১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ পাকিস্তানের অংশ ছিল এবং আওয়ামী লীগ-এর নেতৃত্বে ওই বছর ভারতীয় হস্তক্ষেপ ও ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গেলেই স্বাভাবিকভাবেই ১৯৪৭ পরবর্তী পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়। পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চল তথা পূর্ব পাকিস্তান বর্তমান বাংলাদেশ এবং তার ধারাবাহিকতায় ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনাকে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতা প্রাপ্তীর পূর্বে জুন মাসের ৩ তারিখ থেকে আগস্ট মাসের ১৩ তারিখ পর্যন্ত বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধান করতে হয়েছিল। বাংলা ও পাঞ্জাবের বিভক্তি, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ ও আসাম প্রদেশের সিলেট জেলায় গণভোট অনুষ্ঠান, ভারত সরকারের সম্পদ ও দায়ের বিভাজন, প্রায় ছয়শত দেশীয় রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণ, সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা কর্মচারীদের বিভাজন ও পুনর্গঠন প্রভৃতি এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ কাজগুলো অত্যন্ত তাড়াহুড়ার মাধ্যমে মাত্র তিয়াত্তুর দিনের মধ্যে সম্পন্ন করতে হয়েছে। এ তাড়াহুড়ায় অনেকগুলো সমস্যার মোটেই সমাধান হয়নি অথবা এমনভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়েছে যা ভারত পাকিস্তান দ্বন্দ্বের দ্বার উন্মুক্ত করেছে। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ছিলেন বৃটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল। ভাইসরয় হিসাবে তিনি ভারতের স্বাধীনতা আইন, ভারত বিভাজন এবং ক্ষমতা হস্তান্তর বাস্তবায়নেরও দায়িত্বে ছিলেন। মুসলিম লীগ নবসৃষ্ট পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হিসাবে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ঘোষণা করে, ভারত অত্যন্ত চাতুর্যের সাথে লুই ফ্রান্সিস আরবাট ভিক্টর নিকোলাস মাউন্ট ব্যাটেনকে ( যিনি লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন নামে পরিচিত) ভারতের গভর্নর জেনারেল হিসেবে নিয়োগ দেয়, ভারতের প্রতি তার পক্ষপাত ছিল প্রণিধানযোগ্য। মাউন্ট ব্যাটেন ভারত বিভাজনের কাজটি এতই তাড়াহুড়ার মধ্যে সম্পাদন করেছিলেন যেন এটি ছিল একটি সামরিক অপারেশন। এর ফলে প্রশাসন ভেঙে পড়েছিল এবং মুসলমানরা বিশেষ করে পাকিস্তান সাংঘাতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
উল্লেখ্য, বাংলা ও পাঞ্জাব আইনসভা ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা তথা দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রদেশ দুটির বিভক্তির অনুকূলে রায় দেয়ার পর ১৯৪৭ সালের জুন মাসের ২৭ তারিখে কেন্দ্র ও উভয় প্রদেশের কাজকর্ম তদারকের জন্য একটি পার্টিশান কাউন্সিল গঠন করা হয়। কেন্দ্রে এ কমিটি একটি স্টিয়ারিং কমিটির মাধ্যমে তার তৎপরতা পরিচালন করে। কমিটির সদস্য ছিলেন যথাক্রমে মুসলমানদের পক্ষে জনাব চৌধুরী মোহাম্মদ আলী (যিনি পরবর্তীকালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন) এবং হিন্দুদের পক্ষে ছিলেন শ্রী