দেশের উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রমিকদের অবদান অনস্বীকার্য। কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বন্দর কিংবা রপ্তানি খাত—সর্বত্র শ্রমিকের ঘাম ও শ্রম জাতীয় অগ্রগতির ভিত্তি। অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় অনেক শ্রমিক এখনো ন্যায্য মজুরি ও সম্মানজনক কর্মপরিবেশ থেকে বঞ্চিত। তাই শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে ইসলামী শ্রমনীতির বিকল্প নেই।
শুক্রবার (১০ জুলাই) যশোরের জেলা পরিষদে (বিডি হল) বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন যশোর জেলার উদ্যোগে আয়োজিত এক ‘দায়িত্বশীল সমাবেশে’ সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ কথা বলেন। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের যশোর জেলার সভাপতি ও কেন্দ্রীয় কার্যকরি পরিষদ সদস্য আব্দুল মালেক খান।
প্রধান অতিথি এডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের লক্ষ্য কেবল একটি শ্রমিক সংগঠন হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করা নয়, বরং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা। দীর্ঘ সময় ধরে শ্রমিকরা বৈষম্য, কম মজুরি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের শিকার হলেও তাদের প্রকৃত কল্যাণে কার্যকর উদ্যোগ খুব কমই দেখা গেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, মানব রচিত বিভিন্ন মতবাদ অতীতে শ্রমিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারেনি। ইসলামের ন্যায়, ইনসাফ ও মানবিকতার আদর্শই শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার সর্বোত্তম পথ। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, মর্যাদা ও মানবিক আচরণের যে শিক্ষা দিয়েছেন, সেই আদর্শ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করা সম্ভব।
তিনি সংগঠনের নেতাকর্মীদের সততা, দক্ষতা ও আদর্শিক চেতনা নিয়ে প্রতিটি কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পরিবহন, বন্দর, টার্মিনালসহ সব খাতে চাঁদাবাজি, জুলুম ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিগত সরকারগুলোর সমালোচনা করে তিনি বলেন, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা প্রায় ৫৫ বছর পার করছি। এদেশে যখন যারা ক্ষমতায় আসেন, তারা শ্রমিকদের নিয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর কথা বলেন। কিন্তু বাস্তবে বিগত ৫৫ বছরে বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভাগ্য উন্নয়নে কোনো সরকারকে আন্তরিক পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। সরকার আসে, সরকার যায়, নীতি বদলায়, বাজেট আসে-যায় অথচ শ্রমিকদের ভাগ্যের চাকা কখনো ঘোরে না।
কৃষি শ্রমিকদের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি আরও বলেন, পার্লামেন্টে যখন বলা হয় বাংলাদেশ কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ, তখন মন্ত্রীরা ভুলে যান যে এদেশের কৃষি শ্রমিকরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, এমনকি বজ্রপাতে প্রাণ দিয়ে এই ফসল ফলিয়েছেন। সরকার বাহবা নিলেও কৃষকদের প্রকৃত সম্মান দেওয়া হচ্ছে না। তিনি শোষণমুক্ত সমাজ ও ইনসাফের রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের লক্ষ্যে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনকে মাঠে-ময়দানে আরও জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
বিষেশ অতিথির বক্তব্যে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও অসংখ্য শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশের ফ্যাসিস্ট পরিস্থিতির পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। তিনি শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে ইসলামী আন্দোলনের সকল শহীদের জন্য মহান আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদা কামনা করেন।
তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে শ্রমজীবী মানুষের মাঝে ইসলামের ন্যায়, ইনসাফ ও মানবকল্যাণের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবী আদর্শ অনুসরণ করে সত্যবাদিতা, আমানতদারিতা, সহনশীলতা, ক্ষমাশীলতা ও মানবসেবার মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জনের আহ্বান জানান তিনি।
অধ্যাপক গোলাম রসুল আরো বলেন, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসহায়, নির্যাতিত ও শ্রমজীবী মানুষের পাশে দাঁড়ানো, তাদের সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করা এবং সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমেই সংগঠনকে শক্তিশালী করা সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, শ্রমিক সংগঠনকে ট্রেডভিত্তিকভাবে আরও সুসংগঠিত করতে হবে এবং বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়নে দক্ষ, সৎ ও যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত পদ-পদবির আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টিকে লক্ষ্য রেখে নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে বর্তমান অনুকূল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে ব্যাপক দাওয়াতি কার্যক্রম পরিচালনা এবং সংগঠন সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বক্তব্য শেষ করেন।
সমাবেশে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারী ও যশোর-কুষ্টিয়া অঞ্চল পরিচালক আক্তারুজ্জামান, শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সদস্য অধ্যাপক মশিউর রহমান, যশোর ৫ আসনের সংসদ সদস্য এ্যাডভোকেট গাজী এনামুল হক, সরকারি এমএম কলেজের সাবেক ভিপি আব্দুল কাদের, জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি বেলাল হুসাইন, অধ্যাপক গোলাম কুদ্দুস, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক আবুল হাশেম রেজা, জেলা জামায়াতের দপ্তর সম্পাদক নূর ই আলি নুর আল মামুন, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন যশোর জেলার সহ-সভাপতি নজরুল ইসলাম হান্নান, সাধারন সম্পাদক নুরুল আমিন, সদস্য রবিউল ইসলাম, সাইফুল ইসলাম, আশিকুল্লাহ, মনিরুজ্জামান। সমাবেশ সঞ্চালনা করেন যশোর জেলা শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহকারি সেক্রেটারি সাইফুর রহমান।