক অবস্থায় রয়েছে।
এছাড়া ২০১৫ সালে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও বর্তমানে জনবল রয়েছে মাত্র ৩১ জন। প্রতিদিন হাসপাতালে ৮০- ১০০ জন রোগী ভর্তি থাকে এবং বহির্বিভাগে৭০০ -৮০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসক ওজনবলের অভাবে চিকিৎসাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীনে থাকা ১২টি ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রের অধিকাংশ ভবন জরাজীর্ণ ও ব্যবহার অনুপযোগী।৭টির কোনো নিজস্ব ভবন নেই এবং জনবলের অভাবে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।উপজেলার ৩৯ টি কমিউনিটি ক্লিনিকের মধ্যে ৩৪টিতে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ না থাকায় সেবা কার্য ক্রমে বিঘœ ঘটছে।
শার্শা উপজেলার বেনাপোল দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর।এখানে প্রায় ৫০হাজার মানুষের বসবাস প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ হাজার দেশি-বিদেশি নাগরিক এপথ দিয়ে ভারত-বাংলাদেশ যাতায়াত করেন।প্রায় পাঁচ সহস্রাধিক শ্রমিক বেনাপোল স্থল বন্দরে কর্মরত থাকলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয়দের মতে, প্রতিদিন হাজার হাজার পাসপোর্টযাত্রী ও বন্দরের শ্রমিকদের চলাচল থাকা এই গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে অন্তত ৫০ শয্যা বিশিষ্ট একটি আধুনিক হাসপাতাল এখন সময়ের দাবি।