পররাষ্ট্রনীতিতে প্রথম পদক্ষেপ অনেক সময় একটি সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের দিকনির্দেশনা বহন করে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব গ্রহণের পর তাঁর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরের জন্য চীন ও মালয়েশিয়াকে নির্বাচন করায় তা কেবল দুটি দ্বিপাক্ষিক সফরেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং এটি বাংলাদেশের পূর্বমুখী কৌশলগত অগ্রাধিকার, আঞ্চলিক সম্পৃক্ততা এবং নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় জাতীয় স্বার্থকে পুনর্বিন্যাসের একটি সুস্পষ্ট বার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি ছিল ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক। কিন্তু পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় কেবল ঐতিহ্যগত অংশীদারদের ওপর নির্ভর করে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ করা কঠিন হয়ে উঠছে। আজকের বিশ্বে অর্থনৈতিক করিডোর, প্রযুক্তিগত অংশীদারিত্ব, সাপ্লাই চেইন, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক জোট কাঠামোই যে কোনো রাষ্ট্রের কৌশলগত শক্তির সূচক হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে বাংলাদেশের জন্য দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা এখন আর কেবল বিলাসিতা নয়, বরং বাস্তব প্রয়োজন।

এমন বাস্তবতার কেন্দ্রে রয়েছে মালয়েশিয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সফল অর্থনীতি, ইসলামী অর্থব্যবস্থার বৈশ্বিক কেন্দ্র, হালাল শিল্পের নেতৃত্বদানকারী দেশ এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য মূল্যবান। দু’দেশের সম্পর্ক এতদিন মূলত শ্রমবাজার ও রেমিট্যান্সকে ঘিরে আবর্তিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান উদ্যোগগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, সে সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে সম্পর্ক এখন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষি, শিক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং শিল্প সহযোগিতার বিস্তৃত পরিসরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো আসিয়ানকে ঘিরে বাংলাদেশের নতুন আগ্রহ। বিশ্ব অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত। উৎপাদন, বাণিজ্য, লজিস্টিকস এবং প্রযুক্তির যে নতুন কেন্দ্র গড়ে উঠছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে আসিয়ান। বাংলাদেশ যদি এ অর্থনৈতিক প্রবাহের সঙ্গে নিজেকে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারে, তবে রপ্তানি বাজার বৈচিত্র‍্যকরণ, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং শিল্পায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। উন্নয়নশীল দেশ থেকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের পথে এই সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তবে কেবল অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেই এ সফরকে মূল্যায়ন করলে এর পূর্ণ তাৎপর্য ধরা পড়বে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের একটি মৌলিক নীতি হলো, কোনো রাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে যতবেশি বিকল্প অংশীদার তৈরি করতে পারে, তার কূটনৈতিক সক্ষমতাও তত বৃদ্ধি পায়। বহুমাত্রিক সম্পর্কের অর্থ কোনো দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বাড়ানো। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় ছোট ও মাঝারি শক্তির রাষ্ট্রগুলো ঠিক এ কৌশলই অনুসরণ করছে। বাংলাদেশও যদি সে পথ অনুসরণ করে, তবে তা হবে বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতিরই প্রতিফলন।

এক্ষেত্রে একটি সতর্কতার কথাও বলা জরুরি। বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন বিশ্ব রাজনীতি দ্রুত পুনর্বিন্যাসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনের যুগে কেবল পুরোনো কাঠামোর ওপর নির্ভর করলে চলবে না। নতুন বাজার, নতুন অংশীদার এবং নতুন কৌশল খুঁজে বের করাই হবে ভবিষ্যতের সাফল্যের চাবিকাঠি। মালয়েশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় সেই বৃহত্তর যাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হতে পারে। এখন প্রয়োজন ধারাবাহিকতা, বাস্তবায়ন এবং সর্বোপরি এমন একটি পররাষ্ট্রনীতি, যার কেন্দ্রে থাকবে একটিই বিষয়, বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ।

এ সফরের মূল্যায়নে কেবল ইতিবাচক দিকগুলোই সামনে আনা যথেষ্ট নয়। বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দুটি বিষয়। প্রথমত, দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুরোপুরি উন্মুক্ত করার বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মালয়েশিয়ার আরও সক্রিয় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ভূমিকার নিশ্চয়তা। শ্রমবাজার নিয়ে দু’দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা ও দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর বিষয়ে ইতিবাচক বক্তব্য এসেছে। কিন্তু নতুন করে কতজন বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ পাবেন, কবে থেকে নিয়োগ শুরু হবে কিংবা শ্রমবাজার সম্পূর্ণভাবে পুনরায় চালুর কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা সফর থেকে আসেনি। অথচ বাংলাদেশের লাখো সম্ভাব্য অভিবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের প্রত্যাশা ছিল এ বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত।

