মোঃ রেজাউল বারী বাবুল,স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুরঃ
গাজীপুর জেলায় চলতি মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি বোরো আবাদ হলেও শেষ সময়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, শিলাবৃষ্টি ও অতিবর্ষণে সেই স্বপ্ন এখন হুমকির মুখে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার বিস্তীর্ণ ধানক্ষেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে, কাটা ধান শুকাতে না পেরে পচে যাচ্ছে, কোথাও আবার ধানের শীষেই চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে-ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বোরো আবাদে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৭,৯৯০ হেক্টর জমি, সেখানে আবাদ হয়েছে ৫৮,০১০ হেক্টর। প্রতি হেক্টরে ৪.৪১ মেট্রিক টন উৎপাদন ধরে মোট ২ লাখ ৫৫ হাজার ৬২৮ মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক দুর্যোগে সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
উপজেলা ভিত্তিক হিসেবে গাজীপুর সদরে ১২,৩৬৫ হেক্টর, কাপাসিয়ায় ১৩,৯৫০ হেক্টর, শ্রীপুরে ১১,৬২৫ হেক্টর, কালিয়াকৈরে ১০,২৬০ হেক্টর এবং কালীগঞ্জে ৯,৮১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে শ্রীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টিতে অন্তত ৯৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আরও অনেক জমি পানির নিচে রয়েছে।
গাজীপুর মহানগরের দক্ষিণ নীলেরপাড়া এলাকার কৃষক সুজন বলেন, বৃষ্টির পানিতে তার নিজের সহ কৃষকের ধানের জমি তলিয়ে গেছে, যেগুলো কেটে এনেছেন সেগুলোও শুকাতে না পেরে পচে যাচ্ছে, এতে কৃষকরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন। গাজীপুর সদর উপজেলার বাড়িয়া ইউনিয়নের খাতিয়া এলাকার কৃষক রাসেল ভুঁইয়া জানান, তার নিজেরসহ কৃষকের প্রায় অর্ধেক জমির ধান পানিতে নষ্ট হয়ে গেছে, অনেক জমির ধান এখনো পানির নিচে থাকায় কাটাই সম্ভব হয়নি, আর কাটা ধানের মধ্যেও অনেকটাই পচে গেছে। কালিয়াকৈর, কাপাসিয়া, কালিগঞ্জ ও শ্রীপুর উপজেলায় অতি বর্ষণে বড় আবাদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ঐতিহাসিক বেলাই বিল এলাকার এক কৃষক জানান, তার ১০-১২ বিঘা জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে, শ্রমিকের অভাব ও অতিরিক্ত মজুরির কারণে সময়মতো ধান কাটাও সম্ভব হয়নি।
এ বিষয়ে গাজীপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোঃ রফিকুল ইসলাম খান বলেন, জেলায় বোরো আবাদ লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি হওয়া ইতিবাচক দিক, তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কিছু ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয়ভাবে অর্ধেক ক্ষতির যে দাবি করা হচ্ছে তা সঠিক নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে প্রায় ২০ শতাংশ আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তবে পূর্ণাঙ্গ জরিপ শেষে সঠিক তথ্য জানা যাবে। তিনি আরও বলেন, শিলাবৃষ্টিতে শ্রীপুর উপজেলায় প্রায় ৯৭ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
পাশাপাশি অতিবর্ষণের কারণে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়ে বোরো আবাদে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে, ফলে নির্ধারিত উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।'
তিনি বলেন, 'কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার জন্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। সরকারিভাবে সহায়তার বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যাতে কৃষকের ক্ষতি কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া যায়।'
এদিকে গাজীপুর-৪(কাপাশিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন আইয়ুবী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের পাশাপাশি সরাসরি মাঠে নেমে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কাপাসিয়া উপজেলার নলী বিলে পানিতে তলিয়ে যাওয়া ধানক্ষেতে তিনি স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে কোমর পানিতে নেমে ধান কাটায় অংশ নেন এবং এক হতদরিদ্র কৃষকের প্রায় এক বিঘা জমির ধান কেটে ঘরে তুলে দেন। এ সময় তিনি বলেন, কৃষকরা দেশের অর্থনীতির প্রাণভোমরা, দুর্যোগের সময় তাদের পাশে দাঁড়ানো শুধু দায়িত্ব নয়, এটি মানবিক কর্তব্যও। ভবিষ্যতেও কৃষকদের সহায়তায় এমন কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
স্থানীয়ভাবে অনেক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও সাধারণ মানুষও কৃষকদের সহায়তায় এগিয়ে এসেছে, যা কিছুটা স্বস্তি এনে দিলেও কৃষকরা বলছেন, দ্রুত সরকারি প্রণোদনা, ধান শুকানোর ব্যবস্থা এবং শ্রমিক সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সময়মতো সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ক্ষতির মাত্রা কিছুটা হলেও কমিয়ে আনা সম্ভব, অন্যথায় চলতি মৌসুমে গাজীপুরের বোরো উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে।