এম, এ জাফর লিটন শাহজাদপুর (সিরাজগঞ্জ) : ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে সিরাজগঞ্জ-৬ শাহজাদপুরের রাজনীতি সরব হয়ে উঠেছে। জুলাই -আগষ্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর মাঠে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগ এবং তাদের মিত্রদের সাংগঠনিক কার্যক্রম না থাকায় এ আসনে দীর্ঘদিনের বন্ধু প্রতীম দুই রাজনৈতিক দল জামায়াত ও বিএনপি হয়ে উঠছে একে অপরের মূল প্রতিদ্বন্দ্বি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি থেকে একাধিক ব্যক্তি দলীয় মনোনয়ন চাইলেও বিপরীতে জামায়াতে ইসলামী দলীয় প্রার্থী চুড়ান্ত করে মাঠ গোছাতে শুরু করেছে। বিএনপির মনোনয়ন লড়াইয়ের সুযোগে দলকে সুসংগঠিত করে আগামী নির্বাচনে চমক দেখাতে চায় জামায়াতে ইসলামী। শাহজাদপুর উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে সিরাজগঞ্জ-৬ আসন গঠিত। দেশের বৃহত্তম দুগ্ধ উৎপাদন কারখানা (মিল্কভিটা), উত্তরাঞ্চলের বৃহত্তম বাঘাবাড়ী নদী বন্দর,তাঁত শিল্প, বৃহত্তম কাপড়ের হাট, রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় এই আসনে অবস্থিত। তাই মর্যাদা ও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে সকল রাজনৈতিক দলের কাছে আসনটির গুরুত্ব বেশি। বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনে এই আসনে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি দুইবার, জাতীয় পার্টি ২ বার, স্বতন্ত্র একবার,চারদলীয় ঐক্যজোট একবার বিজয়ী হয়েছে। এমন সমীকরণ সামনে রেখেই এ আসনে প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী। ১৯৯৬ সালের পর এককভাবে প্রথমবারের মতো এ আসনে চমক দেখাতে চায় জামায়াত। এ আসনে বর্তমানে মোট ভোটার ৪,৫৬,৩৭৯ (ডিসেম্বর ২০২৩) পুরুষ ভোটার: ২,৩১,৭৯০ নারী ভোটার: ২,২৪,৫৮৭ হিজড়া ভোটার: ২জন। তবে আগামী নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

বিএনপিতে দলীয় মনোনয়ন যুদ্ধে কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। আপাতত এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী চার নেতা প্রচারণা চালাচ্ছেন। সাবেক উপপ্রধান মন্ত্রী মরহুম ডাঃ এম এ মতিনের পুত্র সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির সদস্য প্রফেসর ড. এম এ মুহিত ২০১৮ সালের মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ধানের শীষের মনোনয়ন প্রত্যাশী। সর্বশেষ ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি ২০ দলীয় জোট সমর্থিত ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন। তার প্রতিদ্বন্দ্বি হচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা ও জেলা সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির সদস্য গোলাম সারোয়ার ও জেলা বিএনপির যুগ্ন সাধারণ সম্পাদক ও মিল্কভিটার ভাইস চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মনির,জেলা বিএনপি’র উপদেষ্টা সাবেক ছাত্রনেতা শফিকুল ইসলাম ছালাম।এছাড়াও এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার সাদাত টুটুল,এনসিপির কেন্দ্রীয় কোষাধ্যক্ষ সাঈফ মোস্তাফিজ এ আসনে প্রার্থী হচ্ছেন। পর্যবেক্ষকমহল বলছেন, এক সময়ে বিএনপি’র দুর্গ হিসেবে পরিচিত শাহজাদপুরে আগামী নির্বাচনে বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ মনোনয়ন ও পদপদবী কেন্দ্রীক দলীয় বিভেদ। বিএনপির রাজনীতিতে এ বিভেদ প্রকাশ্যে এসেছে ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর। তাই নির্বাচনী বৈতরণী পাড় হতে হলে একটি ঐক্যবদ্ধ বিএনপি এখন সময়ের দাবী। তৃণমূল থেকে উপজেলা নেতৃত্বকে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত করতে না পারলে নির্বাচনে বিএনপিকে মাশুল গুণতে হবে বলেও মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

