যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে চলমান বিভিন্ন আলোচনা ও কূটনৈতিক তৎপরতার ওপর ইসরাইল নজরদারি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে--এমন গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ইসরাইলি গুপ্তচরবৃত্তির হুমকিকে নিজেদের অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন ব্যবস্থার সর্বোচ্চ স্তর ‘ক্রিটিক্যাল’ বা ‘চরম ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগ পেন্টাগন। মার্কিন গোয়েন্দা ও প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ এবং দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস এই চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছে। পেন্টাগনের ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (ডিআইএ) পূর্বে ইসরাইলের এই থ্রেট লেভেল বা হুমকির মাত্রা ‘উচ্চ’ অবস্থানে রাখলেও সম্প্রতি মার্কিন কর্মকর্তাদের ওপর নজরদারি বৃদ্ধি পাওয়ায় এটিকে সর্বোচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ক্যাটাগরিতে উন্নীত করা হয়েছে। ওয়াশিংটন যখন ইরানের সাথে চলমান যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এই গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধির খবর সামনে এলো। রোববার (৭ জুন) নাগাদ ১০০ দিনে পদার্পণ করা এই যুদ্ধ অবসান নিয়ে ওয়াশিংটন ও তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশ ইসরাইলের মধ্যে স্পষ্ট মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপের মুখে এই যুদ্ধ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করতে কূটনৈতিক পথ খুঁজছেন, অন্যদিকে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো ইরানি সরকারকে উৎখাত করার নীতিতে অনড় রয়েছেন। বিশেষ করে মার্কিন বিশেষ দূত ও প্রধান আলোচক স্টিভ উইটকফ, পেন্টাগনের শীর্ষ নীতি নির্ধারণী কর্মকর্তা এলব্রিজ এ কোলবি এবং তার ডেপুটি মাইকেল পি ডিমিনোকে লক্ষ্য করে ইসরাইলের পক্ষ থেকে ব্যাপক নজরদারি চালানো হচ্ছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমনকি ইসরাইলে কর্মরত বেশ কয়েকজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার ফোনে গোপনে আড়িপাতার সফটওয়্যার বা স্পাইওয়্যার ইনস্টল করার ঘটনাও ধরা পড়েছে। আল-জাজিরা, সিএনএন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যেকোনো দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ইসরাইলের সামরিক স্বাধীনতাকে সংকুচিত করতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই ইসরাইল রিয়েল-টাইমে ওয়াশিংটনের আলোচনার গতিপ্রকৃতি জানতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। ইসরাইল যদি মনে করে এই আলোচনা তাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী, তবে তারা যেকোনো মূল্যে এই চুক্তিকে নস্যাৎ করার চেষ্টা করবে। অবশ্য ওয়াশিংটনে নিযুক্ত ইসরাইলি দূতাবাস এই পুরো অভিযোগকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে। তাদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ইসরাইল কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের মতো বন্ধুভাবাপন্ন কোনো রাষ্ট্রের ওপর কিংবা মার্কিন সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর গোয়েন্দাগিরি চালায় না।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তাও নাম প্রকাশ না করে এই প্রতিবেদনকে বানোয়াট বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তবে মার্কিন প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক অস্বীকৃতি সত্ত্বেও পেন্টাগনের এই অভ্যন্তরীণ থ্রেট লেভেল বৃদ্ধি ইঙ্গিত দেয় যে, ইরানের সাথে চুক্তির প্রশ্নে ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের স্বার্থের দ্বন্দ্ব এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।
হরমুজ প্রণালি চালু করতে
যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ইরান হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করার বিষয়ে ৩০ দিনের একটি সময়সীমা (ডেডলাইন) বেঁধে দিতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন দেশটির পরমাণু সমঝোতা বা শান্তি আলোচনার অন্যতম মধ্যস্থতাকারী মজিদ শাকেরি।
সম্প্রতি ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ এজেন্সিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য জানান।
ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক আলোচনায় অংশ নেওয়া এই কূটনীতিক বলেন, নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী তেহরানের ঘোষণা করা উচিত যে, যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের পক্ষ থেকে সব ধরনের হুমকি প্রত্যাহার করার ৩০ দিন পর কেবল ইরানি ব্যবস্থাপনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা সম্ভব হবে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি হামলা শুরু হওয়ার পর ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটি কার্যত বন্ধ করে দেয়। এর জবাবে গত এপ্রিল মাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই প্রণালিতে একটি নৌ অবরোধ আরোপ করে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা স্থবির হয়ে থাকায় এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। মার্কিন প্রশাসন অবশ্য জোর দিয়ে বলে আসছে যে, যুদ্ধ শেষে কোনো ধরনের টোল বা শর্ত ছাড়াই হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক শিপিংয়ের জন্য সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করতে হবে। পক্ষান্তরে, ওমানের পাশাপাশি এই প্রণালীর ওপর নিজেদের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি বারবার পুনর্ব্যক্ত করে আসছে ইরানি কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে ইরানের অনুমতি নিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকারী জাহাজগুলোকে গড়ে ১৫ থেকে ২০ লাখ (১.৫ থেকে ২ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার ফি দিতে হচ্ছে বলে দেশটির সংসদের একজন সিনিয়র সদস্য জানিয়েছেন।
এরই মধ্যে, হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল এবং পরিবেশগত পরিষেবা ফি আদায়ের একটি প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ইরানের পরিবেশ বিভাগের প্রধান শিনা আনসারি। ইরানের আধা-সরকারি তাসনিম নিউজ এজেন্সিকে তিনি বলেন, এই আলোচনার উদ্দেশ্য কেবল ফি সংগ্রহ করা নয়। বরং এর সাথে বিভিন্ন ধরনের পরিষেবা প্রদানের বিষয়টি জড়িত। এসব পরিষেবার মধ্যে নৌচলাচল নির্দেশিকা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার অভিযান, জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং সামুদ্রিক পরিবেশ রক্ষা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
আনসারি আরও উল্লেখ করেন, প্রস্তাবিত ফি-র একটি অংশ শিপিং ট্রাফিকের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতি এবং সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের ঝুঁকির সাথে সম্পর্কিত থাকবে। সব মিলিয়ে, আলোচনায় অচলাবস্থা তৈরি হওয়ায় এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথের ভবিষ্যৎ নিয়ে বর্তমানে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।