ধর্ম মানুষের আত্মিক বিকাশের পথ, আর ধর্মান্ধতা সে পথের বিকৃতি। এই দুটি শব্দকে অনেকেই এক করে দেখেন, অথচ বাস্তবে তাদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একজন ধার্মিক মানুষ তাঁর বিশ্বাসকে ধারণ করেন জ্ঞান, ধৈর্য, নৈতিকতা ও মানবিকতার মাধ্যমে। অন্যদিকে ধর্মান্ধ ব্যক্তি ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা না বুঝেই আবেগ, সংকীর্ণতা ও অসহিষ্ণুতাকে ধর্মের নামে প্রতিষ্ঠা করতে চান। ফলে ধর্মের সৌন্দর্য আড়াল হয়ে যায় মানুষের ভ্রান্ত আচরণের কারণে।
কোনো মানুষই শতভাগ ইতিবাচক হতে পারে না। একজন ধার্মিক যেমন ভুল করতে পারেন, তেমনি একজন অধার্মিক বা নাস্তিকও অনেক ক্ষেত্রে মানবিক, সৎ ও দক্ষ হতে পারেন। মানুষের মূল্যায়ন কেবল তার পরিচয়ে নয়, তার চরিত্র, কর্ম ও আচরণে। ইসলামও মানুষের ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, অসৎকাজ ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:৯০)
তাই কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কাউকে বড় বা ছোট ভাবা ন্যায়সংগত নয়। আবার ধর্ম পালনকারী মানুষের যোগ্যতাকে শুধুমাত্র তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অস্বীকার করাও অযৌক্তিক। জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিকতা-এসবের মূল্যায়ন হওয়া উচিত নিরপেক্ষভাবে।
প্রকৃত ধার্মিক মানুষ কখনো নিজের বিশ্বাস অন্যের ওপর জোর করে চাপিয়ে দিতে চান না। কুরআনে স্পষ্ট ঘোষণা করা হয়েছে, “ধর্মের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা আল-বাকারাহ, ২:২৫৬) এই আয়াত ইসলামের একটি মৌলিক নীতি প্রতিষ্ঠা করে। বিশ্বাস হৃদয়ের বিষয়, বলপ্রয়োগের নয়। যে ব্যক্তি ধর্মের নামে ভয়, ঘৃণা কিংবা সহিংসতা সৃষ্টি করে, সে ধর্মের নয়; বরং নিজের সংকীর্ণ মানসিকতার প্রতিনিধিত্ব করে।
রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন দয়ার প্রতীক। তিনি বলেছেন, “ তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যার চরিত্র সবচেয়ে উত্তম।” চরিত্রকে তিনি ঈমানের অন্যতম পরিচয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। অথচ আমরা প্রায়ই দেখি, কিছু মানুষ ধর্মীয় ভাষা ব্যবহার করলেও তাদের কথাবার্তা, আচরণ এবং সামাজিক ব্যবহার ধর্মের সৌন্দর্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা সহজেই অন্যকে কাফির, পাপী কিংবা শত্রু হিসেবে আখ্যাযিত করে, কিন্তু নিজের আত্মসমালোচনার প্রয়োজন অনুভব করে না।
ধর্মান্ধতার একটি বড় লক্ষণ হলো জ্ঞানকে অবহেলা করা। প্রকৃত ধার্মিক জানেন, ইসলাম জ্ঞান অর্জনকে ইবাদতের মর্যাদা দিয়েছে। কুরআনের প্রথম ওহিই ছিল- “পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন।” (সূরা আল-আলাক, ৯৬:১) অর্থাৎ জ্ঞান ছাড়া ধর্মচর্চা অপূর্ণ। তাই ধর্মকে বুঝতে হলে কেবল আবেগ নয়, অধ্যয়ন, চিন্তা ও প্রজ্ঞারও প্রয়োজন।
সমাজে শিক্ষিত ও অশিক্ষিত উভয় শ্রেণির মানুষের মধ্যেই ভালো-মন্দের উপস্থিতি রয়েছে। শিক্ষিত হলেই মানুষ নৈতিক হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই; আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কম থাকলেই কেউ অসৎ হয়ে যায় না। আমাদের গ্রামের বহু সাধারণ মানুষকে দেখা যায়, যাদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সীমিত হলেও পারিবারিক মূল্যবোধ, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ববোধ এবং ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতি আন্তরিকতা প্রশংসনীয়। আবার উচ্চশিক্ষিত অনেক মানুষও লোভ, ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিস্বার্থের কাছে নৈতিকতাকে বিসর্জন দেন। তাই প্রকৃত শিক্ষা হলো সেই শিক্ষা, যা মানুষের বিবেককে জাগ্রত করে।