একইভাবে রোহিঙ্গা ইস্যুও সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য হওয়ার কথা ছিল। মালয়েশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই রোহিঙ্গা সংকটে উদ্বেগ প্রকাশকারী দেশগুলোর একটি এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র। পাশাপাশি আসিয়ানের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবেও মিয়ানমার প্রশ্নে তাদের একটি কূটনৈতিক ভূমিকা রয়েছে। মালয়েশিয়াতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গাও বসবাস করে। কিন্তু যৌথ বিবৃতি কিংবা প্রকাশ্য আলোচনায় রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য কোনো নতুন উদ্যোগ, আঞ্চলিক রোডম্যাপ বা কার্যকর কূটনৈতিক পদক্ষেপের ঘোষণা দেখা যায়নি। ফলে এ ক্ষেত্রে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে একটি স্পষ্ট ব্যবধান রয়ে গেছে। কূটনৈতিক সফরের সাফল্য কেবল কতটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। সমান গুরুত্বপূর্ণ হলো, জনগণের প্রত্যাশার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে কতটা দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। সে বিবেচনায় মালয়েশিয়া সফর সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিলেও শ্রমবাজার ও রোহিঙ্গা ইস্যুর মতো দুটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে আরও বাস্তব ফলাফল প্রত্যাশিত ছিল।

এবার আসা যাক চীন প্রসঙ্গে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে চীনের গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি, বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার এবং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান বিনিয়োগকারী হিসেবে বেইজিং দীর্ঘদিন ধরেই ঢাকার কৌশলগত সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর এবং সেখানে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলো স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। সরকারিভাবে এ সফরকে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। সংসদে সরকারি দল ও বিরোধী দল নজিরবিহীনভাবে সফল সফরের জন্য সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি প্রস্তাবও অনুমোদন করেছে। কিন্তু কূটনীতির মূল্যায়ন কেবল স্বাক্ষরিত চুক্তির সংখ্যা দিয়ে হয় না; বরং দেখতে হয়, দেশের মৌলিক জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে কী অর্জিত হয়েছে এবং কী অপূর্ণ থেকে গেছে।

নিঃসন্দেহে এ সফরে কিছু ইতিবাচক দিক রয়েছে। বিনিয়োগ সহযোগিতা, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন, মানবসম্পদ, কারিগরি শিক্ষা, ম্যান্ডারিন ভাষা শিক্ষা, গণমাধ্যম সহযোগিতা এবং সম্ভাব্য নতুন শিল্প বিনিয়োগ বাংলাদেশের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে হান্ডা ইন্ডাস্ট্রিজের মতো প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে ইতিবাচক বার্তা বহন করে। একই সঙ্গে স্বল্পসুদে ঋণ, দীর্ঘতর গ্রেস পিরিয়ড এবং রপ্তানি সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা ভবিষ্যতের জন্য আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ সফরের প্রকৃত রাজনৈতিক ও কৌশলগত ফলাফল কোথায়?

বাংলাদেশের সামনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক সংকটগুলোর একটি রোহিঙ্গা সমস্যা। প্রায় এক দশক ধরে ১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার ভার বহন করছে বাংলাদেশ। এ সংকট শুধু মানবিক নয়; এটি অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মিয়ানমারের ওপর প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে চীন বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী রাষ্ট্র। সে কারণে প্রত্যেক উচ্চপর্যায়ের বাংলাদেশ-চীন বৈঠকের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত ছিল রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনের জন্য বেইজিং কী ধরনের কার্যকর ভূমিকা নেবে। দুঃখজনকভাবে সফর-পরবর্তী ঘোষণাগুলোতে এ বিষয়টি প্রায় অনুপস্থিত। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের মতো গতানুগতিক কিছু কথা থাকলেও চীনের পক্ষ থেকে নতুন কোনো উদ্যোগ, নির্দিষ্ট সময়সূচি কিংবা মিয়ানমারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের প্রতিশ্রুতি দেখা যায়নি। অথচ এটাই ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশাগুলোর একটি।

এবারের সফর শেষে দু’দেশের মধ্যে যে ঘোষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছে এর চতুর্থ প্যারায় বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশ ‘এক-চীন নীতি’র প্রতি তার দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে জানিয়েছে যে, বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে, তাইওয়ান চীনের ভূখণ্ডের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী চীন সরকারেরই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ প্রতিনিধিত্বকারী সরকার হিসেবে স্বীকৃতি রয়েছে। বাংলাদেশ ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’র যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টার দৃঢ় বিরোধিতা করে এবং জাতীয় পুনঃএকত্রীকরণ অর্জনে চীনের প্রচেষ্টার প্রতি দৃঢ় সমর্থন ব্যক্ত করে। সচেতন পাঠকের মনে থাকার কথা ২০০৪ সালে তাইওয়ান ঢাকায় একটি Trade