এইচ এম পাটেল। এ ছাড়াও সামগ্রিক প্রশাসন বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর বিভাজন, প্রশাসনিক ব্যবস্থার বিন্যাস, রেকর্ড পত্র, কর্মকর্তা কর্মচারী, সম্পদ ও দায়ের ভাগাভাগি, মুদ্রা, বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংক ও ট্রেজারী সংক্রান্ত সমস্যাবলী সুরাহার জন্য ১৫টি বিশেষজ্ঞ কমিটি নিয়োগ করা হয়। কমিটিসমূহের কাজ ছিল নির্ধারিত সময় অর্থাৎ ১৫ আগস্টের মধ্যে তাদের স্ব স্ব বিষয়াবলী সমস্যার সমাধান সম্বলিত সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব তৈরি, পরীক্ষা নিরীক্ষা এবং পার্টিশান কাউন্সিলের নিকট পেশ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ।
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত পার্টিশান কাউন্সিলের অগ্রগতি সন্তোষজনক ছিল, কিন্তু ক্ষমতা হস্তান্তরের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উল্টে যায়। ভারত সরকার ক্ষমতা হস্তান্তরের পূর্বে প্রদত্ত সমস্ত প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যায়। ক্ষমতা হস্তান্তরের ২৮ দিন পর ফিল্ড মার্শাল অচিনলেক বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীকে ২৭ সেপ্টেম্বর একটি চিঠি লিখেন, চিঠিতে তিনি লিখেন, ‘As soon as British Authority was withdrawn (the India’s) disregarded solemn obligation which they had freely incurred ........ what mattered to them above all else was to cripple and thwart the establishment of Pakistan as a viable independent state’
সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, দফতর অধিদফতর পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় কোনো নথি ও দলিল দস্তাবেজই ভারত সরকার দিল্লী থেকে করাচী পাঠায়নি। সরকারী রেকর্ডপত্র বহন করে দিল্লী থেকে করাচী আসার পথে প্রথম দু’টি ট্রেনের যাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করা হয় এবং জালিয়ে দেয়া হয়, নাগরিকদের পাসপোর্ট সংক্রান্ত সামান্য ব্যাপারে ও পাকিস্তানকে তথ্য প্রদান করতে অস্বীকার করে। অবিভক্ত ভারতের রাজধানী ছিল দিল্লীতে এবং এই অবস্থায় সরকারের সমস্ত রেকর্ড ও দলীলপত্র ভারতের হাতে ছিল এবং এর সুযোগ গ্রহণ করে তারা পাকিস্তানকে তার জন্মের সাথে সাথেই গলাটিপে হত্যা করতে চেয়েছিল। করাচীতে রাজধানী স্থাপন করে নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তানকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে যাত্রা শুরু করতে হয়েছে। ভারতের strangler plan এর অন্তর্ভুক্ত দু’টি বিষয় উল্লেখ করতেই হয়। এর একটি হচ্ছে সামরিক সরঞ্জাম ও গোলাবারুদের বণ্টন এবং অন্যটি হচ্ছে অবিভক্ত ভারত সরকারের নগদ অর্থের বণ্টন। এর মধ্যে প্রথমোক্ত সামগ্রীর বণ্টন তদারক করার জন্য গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনকে চেয়ারম্যান করে একটি যৌথ প্রতিরক্ষা কাউন্সিল গঠন করা হয়। কমিটিতে সুপ্রীম কমান্ডার ফিল্ড মার্শাল লর্ড অচিনলেক এবং নৌ ও বিমান বাহিনী প্রধানগণ ছিলেন। এ কাউন্সিলের দায়িত্ব ছিল সামরিক বাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদ এবং সমরাস্ত্র কারখানাসমূহ বণ্টন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে ১৯৪৮ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে সম্পন্ন করা। বিস্ময়ের ব্যাপার ছিল যে ক্ষমতা হস্তান্তরের অব্যবহিত পরই ভারত বুঝতে পারে যে সামরিক সরঞ্জাম বণ্টনের জন্য গঠিত নিরপেক্ষ এ কাউন্সিলটি বহাল থাকলে তার পরিকল্পনা বাস্তাবায়নের পথে অন্তরায় সৃষ্টি হবে অর্থাৎ সামরিক শক্তির দিক থেকে পাকিস্তানকে বঞ্চিত করা যাবে না। এ অবস্থায় তারা গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটনের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করেন যাতে করে তিনি কাউন্সিলটি ভেঙে দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ভারতের শাসনতান্ত্রিক গভর্নর জেনারেল হিসেবে তিনি তার মন্ত্রী সভার চাপ অমান্য করতে পারেননি; ‘অনিচ্ছা’ সত্ত্বেও ফিল্ড মার্শাল লর্ড অচিনলেককে পাকিস্তানের প্রতি অন্যায়ভাবে সহানুভুতিশীল আখ্যায়িত করে যৌথ প্রতিরক্ষা কাউন্সিল ভেঙে দেন।
অচিনলেক স্বয়ং বৃটিশ প্রধানমন্ত্রীর কাছে এ ব্যাপারে যে পত্র দেন তার ভাষা ছিল : I have no hesitation whatever in affirming that the present India cabinet are implacably determined to do all in their power to prevent this establishment of the Dominion of Pakistan on a firm basis. In this I am supported by all responsible British officers Cognizant of the situation. তার এ পত্র পাকিস্তানকে অস্ত্র সম্ভারের ন্যায্য হিসসা থেকে বঞ্চিত করার ভারতীয় ষড়যন্ত্রের প্রতি ইংগিত ছিল। বলা বাহুল্য, ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট অবিভক্ত ভারত সরকারে নগদ অর্থের মওজুত ছিল ৪০০ কোটি টাকা (রুপী) ভারতের আয়তন ছিল ৩২,৮৭,২৬৩ বর্গ কি.মি.। পক্ষান্তরে অবিভক্ত পাকিস্তানের আয়তন ছিল ১০,৩০,৩৭৩ বর্গ কি. মি.। (প. পাকিস্তান ৮,৮১,৯১৩ বর্গ কি. মি. + পূর্ব পাকিস্তান ১,৪৮,৮৬০ বর্গ কি. মি.) এ প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের আনুপাতিক পাওনার পরিমাণ দাঁড়ায় ১২৫৩০৬ কোটি রুপী ; তবে পাকিস্তান এই নগদ অর্থ থেকে ১০০/০০ কোটি টাকা মাত্র দাবি করে।
ভারত তা দিতে অস্বীকার করে এবং এজন্য একটি সালিশী ট্রাইবুনাল গঠিত হয়। ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসে উভয় দেশ একটি চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুযায়ী নগদ অর্থে পাকিস্তানের হিসসা হিসাবে ৭৫ কোটি রুপী নির্ধারন করা হয়। এর আগে দেশ ভাগের সময় পাকিস্তান ও ভারত উভয় দেশের ব্যাংকার ও ক্যারেন্সি অথরিটি হিসাবের ১৯৪৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দায়িত্ব পালনের ভার রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার ওপর অর্পণ করা হয়। ভারত সরকার পাকিস্তানকে দেয় ৭৫ কোটি টাকা যাতে তার একাউন্টে জমা না হয় সেই মর্মে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়াকে পরামর্শ প্রদান করে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলে পাকিস্তানের তৎকালীনর পররাষ্টমন্ত্রী জাফরুল্লাহ খান প্রদত্ত তথ্যানুযায়ী পাকিস্তানের পাওনা মোট ১৬৫০০০ টন অর্ডন্যান্সি জারির মধ্যে তাকে মাত্র ৪৭০৩ টন দেয়া হয়েছে যার অধিকাংশই ছিল অকেজো ও ঝং ধরা। বিভাজন চুক্তিতে পাকিস্তানের অনুকূলে ১৫০টি শেরম্যান ট্যাংক বরাদ্দ ছিল কিন্তু একটিও তাকে দেয়া হয়নি। একই অবস্থা হয়েছে ডাক, তার, টেলিগ্রাম, টেলিফোন, রেলওয়ে, গণপূর্ত বিভাগের বেলায়।