এ ব্যাপারে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ও উপজেলা জামায়াতে আমীর অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেন, আগামী নির্বাচন সামনে রেখে আমরা মানুষের কাছে যাচ্ছি। জামায়াতে ইসলামীর প্রতি অতীতের চেয়ে মানুষের ভালোবাসা বেড়েছে। মানুষ চায়, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ। এজন্য জামায়াতের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। স্বাধীনতার পর এই প্রথমবারের মতো সারা দেশের ন্যায় শাহজাদপুর আসনেও আওয়ামীলীগহীন নির্বাচনে ভোট যুদ্ধে অবতীর্ণ হবে দুই বন্ধু প্রতীম সংগঠন বিএনপি ও জামায়াত। অবাধ , সুষ্ঠ নির্বাচনে বিএনপি এ আসনে নিশ্চিত বিজয়ের স্বপ্ন দেখলেও মানতে নারাজ জামায়াত। সাংগঠনিক সক্ষমতা প্রমান করে শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বিতা দিয়ে চমক দেখানোর অপেক্ষায় জামায়াত নেতা-কর্মীরা। শেষ পর্যন্ত এ আসনে কারা হচ্ছেন আগামী দিনের কান্ডারী তা নির্ধারণ করবেন ভোটাররা।

তবে উপজেলা বিএনপি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক ছাত্রনেতা আরিফুজ্জামান আরিফ বলেন, আগামী নির্বাচনকে ঘিরে বিএনপির ব্যাপক প্রস্তুতি রয়েছে। মনোনয়ন নিয়ে প্রতিযোগীতা থাকলেও আমরা সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ আছি।

শাহজাদপুর আসনে বিএনপির অপর মনোনয়ন প্রত্য্শাী জাতীয়তাবাদী স্বচ্ছোসেবক দলের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি ও উপজেলা সম্মেলন প্রস্তুত কমিটির যুগ্ম সমন্বয়ক গোলাম সারোয়ার বলেন, শাহজাদপুর বিএনপি’র দুর্গ । দলের মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে। তবে আদর্শিক বিরোধ নেই। বিএনপি যাকে মনোনয়ন দেবে, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবেই কাজ করবো।

এদিকে এই আসনে জামায়াতে ইসলামী কখনও বিজয়ী না হলেও দলটির সাংগঠনিক অবস্থা অনেকটা শক্তিশালী। রয়েছে সমৃদ্ধ ভোট ব্যাংক। এ আসনে ১৯৯৬ সালে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে এককভাবে জামায়াতের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি মাওঃ রফিকুল ইসলাম খাঁন নির্বাচন করেছিলেন। তখন তিনি ১৮ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে তৃতীয় হয়েছিলেন। এরপর বিএনপি’র সাথে জোট বদ্ধ থাকায় বিগত সকল জাতীয় নির্বাচনে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে দলটি। ৫ আগষ্টের পর এ আসনে সাংগঠনিক তৎপরতা ব্যাপক বৃদ্ধি করেছে জামায়াত। উল্লেখ যোগ্য হারে বেড়েছে কর্মী সমর্থকও। শাহজাদপুর উপজেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক মাওঃ মিজানুর রহমানকে কেন্দ্র থেকে আগামী সংসদ নির্বাচনে জামায়াতের প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দিয়েছেন। ফলে আগে ভাগেই চালাচ্ছেন প্রচারণা ও গণসংযোগ। মূল জামায়াত ছাড়াও, যুব জামায়াত, মহিলা জামায়াত, ইসলামী ছাত্রশিবির, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনসহ সকল অঙ্গ সংগঠন তৃনমূলে তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে। দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে জামায়াত সাংগঠনিকভাবে নানা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। সামাজিক ও ধর্মীয় কর্মসূচিও বেড়েছে দলটির। দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে রাজনীতি করতে না পারা জামায়াত এখন পুরোদমে নির্বাচনি প্রস্তুতি নিচ্ছে।