মোঃ রেজাউল বারী বাবুল, স্টাফ রিপোর্টার, গাজীপুর : গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক পাঁচ হত্যাকাণ্ডে স্তব্ধ হয়ে গেছে পুরো জনপদ। স্ত্রী, তিন কন্যাসন্তান ও শ্যালককে গলা কেটে নির্মমভাবে হত্যা করে পালিয়ে গেছে অভিযুক্ত ফোরকান মিয়া। পালিয়ে যাওয়ার আগে মোবাইল ফোনে হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে ফোরকান। রক্তাক্ত লাশের পাশ থেকে উদ্ধার হয়েছে কম্পিউটারে টাইপ করা একাধিক অভিযোগপত্র, চিরকুট, মদের বোতল ও মাদকসেবনের আলামত। চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ড ঘিরে এলাকায় নেমে এসেছে শোক, আতঙ্ক ও তীব্র চাঞ্চল্য।
শনিবার (৯ মে) সকালে গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের রাউৎকোনা পূর্বপাড়া গ্রামের সিঙ্গাপুর প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলার একটি ভাড়া বাসা থেকে পাঁচজনের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে কাপাসিয়া থানা পুলিশ। খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত মানুষ ঘটনাস্থলে ভিড় করেন।
নিহতরা হলেন, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার মেরী গোপীনাথপুর এলাকার আতিয়ার রহমান মোল্লার ছেলে ফোরকান মিয়ার স্ত্রী গোপালগঞ্জের পাইককান্দি এলাকার শাহাদাৎ মোল্লার মেয়ে শারমিন খানম (৩০), তাদের বড় মেয়ে মাদরাসাছাত্রী মীম খানম (১৫), মেজ মেয়ে উম্মে হাবিবা (৮), ছোট মেয়ে ফারিয়া (২) এবং শারমিনের ছোট ভাই রসুল মিয়া (২২)।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পেশায় প্রাইভেটকার চালক ফোরকান মিয়া প্রায় ৫ মাস আগে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলায় ভাড়ায় ওঠেন। শুক্রবার দিবাগত রাতের কোনো এক সময় এ নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। গতকাল শনিবার সকাল পর্যন্ত ঘরের দরজা না খোলায় প্রতিবেশীদের সন্দেহ হয়। পরে জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে রক্তাক্ত দৃশ্য দেখে পুলিশে খবর দেওয়া হয়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ছোট দুটি কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে রক্তের দাগ। তিন শিশুর গলাকাটা ও রক্তাক্ত জখম লাশ মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে ছিল। শ্যালক রসুল মিয়ার লাশ খাটের ওপর পড়ে ছিল। আর মা শারমিন খানমের গায়ে নতুন শাড়ি ও গলায় লম্বা গহনা পরা হাত-মুখ বাঁধা লাশ জানালার গ্রিলের সঙ্গে বাঁধা অবস্থায় পাওয়া যায়। শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। ঘরের ভেতরের আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় ছিল, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে হত্যার আগে ধস্তাধস্তি হয়েছে।
ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়ার সময় ফোরকান তার এক চাচাতো ভাই আবু মুসাকে মোবাইল ফোনে হত্যাকাণ্ডের কথা জানিয়ে লাশ নিয়ে যাওয়ার কথাও বলে বলে জানা গেছে। খবর পেয়ে স্বজনরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন।
পুলিশ জানায়, লাশগুলোর পাশ থেকে ফোরকান মিয়ার স্বাক্ষরবিহীন কম্পিউটার টাইপ করা দুটি অভিযোগপত্র উদ্ধার করা হয়েছে। সেখানে স্ত্রী শারমিন, শ্বশুর-শাশুড়ি ও শ্যালকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, স্ত্রীর মাধ্যমে শ্বশুরপক্ষ তার কাছ থেকে পর্যায়ক্রমে টাকা নিয়ে জমি কিনেছে। টাকা ফেরত চাইলে তাদের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। এছাড়া অভিযোগপত্রে পরকীয়ার বিষয়ও উল্লেখ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ।
ফোরকানের ভায়রা শামীম জানান, গত শুক্রবার ফোরকান চাকরি দেওয়ার কথা বলে রসুল মিয়াকে কাপাসিয়ায় তার বাসায় ডেকে আনেন। পরে তাকেও হত্যা করা হয়। তিনি দাবি করেন, ফোরকান পরিকল্পিতভাবে হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে।
নিহত শারমিনের বাবা শাহাদাৎ হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘ফোরকান দীর্ঘদিন ধরে আমার মেয়েকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করত। আমরা কখনো ভাবিনি সে নিজের সন্তানদেরও এভাবে হত্যা করতে পারে।’