মানুষের ব্যক্তিগত জীবনও সমাজের বাস্তবতার একটি অংশ। দারিদ্র্য, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য এবং নিরাপত্তাহীনতা মানুষের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কোথাও একাধিক বিয়ে সামাজিক মর্যাদার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, কোথাও অর্থনৈতিক চাপে মানুষ বিয়ে ছাড়া একসঙ্গে বসবাস করেছে, আবার কোথাও অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ, গর্ভপাত কিংবা পারিবারিক ভাঙনের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এসব বাস্তবতা কেবল ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এর সঙ্গে শিক্ষা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, আইনের প্রয়োগ এবং সামাজিক মূল্যবোধ গভীরভাবে জড়িত।
ধর্মের কাজ বাস্তবতা অস্বীকার করা নয়; বরং মানুষকে উত্তম বাস্তবতার দিকে পরিচালিত করা। তাই প্রকৃত ধর্মশিক্ষা মানুষকে আত্মসংযম, দায়িত্ববোধ, সততা ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। ধর্ম যদি মানুষের চরিত্রে পরিবর্তন না আনে, তবে সেই ধর্মচর্চা কেবল বাহ্যিক আচারেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
এই কারণেই ধার্মিকতা ও ধর্মান্ধতার পার্থক্য বোঝা জরুরি। ধার্মিক মানুষ স্থান, কাল ও পাত্র বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জানেন, ইসলামের উদ্দেশ্য মানুষের জন্য সহজতা সৃষ্টি করা, অযথা কঠোরতা নয়। মহান আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।” (সূরা আল-বাকারাহ, ২:১৮৫) তাই যে ব্যক্তি ধর্মকে মানুষের জন্য অসহনীয় বোঝা বানিয়ে ফেলে, সে ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে দূরে সরে যায়।
প্রকৃত ধার্মিক মানুষ কখনো নিজের ধার্মিকতার অহংকার করেন না। তিনি জানেন, মানুষের অন্তরের অবস্থা একমাত্র আল্লাহই জানেন। তাই তিনি অন্যের বিচারক না হয়ে নিজের সংশোধনে বেশি মনোযোগ দেন। পক্ষান্তরে ধর্মান্ধ ব্যক্তি নিজের মতকেই একমাত্র সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করতে চান। তিনি যুক্তির পরিবর্তে আবেগ, সহমর্মিতার পরিবর্তে ঘৃণা এবং দাওয়াতের পরিবর্তে আক্রমণকে বেছে নেন। অথচ আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দিয়েছেন, “তোমার প্রতিপালকের পথে আহ্বান কর প্রজ্ঞা ও উত্তম উপদেশের মাধ্যমে এবং তাদের সঙ্গে উত্তম পন্থায় বিতর্ক কর।” (সূরা আন-নাহল, ১৬:১২৫)। এই একটি আয়াতই বলে দেয়, ইসলামের ভাষা যুক্তি, সৌজন্য ও প্রজ্ঞার ভাষা; বিদ্বেষের নয়।
ধর্মান্ধতা মানুষের বিবেচনাশক্তিকে সংকুচিত করে দেয়। তখন মানুষ ধর্মের মূল শিক্ষা-সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, আমানতদারিতা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও মানবসেবাকে ভুলে গিয়ে কেবল বাহ্যিক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। অনেককে দেখা যায়, নিজের ফরজ ইবাদতের প্রতি উদাসীন; কিন্তু অন্যের পোশাক, জীবনযাপন বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কঠোর মন্তব্য করতে দ্বিধা করেন না। ইসলাম কখনো এই দ্বৈত নীতিকে সমর্থন করে না। রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, “মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে।” আরেক বর্ণনায় মানুষের নিরাপত্তাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ ধর্মের প্রথম পরিচয় মানুষের জন্য নিরাপত্তা, আতঙ্ক নয়।
ভাগ্যে বিশ্বাস ইসলামের একটি মৌলিক আকিদা। কিন্তু ভাগ্যে বিশ্বাস কখনো কর্মবিমুখতার শিক্ষা দেয় না। কেউ যদি বলে, “আল্লাহ রক্ষা করবেন”-এই ভরসায় চলন্ত ট্রেনের সামনে দাঁড়িয়ে যায়, তবে সেটি ঈমান নয়; সেটি অবিবেচনা। একইভাবে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা থাকলে স্বাস্থ্যবিধি মানা, চিকিৎসা গ্রহণ করা এবং অন্যকে নিরাপদ রাখা ইসলামের দায়িত্বশীল আচরণেরই অংশ। মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সংক্রামক রোগের বিস্তার রোধে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। অতএব, ধর্ম মানুষকে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে না; বরং বাস্তবতার মধ্যেই দায়িত্বশীল জীবনযাপন শেখায়।
