মুঃ শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : মাঠ ভরা মানুষ, চোখে উত্তেজনা, কানে ভেসে আসে লাঠির ঝনঝন শব্দ একসময় এ দৃশ্য ছিল চাঁপাইনবাবগঞ্জের গ্রাম বাংলার প্রাণ। বিকেলের শেষ আলোয় যখন ধুলোমাখা মাঠে লাঠিয়ালরা নেমে আসত, তখন সেটি আর শুধু খেলা থাকত না—এটি হয়ে উঠত সাহস, কৌশল আর সংস্কৃতির এক জীবন্ত মঞ্চ। কিন্তু আজ, সেই লাঠির ঝংকার যেন ইতিহাসের পাতায় বন্দি—নীরব, নিস্তব্ধ, হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি।

লাঠি খেলা ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি শুধু বিনোদন নয়—আত্মরক্ষার কৌশল, শৃঙ্খলার শিক্ষা এবং সামাজিক সংহতির এক শক্তিশালী মাধ্যম। একসময় গ্রামের প্রতিটি তরুণের হাতে লাঠি দেখা যেত; কেউ শিখত আত্মরক্ষার জন্য, কেউবা অংশ নিত প্রতিযোগিতায়। একজন ওস্তাদের অধীনে দীর্ঘদিন অনুশীলনের মাধ্যমে তৈরি হতো দক্ষ লাঠিয়াল। লাঠির প্রতিটি ঘূর্ণন, প্রতিটি আঘাত ছিল নিখুঁত কৌশলের ফল—যেখানে শক্তি আর বুদ্ধির মেলবন্ধন ঘটত অনন্যভাবে।

ঈদ,মহরম,পূজা কিংবা বৈশাখী মেলা—যে কোনো উৎসবেই লাঠি খেলা ছিল প্রধান আকর্ষণ। গ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ তৈরি হতো, দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমাত শুধু এই খেলা দেখার জন্য। লাঠিয়ালদের দলগুলো নিজেদের দক্ষতা দেখাতে মুখিয়ে থাকত। বিজয়ী দল পেত সম্মান, মর্যাদা—আর সেই গর্ব ছড়িয়ে পড়ত পুরো গ্রামে।

কিন্তু সময় বদলেছে। আধুনিকতার ঢেউ এসে গ্রাস করেছে গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক কিছুই। মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট আর শহরমুখী জীবনের আকর্ষণে তরুণ প্রজন্ম আজ মাঠ ছেড়ে পর্দায় বন্দি। যেখানে একসময় বিকেল মানেই ছিল লাঠির মহড়া, এখন সেখানে নীরবতা। লাঠি খেলার জায়গা দখল করেছে ভার্চুয়াল বিনোদন।

আরেকটি বড় কারণ হলো পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। একসময় জমিদার বা গ্রামের প্রভাবশালীরা লাঠিয়াল দলকে উৎসাহ দিতেন, আয়োজন করতেন প্রতিযোগিতার। এখন সেই পৃষ্ঠপোষকতা নেই বললেই চলে। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে এই খেলা হয়ে উঠেছে অচেনা, অপ্রাসঙ্গিক।

তবুও আশার আলো পুরোপুরি নিভে যায়নি। দেশের কিছু অঞ্চলে এখনো লাঠি খেলার ক্ষীণ চর্চা টিকে আছে। কিছু সাংস্কৃতিক সংগঠন ও সচেতন মানুষ এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু বিচ্ছিন্ন এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, নিয়মিত প্রতিযোগিতা এবং শিক্ষাব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তির মতো দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা।

লাঠি খেলা শুধু একটি খেলা নয়—এটি আমাদের ইতিহাস, আমাদের শিকড়, আমাদের আত্মপরিচয়ের অংশ। এটিকে হারিয়ে যেতে দেওয়া মানে আমাদের সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় মুছে ফেলা।

আজ প্রশ্ন একটাই—আমরা কি এই ঐতিহ্যকে কেবল স্মৃতির পাতায় রেখে দেব, নাকি নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিয়ে আবারও মাঠে ফিরিয়ে আনব সেই লাঠির ঝংকার?

সময় এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার। কারণ ঐতিহ্য একবার হারিয়ে গেলে, তাকে ফিরিয়ে আনা আর সহজ থাকে না।