মুঃ শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর (চাঁপাইনবাবগঞ্জ) : ভোরের আলো ফোটার আগেই জেগে ওঠে ইটভাটার চুল্লি। কুয়াশা ভেদ করে আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। সেই আগুনে পোড়ে মাটি, তৈরি হয় ইট—আর সেই সঙ্গে ধীরে ধীরে পুড়ে যায় মানুষের জীবনও। দেশের উন্নয়নের প্রতিটি স্তম্ভে যে ইটের অবদান, তার পেছনে লুকিয়ে থাকে এই অদেখা মানুষের সংগ্রাম।

ইটভাটার জীবন মানেই নিরবচ্ছিন্ন পরিশ্রম। দিনের শুরু ভোরে, শেষ হয় সন্ধ্যার অনেক পরে। পুরুষ, নারী, এমনকি শিশুরাও এখানে শ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। কেউ কাদা মেখে ইট বানায়, কেউ তা বহন করে, কেউ শুকায়। প্রতিটি ধাপে জড়িয়ে থাকে কঠোর শ্রম আর ক্লান্তিহীন চেষ্টা। কাজের পরিবেশ অত্যন্ত কঠিন। চুল্লির তীব্র তাপ, ধুলাবালি ও বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করতে হয়। এতে শ্বাসকষ্ট, ত্বকের সমস্যা, চোখের জ্বালা—এসব যেন নিত্যসঙ্গী। তবুও থেমে থাকার সুযোগ নেই। কারণ কাজ না করলে আয় নেই, আর আয় না থাকলে বেঁচে থাকাও কঠিন।

অধিকাংশ শ্রমিকই দরিদ্র পরিবারের মানুষ। গ্রাম থেকে কাজের খোঁজে তারা এখানে আসে। অনেকেই আগাম টাকা নেয়, যা পরে তাদের ঋণের ফাঁদে ফেলে। সেই ঋণ শোধ করতে গিয়ে বছরের পর বছর একই ভাটায় কাজ করতে হয়। এতে তাদের জীবন যেন এক অদৃশ্য বন্ধনে আটকে যায়।

নারী শ্রমিকদের জীবন আরও কঠিন। তারা পুরুষদের সমান শ্রম দিলেও মজুরি পায় কম। সংসারের কাজ সামলে ভাটার কাজ করতে গিয়ে তারা হয়ে ওঠে দ্বিগুণ পরিশ্রান্ত। তবুও পরিবারের জন্য তারা এই কষ্ট সহ্য করে যায়।

সবচেয়ে কষ্টের চিত্রটি দেখা যায় শিশুদের জীবনে। স্কুলে যাওয়ার বয়সে তারা কাজ করে ইটভাটায়। বই-খাতার বদলে তাদের হাতে থাকে কাদা, খেলাধুলার বদলে থাকে শ্রম। তাদের শৈশব হারিয়ে যায় কঠিন বাস্তবতায়।

বাসস্থানও খুবই অনুন্নত। ভাটার পাশে অস্থায়ী ঝুপড়িতে তাদের বসবাস। নেই বিশুদ্ধ পানি, নেই ভালো স্যানিটেশন। রোগবালাই এখানে সাধারণ ঘটনা, কিন্তু চিকিৎসা সুবিধা সীমিত।

পরিবেশগত দিক থেকেও ইটভাটা একটি বড় সমস্যা। প্রচলিত পদ্ধতিতে ইট তৈরির ফলে বায়ুদূষণ বাড়ে। এই দূষণের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে শ্রমিকদের ওপর, যারা প্রতিদিন এই পরিবেশে কাজ করে।

তবুও এই মানুষগুলো স্বপ্ন দেখে। তারা চায় সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ, একটি নিরাপদ ঘর, একটু স্বস্তির জীবন। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন দেয়াল সেই স্বপ্নকে বারবার থামিয়ে দেয়। তবুও তারা থামে না—সংগ্রাম চালিয়ে যায়।

ইটভাটার শ্রমিকদের জীবন আমাদের উন্নয়নের এক নীরব বাস্তবতা। আমরা যখন নতুন ভবন দেখি, তখন খুব কমই ভাবি সেই ইটের পেছনের গল্প। অথচ প্রতিটি ইট যেন একটি জীবনের কষ্টের প্রতিচ্ছবি।

এই বাস্তবতার পরিবর্তন জরুরি। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। শিশুদের শিক্ষা, নারী শ্রমিকদের অধিকার—এসব বিষয় গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

উন্নয়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তা মানুষের জীবনকে মর্যাদা দেয়। ইটভাটার এই সংগ্রামী মানুষগুলোর জীবন আলোকিত না হলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

আগুনে পোড়া ইট দিয়ে আমরা ভবন গড়ি, কিন্তু সেই আগুনে পোড়া মানুষের জীবনকে আলোকিত করাই এখন সময়ের দাবি। কারণ সত্যিকারের উন্নয়ন তখনই, যখন তা মানুষের মুখে হাসি ফোটায়।