সাইফুদ্দীন আল মোবারক, টেকনাফ: কক্সবাজার টেকনাফের সীমান্তবর্তী বনাঞ্চলে, জীববৈচিত্র্যে হুমকির মুখে পড়েছে বিশেষ করে ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা ঢলের পর থেকে একের পর বনের জায়গা দখল করে রোহিঙ্গাদের আবাসস্থল তৈরি করা হয়। জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে। এরইমধ্যে টেকনাফের মুচনীর ২৬ নং শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে নতুন করে বনের জায়গা দখল করে বর্জ্য (ব্যবস্থাপনা) ফেলার জন্য ১০ ফুট উঁচু করে প্রায় এক হাজার ফুট লম্বা বাউন্ডারি করছে এনজিও সংস্থা। এতে নতুন করে বণ্যপ্রাণী চলাচলের পথ বন্ধ হবে, আবাসস্থল হারাবে বন্যপ্রাণী,ধ্বংসের মুখে পড়বে জৈববৈচিত্র। শুধু তাই নয়,নোংরা বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশও মারাত্মকভাবে ক্ষতির মুখে পড়বে। পরিবেশ গিলে খেলেও এসবে বাধা দিচ্ছে না বনবিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর। একে-অপরের উপর দায় দাপিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পের পাশেই অবস্থিত এই বনাঞ্চলের বিশাল অংশ দখল করে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার স্থানীয় প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০ ফুট উচ্চতার একটি বাউন্ডারি নির্মাণ করছে বলে অভিযোগ ওঠেছে। যা ইতোমধ্যেই পরিবেশবিদ, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সচেতন মহলের মধ্যে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ‘ইউএনডিপি’ নামের আইএনজিও সংস্থা বনভূমির ভেতরে এই স্থাপনা নির্মাণ করছে। যদিও প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা এটি একটি মানবিক উদ্যোগের অংশ হিসেবে রোহিঙ্গা ক্যাম্প ব্যবস্থাপনার উন্নয়নমূলক কাজ হিসেবে সবার কাছে উপস্থাপন করছে বলে জানা গেছে ।

তবে বাস্তবে এর ফলে বনভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ এবং বন্যপ্রাণীর চলাচলে গুরুতর বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে এই অঞ্চলে বসবাসকারী বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণী, যেমন বনবিড়াল, শিয়াল, বিভিন্ন প্রজাতির সাপ ও পাখি, তাদের প্রাকৃতিক আবাসস্থল হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয় পরিবেশ প্রেমিরা।

জানা গেছে, বনের ভেতর দিয়ে শালবাগান ২৬ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পাশে দীর্ঘ এলাকা জুড়ে কংক্রিটের খুঁটি স্থাপন করে ইট ও সিমেন্টের দেয়াল নির্মাণ করা হচ্ছে। কিছু স্থানে ইতোমধ্যেই দেয়ালের প্রায় কাজ সম্পন্ন হয়েছে। আবার কোথাও কোথাও নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। বনভূমির গাছপালা কেটে ফেলা এবং জমি সমতল করা , যা স্পষ্টতই বন আইন লঙ্ঘনের ইঙ্গিত দেয়। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, এই কাজ শুরু হওয়ার আগে কোনো ধরনের জনমত যাচাই বা পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন করা হয়নি, যা একটি বড় ধরনের অনিয়ম হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এই বিষয়ে কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগীয় কর্মকর্তা (ডিএফও) আব্দুল্লাহ আল মামুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বিষয়টি সম্পর্কে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে তিনি জানান,ক্যাম্পের কাঁটাতারের ভেতরে বনবিভাগের কিছু করার এখতিয়ার নাই। ওইখানে বনবিভাগ কিছু করতে পারবে না। তবে বনবিভাগ সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি লিখেছে বলে জানান তিনি।

এদিকে ২৬ নং রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ (সিআইসি) মোহাম্মদ আব্দুল হান্নানের কাছে জানতে চাইলে জানান, বনের জায়গায় বনবিভাগ যদি কাজ করতে দেয় তাহলে আমাদের করার কিছু নেই।

তিনি আরো জানান, ইউএনডিপি করতেছে বনবিভাগ চাইলে এগুলো ব্যবস্থা নিতে পারে। আমাদের সহযোগিতা চাইলে প্রয়োজনে বনবিভাগকে আমরা সহযোগিতা করতে পারি।

এই ধরনের পারস্পরিক দায় এড়ানোর প্রবণতা পুরো বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং প্রকৃত দায়ী পক্ষ চিহ্নিত করাকে কঠিন করে তুলছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য এই ধরনের অনিয়ন্ত্রিত অবকাঠামো নির্মাণ শুধু বন্যপ্রাণীর চলাচলই বাধাগ্রস্ত করে না, বরং পুরো ইকোসিস্টেমের উপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বনভূমির ভেতরে কংক্রিটের স্থাপনা তৈরি হলে মাটির স্বাভাবিক জলধারণ ক্ষমতা কমে যায়, যার ফলে আশেপাশের গাছপালা শুকিয়ে যেতে পারে। এছাড়া বাউন্ডারি দেয়াল বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক চলাচলের রুট বন্ধ করে দিতে পারে, যা তাদের খাদ্য ও প্রজনন চক্রে বিঘ্ন ঘটায়।

স্থানীয় পরিবেশবাদীরাও এই বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন । তারা দাবি করেছেন, অবিলম্বে এই নির্মাণকাজ বন্ধ করে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত, যারা পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড যাতে পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে জন্য কঠোর নজরদারি ও নীতিমালা প্রণয়নের আহ্বান জানানো হয়েছে। এদিকে স্থানীয় জনগণও ক্রমশ ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে।

কক্সবাজার সিটি কলেজের প্রভাষক ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের নেতা (বাপা) এহ্সান উদ্দিন জানান, বনভূমি শুধু বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নয়, বরং এটি স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই বন ধ্বংস হলে এর প্রভাব পড়বে জলবায়ু, কৃষি এবং সামগ্রিক জীবনের উপর। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এভাবে একের পর এক বনভূমি দখল হয়ে গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম একটি অনিরাপদ পরিবেশের মুখোমুখি হবে।

সব মিলিয়ে, টেকনাফের মুছনী শালবাগান এলাকায় বনের জমি দখল করে বাউন্ডারি নির্মাণের এই ঘটনা শুধু একটি স্থানীয় সমস্যা নয়, বরং এটি বৃহত্তর পরিবেশগত সংকটের একটি প্রতিচ্ছবি। যেখানে উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তার নামে প্রকৃতির উপর অব্যাহত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, সেখানে টেকসই সমাধান খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত দ্রুত এই বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অবস্থান গ্রহণ করা এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, যাতে উন্নয়ন ও প্রকৃতির মধ্যে একটি ভারসাম্য রক্ষা করা সম্ভব হয়।