Liaison Office চালু করেছিল। এটি দূতাবাস বা কনস্যুলেট ছিল না, তবে প্রাথমিকভাবে বাণিজ্য, ভিসা ও অর্থনৈতিক যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবেই কাজ শুরু করেছিল। সেখানে ভিসা আবেদনপত্রও বিতরণ করা হতো। এই অফিসটি খোলার ব্যাপারে চীনের প্রতিক্রিয়া ছিল প্রকাশ্য এবং কড়া। চীন এটিকে বাংলাদেশের এক-চীন নীতি থেকে বিচ্যুতি হিসেবে দেখে। সে সময় চীন বাংলাদেশকে এর সম্ভাব্য পরিণতি সম্পর্কেও সতর্ক করেছিল বলে একাধিক কূটনৈতিক সূত্র ও পরবর্তী বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছিল। এবারের সফরে তারেক রহমান তাইওয়ানের স্বাধীনতার যে কোনো প্রয়াসের বিরোধিতা এবং একক চীন নীতির প্রতি অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করার মধ্য দিয়ে সে পুরনো ক্ষতটি সারিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন বলেই প্রতীয়মান হয়েছে।

একইভাবে তিস্তা ইস্যুতেও প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। কয়েক বছর ধরেই তিস্তা নদী ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধারে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততার কথা শোনা যাচ্ছে। এবারের সফরেও বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ঘোষণাপত্রের ৮ নং প্যারায় বলা হয়েছে, চীন তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে তার সামর্থ্য অনুযায়ী সহায়তা ও সমর্থন প্রদান করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নিতে দু’দেশের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের প্রতিও সমর্থন জানিয়েছে। এটি ইতিবাচক অগ্রগতি হলেও প্রকল্প বাস্তবায়নের সময়সূচি, অর্থায়নের কাঠামো কিংবা আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়া এ আলোচনাকে বড় অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবসম্মত নয়। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত তিস্তা প্রকল্প এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।

এমন সফরে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকগুলোও বিশ্লেষণের দাবি রাখে। সবগুলো স্মারক সমান গুরুত্ব বহন করে না। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি প্রাথমিক কাঠামো মাত্র, যার বাস্তবায়ন নির্ভর করে পরবর্তী প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রক্রিয়ার ওপর। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, বাংলাদেশ বহুবার বিপুলসংখ্যক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেও তার একটি অংশ কখনো বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তাই কূটনৈতিক সাফল্যের প্রকৃত মানদণ্ড হওয়া উচিত বাস্তব বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দৃশ্যমান উন্নয়ন। এটিও মনে রাখা দরকার, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক নয়; এটি কৌশলগতও। ফলে এ সম্পর্কের প্রতিটি অগ্রগতি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বড় প্রশ্নগুলো উপেক্ষিত থাকলে সেটিও সমানভাবে আলোচনায় আসা উচিত। গণমাধ্যমের একটি অংশ যদি শুধু ইতিবাচক দিক তুলে ধরে আর অপূর্ণতাগুলো আড়াল করে, তাহলে নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও আত্মতুষ্টির ঝুঁকি তৈরি হয়।

তবে দুটি সফরের ইতিবাচক দিক একেবারে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। বাংলাদেশ যদি আগামী দিনে ব্রিকসে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে এবং আসিয়ানের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে সক্ষম হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে তা দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে চীনের সমর্থন এবং মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক সহায়তা বাংলাদেশের জন্য কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে ব্রিকসে সদস্যপদ বা আসিয়ানের সঙ্গে উচ্চতর অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের জন্য নতুন বাজার, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, আঞ্চলিক সংযোগ এবং বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক পরিসর সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। তবে এসব সম্ভাবনাকে এখনই নিশ্চিত সাফল্য হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। কারণ আন্তর্জাতিক জোটে অন্তর্ভুক্তি দীর্ঘ কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল, যেখানে শুধু একটি দেশের সমর্থন নয়, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত রাজনৈতিক ঐকমত্যও প্রয়োজন।

বাংলাদেশের জন্য মালয়েশিয়া ও চীন কেবল দুটি বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র নয়; বরং ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। তাই এ দু’দেশের সঙ্গে সম্পর্ক যত গভীর হবে, বাংলাদেশের সম্ভাবনার পরিধিও তত বিস্তৃত হবে। পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো সফরই চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং একটি দীর্ঘ যাত্রার সূচনা। সে যাত্রার সাফল্য নির্ধারিত হবে তখনই, যখন ঘোষণাপত্রের ভাষা বাস্তব প্রকল্পে, প্রতিশ্রুতি দৃশ্যমান ফলাফলে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়নে রূপ নেবে। বাংলাদেশের জনগণও শেষ পর্যন্ত তেমনটাই দেখতে চায়।