মাহমুদ শরীফ, কুমারখালী (কুষ্টিয়া) সংবাদদাতা : কুমারখালীতে কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ৩ হাজার ৫৯৭টি খামারে প্র¯‘ত করা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার ৫৫৯ পশু। উপজেলায় পশুর চাহিদা ১৮ হাজার, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় ৩ হাজার বেশি। একই সংখ্যক খামারে ৮ হাজার ১৫৯টি পশু বেশি পালন করেছেন খামারিরা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাংসের দাম , চাহিদা ও লাভ বৃদ্ধি পাওয়ায় পশু পালনে আগ্রহ বাড়ছে খামারিদের। সংসারে বাড়তি আয়ের জন্য খামারি ছাড়াও কৃষক, ব্যবসায়ী, চাকুরীজীবীসহ নানান পেশার মানুষ করছেন পশু পালন।
প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে জানা যায়, পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়নের খামারে ষাঁড় ১৭ হাজার ৭০৪, বলদ ৩৮, ছাগল ১২ হাজার ৭৮৪, ভেড়া ৩১৩ ও মহিষ ১৭টি পালন হয়েছে। এবার পশুর চাহিদা ১৮ হাজার হলেও গত বছর ছিল ১৫ হাজার। বর্তমানে শেষ মুহুর্তে পশু পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় কাটছে খামারীদের।
উপজেলার সদকী, জগন্নাথপুর, যদুবয়রা, শিলাইদহ, চাপড়া ও পান্টি ইউনিয়ন ঘুরে জানা গেছে, অনেক খামারি ঈদুল আজহা সামনে রেখে পশু লালন পালনে বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছেন। ঈদে এসব বিক্রি করে লাভের প্রত্যাশা করছেন তারা। এসব পশুর স্থানীয় হাট ছাড়াও বিক্রির জন্য ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটে চলে যায়। তবে গো-খামারি ও কৃষকদের এই প্রত্যাশা শেষ পর্যন্ত থাকবে কিনা এ নিয়ে নানা সংশয় দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে হাজার হাজার গরু প্রবেশ করলে খামারিদের মাঝে লোকসানের এক অজানা আতঙ্ক রয়েছে।
গোখাদ্যের দাম বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে বিগত পাঁচ ছয় বছর কোরবানির গরু পালন বন্ধ করে শুধু গাভী পালন করছিলেন কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গৃহিণী রোকসানা আক্তার (৩০)। পরিস্থিতি অনুকুলে থাকায় আবার তিনি শুরু করেছেন কোরবানির পশুপালন। আসন্ন ঈদের জন্য তিনি ৮/৯ মণ ওজনের একটি ষাঁড় প্র¯‘ত করেছেন। লাভের আশায় শেষ মূহুর্তে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। রোকসানা উপজেলার সদকী ইউনিয়নের দরবেশপুর গ্রামের আমিরুল ইসলামের স্ত্রী। গাভীর পাশাপাশি বছরখানেক আগে প্রায় ৯০ হাজার টাকা দিয়ে ফ্রিজিয়ান মিশ্র জাতের একটি ষাঁড় কিনেছিলাম। লালন পালনে প্রায় ৫০/৬০ হাজার টাকা খরচ লেগেছে। দুই লাখ ৪০ হাজার টাকায় বিক্রির প্রত্যাশা তার।
একই গ্রামের খামারি আত্তাব ফকির ২০ বছর ধরে পশু পালন করে আসছেন। তিনি রমযানের ঈদে ১০টি ষাঁড় ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করে পাঁচ লাখের মতো লাভ করেছেন। তিনি বলেন, বর্তমানে খামারে ১১টি গরু আছে। ঈদে ৮টি বিক্রি করবেন। প্রতিটি গরুর ওজন প্রায় ছয় থেকে আট মণের ওপরে। এক একটি গরু দুই থেকে আড়াই লাখ টাকায় বিক্রির প্রত্যাশা করছেন ।
যদুবয়রা ইউনিয়নের জোতমোড়া গ্রামের খামারি হান্নান মোল্লা বলেন, আগের বছর ৯টি ষাঁড় বিক্রি করে খরচ বাদে তিন লাখ টাকা লাভ হয়েছিল। এবছর আটটি ষাঁড় আছে। বছরখানেক আগে প্রতিটি গরু আকার ভেদে ৭০ থেকে এক লাখ ১০ হাজার টাকায় কেনা ছিল। নিজের জমিতে নেপিয়ার ও ধানের বিছালী আছে। সেজন্য প্রতিটি গরুতে পরিচর্চা খরচ পড়েছে ১৮/২০ হাজার টাকা। পাঁচ থেকে ছয় মণ ওজনের গরুগুলো আকার ভেদে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা দামে বিক্রির প্রত্যাশা করছেন। তিনি বলেন, বছর গেলেই গোখাদ্যের দাম বেড়ে যাচ্ছে, সে জন্য লাভ কম হচ্ছে। জগন্নাথপুর ইউনিয়নের জোতপাড়ার বাতেন মোল্লা ২১ বছর ধরে পশু পালন করছেন। খামারে বর্তমানে ২৭ টি পশু রয়েছে। আসন্ন ঈদের জন্য তিনি ১৭টি ষাঁড় প্র¯‘ত করেছেন। খামারের ব্যবস্থাপক বাতেন মোল্লার ভাগ্নে মো. আকাশ বলেন, সাত-আট মাস আগে তিন লাখ ২০ হাজার থেকে চার লাখ টাকা দরে গরুগুলো কেনা হয়েছিল। গরু প্রতি পরিচর্যা খরচ পড়েছে প্রায় ৯০ হাজার টাকা। ১৫ থেকে ২৫ মণ ওজনের গরুগুলো ৬ থেকে ৮ লাখ টাকা দরে বিক্রির আশা আছে। পশু মোটাতাজা করার জন্য ছাল, ছোলা, খেসারি, খুদ, গুঁড়া, খৈল, অ্যাংকর ডাল, খড় খাদ্য হিসেবে ব্যবহার হয়।
কুমারখালী স্টেশন বাজার সংলগ্ন ছালপট্টি বাজার সমিতির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম জিলাল বলেন, দুইমাস আগে ৩৯ কেজির বস্তা খুদ ১ হাজার ৫৫০ টাকা, ৫৫ কেজির বস্তা ছাল ২ হাজার ৪৫০ থেকে ৭০০ টাকা, খেসারী প্রতিমণ ২ হাজার ৪০০-৬০০ টাকা, গম প্রতিমণ এক হাজার ৫৫০-৮০০ বিক্রি হয়েছে। তবে এসব গোখাদ্যের বাজার উঠানামা কওে প্রতিনিয়ত।
কুমারখালী উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন প্রাকৃতিক উপায়ে এবং স্বাস্থ্যসম্মতভাবে এলাকায় পশু মোটাতাজা করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মাংসের দাম ও চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় পশু পালন বেড়েছে। রমযানের ঈদেও অনেক পশু বিক্রি হয়েছে। এবারও ভালো দাম পাবেন খামারিরা।
পশু বিক্রির জন্য চারটি সাপ্তাহিক হাট রয়েছে। অনলাইনেও চলে বেচাকেনা। গোখাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত বাজার মনিটারিং করা হয়েছে। ঈদের বাজারও তদারকির ব্যবস্থা করা হবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার জানিয়েছেন।