আজ প্রযুক্তির যুগে পৃথিবী হাতের মুঠোয়। তথ্যের প্রাচুর্য বেড়েছে, কিন্তু প্রজ্ঞা সবসময় বাড়েনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই না করেই ধর্মীয় বক্তব্য ছড়িয়ে দেওয়া, ঘৃণা উসকে দেওয়া কিংবা অন্যকে অপমান করা খুব সহজ হয়ে গেছে। অথচ ধর্মীয় বিষয়ে অজ্ঞতা নিয়ে কথা বলা অত্যন্ত বিপজ্জনক। ইসলাম জ্ঞান, গবেষণা ও সত্য যাচাইয়ের শিক্ষা দেয়। তাই ধর্মকে জানার জন্য কুরআন, সহিহ হাদিস এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করা জরুরি।
পৃথিবীর ইতিহাসে বহু বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও মনীষী ধর্মীয় পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। আবার অনেক সমাজে শিক্ষা বিস্তারের মাধ্যমে ধর্মীয় মূল্যবোধ ও বৈজ্ঞানিক চিন্তা পাশাপাশি বিকশিত হয়েছে। প্রকৃত জ্ঞান কখনো সত্যের সঙ্গে সংঘর্ষে যায় না। কারণ সত্যের উৎস একটিই। যখন শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায় এবং ধর্ম মানুষকে নৈতিকতা শেখায়, তখন একটি সুস্থ সমাজ গড়ে ওঠে।
একটি রাষ্ট্র পরিচালিত হয় সংবিধান, আইন ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে। সেখানে ধর্মীয় পরিচয় যাই হোক না কেন, প্রত্যেক নাগরিকের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া অপরিহার্য। একজন প্রকৃত ধার্মিক কখনো আইন নিজের হাতে তুলে নেন না। তিনি জানেন, বিশৃঙ্খলা নয়; শৃঙ্খলাই সমাজকে টিকিয়ে রাখে।
ধর্মের একটি গ্রহণযোগ্য সংজ্ঞা হতে পারে-ধর্ম হলো এমন একটি নৈতিক, আধ্যাত্মিক ও সামাজিক জীবনব্যবস্থা, যা মানুষকে সৃষ্টিকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন, আত্মশুদ্ধি, ন্যায়বিচার, মানবকল্যাণ এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনের শিক্ষা দেয়। বিভিন্ন ধর্মে আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসের ভিন্নতা থাকলেও নৈতিকতার মৌলিক শিক্ষায় বিস্ময়কর মিল রয়েছে। সত্যবাদিতা, দয়া, সততা, অন্যের অধিকার রক্ষা এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার শিক্ষা প্রায় সব ধর্মেই বিদ্যমান।
ধর্ম কখনো সন্ত্রাসের নাম হতে পারে না। সন্ত্রাস জন্ম নেয় অজ্ঞতা, ক্ষমতার লোভ, রাজনৈতিক স্বার্থ, অসহিষ্ণুতা এবং ধর্মের অপব্যাখ্যা থেকে। ধর্মান্ধতা যখন মানবিকতাকে গ্রাস করে, তখন মানুষ ধর্মের নাম ব্যবহার করে এমন কাজও করতে পারে, যা ধর্ম নিজেই নিষিদ্ধ করেছে। তাই ধর্মকে দোষারোপ করার আগে ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা এবং মানুষের আচরণের পার্থক্য বুঝতে হবে।
আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ধর্মীয় আবেগ নয়, ধর্মীয় প্রজ্ঞা; মুখস্ত বক্তব্য নয়, অনুধাবন; ঘৃণা নয়, সহমর্মিতা; বিভাজন নয়, মানবিক ঐক্য। একজন ধার্মিকের পরিচয় তার পোশাকে নয়, তার চরিত্রে; তার কথায় নয়, তার কাজে; তার দাবিতে নয়, তার ন্যায়বোধে।
ধার্মিকতা মানুষকে বিনয়ী করে, ধর্মান্ধতা মানুষকে উদ্ধত করে। ধার্মিকতা মানুষকে কাছে টানে, ধর্মান্ধতা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। ধার্মিকতা শান্তি প্রতিষ্ঠা করে, ধর্মান্ধতা সংঘাত সৃষ্টি করে। তাই সমাজ, রাষ্ট্র এবং মানবতার কল্যাণে আমাদের ধর্মান্ধ নয়, প্রকৃত ধার্মিক মানুষ হওয়ার চর্চা করতে হবে। কারণ ধর্মের চূড়ান্ত লক্ষ্য মানুষকে মানুষ বানানো-ঘৃণার নয়, ভালোবাসার; বিভেদের নয়, ন্যায় ও করুণার পথে পরিচালিত করা।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।