হুসাইন বিন আফতাব, শ্যামনগর (সাতক্ষীরা) সংবাদদাতা: উপকূল রক্ষার প্রধান অবলম্বন শ্যামনগরের বেড়িবাঁধের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ও ধস দেখা দেওয়ায় নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছে পুরো জনপদ। বর্ষা ও ঘূর্ণিঝড় মৌসুম সামনে রেখে দুর্বল বাঁধ ঘিরে বাড়ছে শঙ্কা। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, উপজেলার প্রায় ১৭০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে অন্তত ৪ কিলোমিটার অংশ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।

শ্যামনগর উপজেলার উপকূলীয় এলাকার বেড়িবাঁধের একাধিক স্থানে ফাটল, ধস ও ক্ষয় দেখা দেওয়ায় সার্বিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। নদীভাঙন, জোয়ার-ভাটার চাপ, লবণাক্ত পানির প্রভাব এবং দীর্ঘদিনের দুর্বল রক্ষণাবেক্ষণের কারণে বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, উপজেলার প্রায় ১৭০ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে অন্তত ৪ কিলোমিটার অংশ বর্তমানে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত।

সাম্প্রতিক সময়ে চুনকুড়ি নদীর তীরে সিংহড়তলী এলাকায় প্রায় দশ মিটার জুড়ে ফাটল দেখা দেওয়ার পর বাঁধের একটি অংশ ধসে পড়ে। একই সময়ে খোলপেটুয়া নদীর তীরবর্তী বিভিন্ন এলাকায় ভাঙন, ক্ষয় ও দুর্বলতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, প্রতিদিনের জোয়ার-ভাটার চাপে বাঁধের পাদদেশ নরম হয়ে যাচ্ছে এবং কোথাও কোথাও স্লোপ ধসে পড়ছে, যা দ্রুত মেরামত না করলে বড় ধরনের ভাঙনে রূপ নিতে পারে।

মে মাস থেকে উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় মৌসুম শুরু হওয়ায় পরিস্থিতি আরও গুরুত্ব পাচ্ছে। অতীতে ‘সিডর’, ‘আইলা’, ‘আম্পান’ ও ‘ইয়াস’ ঘূর্ণিঝড়ের সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে শ্যামনগরের বিস্তীর্ণ এলাকা জলোচ্ছ্বাসে প্লাবিত হয়েছিল। এতে বসতঘর, ফসলি জমি, মাছের ঘের এবং গ্রামীণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই স্থানীয়রা বর্তমান ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো নিয়ে উদ্বিগ্ন।

উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের পল্লী চিকিৎসক আশরাফুল আলম জানান, ২৫ মার্চ ২০০৯ সালে ‘আইলা’ ঘূর্ণিঝড়ে বেড়িবাঁধ ভেঙে পুরো এলাকা প্লাবিত হয় এবং তার ওষুধের ঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা লালচাঁদ মিয়ার স্ত্রী সূর্য বিবি জলোচ্ছ্বাসের পানিতে ডুবে মারা যান এবং তাদের ঘরবাড়ি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। কামাল শেখ জানান, তার গবাদিপশু জলোচ্ছ্বাসে ভেসে যায়। ৯ নম্বর সোরা এলাকায় বাঁধ ভেঙে আব্দুল খালেকের চার বছর বয়সী ছেলে ওবায়দুল্লাহ পানিতে ভেসে মারা যায়। একই ঘটনায় আব্দুল গফুরের ছেলে আশরাফুল (৩) ও কন্যা ফাতেমা (১) প্রাণ হারায়।

গাবুরা ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, আইলার সময় প্রায় ৮০ কিলোমিটার রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো পুরোপুরি সংস্কার করা সম্ভব হয়নি। ওই দুর্যোগে প্রায় এক হাজার ঘরবাড়ি ভেসে যায় এবং ৫৫ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর মৃত্যু হয় বলে তিনি জানান। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে অনেক বাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকায় নতুন করে দুর্যোগ দেখা দিলে ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা জানান, শ্যামনগরসহ সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বিভিন্ন স্থানে বেড়িবাঁধ সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তবে অর্থ বরাদ্দ, প্রকল্প বাস্তবায়ন বিলম্ব এবং ভৌগোলিক জটিলতার কারণে কিছু কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। এতে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব হচ্ছে না।

উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী ইমরান সরকার বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ ৪ কিলোমিটার বাঁধ সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রাখা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রস্তুতি রয়েছে এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী সুমন জানান, বেড়িবাঁধের জরুরি মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় বালুর বস্তা, জিও ব্যাগসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম স্থানীয়ভাবে মজুদ রাখা হয়েছে এবং যেকোনো ভাঙন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য তারা প্রস্তুত আছেন।

এদিকে, ‘সাতক্ষীরা জেলার পোল্ডার-১৫ পুনর্বাসন’ প্রকল্পের আওতায় শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। প্রায় ১০২০ দশমিক ৪২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে ২৯ দশমিক ২০ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ, ৫টি রেগুলেটার প্রতিস্থাপন এবং ৯টি ইনলেট নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পটির অগ্রগতি বর্তমানে প্রায় ৬০ শতাংশ। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে গাবুরা ইউনিয়নের প্রায় ৩৪৪১ হেক্টর এলাকা বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি থেকে সুরক্ষা পাবে এবং পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত হবে।

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম বলেন, উপকূলীয় এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঝুঁকিপূর্ণ বেড়িবাঁধসমূহ ধাপে ধাপে সংস্কার ও শক্তিশালীকরণ করা হচ্ছে। চলমান প্রকল্পসমূহ দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও টেকসই অবকাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বাড়ছে। এ অবস্থায় অস্থায়ী মেরামতের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় টেকসই ও উচ্চমানের বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা না হলে শ্যামনগরের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো বারবার ক্ষতির মুখে পড়বে।