শারমিনের চাচি ইভা রহমান বলেন, ‘পরিকল্পিতভাবেই এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। পারিবারিক কলহ দীর্ঘদিনের ছিল। বিভিন্ন সময় সালিসও হয়েছে। অভিযোগ পত্রটি হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পিত অংশ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন’।
বাড়ির মালিক প্রবাসী মনির হোসেনের স্ত্রী লুৎফুন নাহার জানান, ‘গত জানুয়ারি মাসে আমরা তাদের মাসিক চার হাজার টাকা হিসেবে ভাড়া দেই। ওরা সবসময় দরজা-জানালা বন্ধ করে থাকত। তারা প্রায় সময়ই সারারাত্র টিভি দেখত।রাতে কোনো চিৎকার বা শব্দ শুনিনি। পরে সকালে ঘটনা জানতে পারি।’
গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সালমা খাতুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে বলেন, ‘ঘরের ভেতরের দৃশ্য অত্যন্ত ভয়াবহ। দুইটি কক্ষে পাঁচজনের লাশ পড়ে ছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে এলোপাতাড়ি কোপের চিহ্ন রয়েছে। সিআইডি, জেলা পুলিশ, ডিবি, এনএসআইসহ বিভিন্ন সংস্থা যৌথভাবে তদন্ত করছে।’
কাপাসিয়া থানার অফিসার ইনচার্জ, শাহীনুর আলম জানান, ‘প্রাথমিকভাবে পারিবারিক কলহকে কেন্দ্র করে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধার হওয়া কাগজপত্র, মাদকসামগ্রী ও অন্যান্য আলামত গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা হচ্ছে। পলাতক ফোরকান মিয়াকে গ্রেফতারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।’
গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কাপাসিয়া-কালীগঞ্জ সার্কেল), মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ঘটনার পেছনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে পুলিশ, পিবিআই, ডিবি ও সিআইডি একযোগে কাজ করছে।’
গাজীপুরের পুলিশ সুপার, মোঃ শরিফ উদ্দীন বলেন, ‘একই পরিবারের পাঁচজনকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে, যা অত্যন্ত মর্মান্তিক। ঘটনাটি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। জেলা পুলিশের পাশাপাশি ডিবি, সিআইডি, পিবিআইসহ বিভিন্ন ইউনিট সমন্বিতভাবে কাজ করছে। হত্যাকারী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহে দুইজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আমরা আশাবাদী, খুব দ্রুত সময়ের মধ্যেই মূল রহস্য উদঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।’
এদিকে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গভীর শোক ও তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ। গাজীপুর জেলা জামায়াতের আমীর ড. জাহাঙ্গীর আলম এক বিবৃতিতে বলেন, ‘একই পরিবারের শিশু সন্তানসহ পাঁচজনকে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনা মানবতা ও সভ্যতার বিরুদ্ধে জঘন্য অপরাধ। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার ডাঃ তামান্না তাসনীম, সহকারী কমিশনার (ভূমি), মোঃ নাহিদুল হকসহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
বর্তমানে পুরো রাউৎকোনা গ্রামজুড়ে শোক, আতঙ্ক ও উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। স্থানীয়দের ভাষায়, ‘এমন ভয়ংকর ঘটনা কাপাসিয়ায় আগে কখনও ঘটেনি।’
আমাদের সংবাদদাতা, শামসুল হুদা লিটন জানান : পুলিশ জানায়, প্রতিটি লাশের ওপর একটি করে লিখিত অভিযোগের কপি রাখা ছিল। গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বরাবর লেখা ওই অভিযোগপত্রে ফোরকান অভিযোগ করেন, তার স্ত্রী শারমিন স্বামীর উপার্জিত ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়ে বাবার বাড়িতে জমি কিনেছেন। এ ছাড়া রাজু নামের এক খালাতো ভাইয়ের সঙ্গে শারমিনের পরকীয়া সম্পর্ক ছিল বলে সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়, গত ৩ মে শারমিন ও তার প্রেমিকসহ শ্বশুরবাড়ির লোকজন ফোরকানকে একটি রুমে হাত-পা বেঁধে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করেন।
গাজীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কালীগঞ্জ সার্কেল) মো. আসাদুজ্জামান বলেন, পাঁচটি লাশের ওপরই কম্পিউটারে টাইপ করা অভিযোগের কপি পাওয়া গেছে। এটি গোপালগঞ্জ থানায় জমা দেয়া হয়েছিল কি না, নাকি এটি কেবল একটি চিরকুট হিসেবে তৈরি করা হয়েছিল—তা আমরা যাচাই করছি। পুরো বিষয়টি তদন্তাধীন রয়েছে।