মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা থেকে: মোংলাসহ উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় একটি নাগরিক সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার (২ মে) সকালে মোংলা উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এই সংলাপের আয়োজন করে উপজেলা প্রশাসন, ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা লিডার্স। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. ফাহমিদা খানম। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম এমপি। এছাড়া বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাগেরহাট জেলা পরিষদের প্রশাসক ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মদ জাকির হোসেন এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী জয়ন্ত মল্লিক।

সংলাপে স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শারমিন আক্তার সুমী এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ক্লাইমেট অ্যাকশন ফোরাম মোংলার সভাপতি পরিবেশকর্মী মো. নূর আলম শেখ।

সুপেয় পানির সংকট বিষয়ক একটি মাল্টিমিডিয়া উপস্থাপনা তুলে ধরেন লিডার্স-এর নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মন্ডল, উন্নয়নকর্মী তৃপ্তি সরদার এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রতিনিধি সুবহা তালহা।

সংলাপে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক ও উন্নয়নকর্মীরা বক্তব্য রাখেন। মুক্ত আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ, যেখানে উপকূলীয় অঞ্চলের পানিসংকটের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা হয়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মোংলাসহ উপকূলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। তিনি জানান, নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করেছে এবং সুপেয় পানির বিষয়টিও অগ্রাধিকার পাচ্ছে। খুব শিগগিরই এই সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।

বিশেষ অতিথি জেলা পরিষদ প্রশাসক জানান, জেলার পুকুরগুলো দখলমুক্ত করে সেগুলোকে পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। অপরদিকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী উল্লেখ করেন, পুকুর খনন ও সংরক্ষণ করে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ উপকূলের জন্য একটি টেকসই সমাধান হতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তার বক্তব্যে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট আরও প্রকট হয়েছে। এই সংকট মোকাবিলায় বিশেষ বরাদ্দ প্রয়োজন বলে তিনি মত দেন।

সংলাপে উপস্থাপিত তথ্যে বলা হয়, উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানির সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেশে প্রায় তিন কোটি মানুষ নির্ভরযোগ্য পানির উৎস পায় না এবং দেড় কোটি মানুষ লবণাক্ত ভূগর্ভস্থ পানি পান করতে বাধ্য হয়। মোংলা এলাকায় প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের সুপেয় পানির কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই।

বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য ট্যাংক বিতরণ করা হলেও তা দিয়ে সর্বোচ্চ ছয় মাসের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়।

সংলাপে বক্তারা বেশ কিছু সুপারিশ তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছেÑউপকূলীয় অঞ্চলকে পানি সংকটাপন্ন এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ব্যয় করা, জেলা পরিষদের পুকুরগুলোকে পানির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা এবং গ্রাম পর্যায়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এছাড়া মোংলা বন্দরের পুকুরগুলো পৌরসভার অধীনে এনে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। আশু সমাধান হিসেবে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

সভাপতির বক্তব্যে ড. ফাহমিদা খানম বলেন, অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই পানির ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকারকে সম্পৃক্ত করে টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পানির গুণগত মান বজায় রাখার ওপরও জোর দেন তিনি।

সংলাপ শেষে প্রতিমন্ত্রী, জেলা পরিষদ প্রশাসক এবং অতিরিক্ত সচিব মোংলা উপজেলার বিভিন্ন পানির প্রকল্প পরিদর্শন করেন।