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানকে আলাদা করে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে ভারত বাংলাদেশকে সহয়তা করেছে। বাংলাদেশকে স্বাধীনতা সংগ্রামে সহযোগিতা করার পেছনেও তাদের নিজস্ব স্বার্থ ছিল, তারা তাদের চিরশত্রু পাকিস্তানকে দুর্বল করা এবং এ অঞ্চলের বাজার দখল ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই তাদের মূল লক্ষ্য ছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর তাদের লুটপাটের ইতিহাস থেকে তা পরিষ্কার হয়ে ওঠে। এই লুটপাট ছিল নিম্নরূপ:
১। যুদ্ধ শেষে প্রায় দুইশ’ ওয়াগন রেলগাড়ি ভর্তি করে ২৭০০ কোটি টাকার অস্ত্র-শস্ত্র লুটের অভিযোগ ভারতীয় সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে।
যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১৩ বিলিয়িন ডলার। (সূত্র: দৈনিক অমৃতবাজার, ১২ মে,১৯৭৪)
২। শস্য লুট : ধান-চাল-গম (৭০-৮০ লাখ টন, গড়ে ১০০ টাকা ধরে): ২১৬০ কোটি টাকা। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার।
৩। পাট (৫০ লাখ বেলের উপরে): ৪০০ কোটি টাকা। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলার।
৪। ত্রাণসামগ্রী পাচার: ১৫০০ কোটি টাকা। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার।
যুদ্ধাস্ত্র, ওষুধ, মাছ, গরু, বনজ সম্পদ: ১০০০ কোটি টাকা। যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার।
সর্বমোট: ৫০০০ কোটি টাকা যার বর্তমান বাজার মূল্য প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার। (সূত্র: জনতার মুখপাত্র, ১ নভেম্বর ১৯৭৫)
৩.বাংলাদেশের শিল্প কারখানা থেকে যন্ত্রাংশ চুরি করে আগরতলায় পাঁচটি নতুন পাটকল স্থাপন!
(সূত্র: আখতারুল আলম, দুঃশাসনের ১৩৩৮ রজনী, ১১৫-১১৬ পৃষ্ঠা)
যুদ্ধের পর সীমান্তের ১০ মাইল এলাকা ট্রেডের জন্য উন্মুক্ত ঘোষণা।
এর ফলে চোরাচালানরে মুক্ত এলাকা গড়ে উঠে। পাচার হয়ে যায় দেশের সম্পদ। (সূত্র: আবুল মনসুর আহমদ: আমার দেখা রাজনীতির পঁঞ্চাশ বছর, ৪৯৮ পৃষ্ঠা)
৫। ভারতে বাংলাদেশী জাল টাকা ছেপে এদেশে ছেড়ে দেয়া হতো। অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ সে সময় বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, জালনোট আমাদের অর্থনীতি ধ্বংস করে দিয়েছে। (সূত্র: আব্দুর রহিম আজাদ: ৭১ এর গণহত্যার নায়ক কে: ৫২ পৃষ্ঠা)
৬. আমাদের চোখের সামনে চাল-পাট পাচার হয়ে গেছে সীমান্তের ওপারে, আর বাংলার অসহায় মানুষ ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বিশ্বের দ্বারে দ্বারে। (মেজর অব. রফিকুল ইসলাম বীরউত্তম : দুঃশাসনের ১৩৩৮ রজনী, ১১৯-১২৬ পৃষ্ঠা)
৭। ১৯৭১ এর অবাঙালিদের ফেলে যাওয়া সম্পত্তির হরিলুট (সূত্র: এম এ মোহায়মেন: বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ, ১৪-৪৪ পৃষ্ঠা)
৮. ফারাক্কা বাঁধের নামে মরুভূমি করার চক্রান্ত, টাকা বিনিময়ের নামে জাল টাকা ছড়ানো, বর্ডার বাণিজ্যের নামে ভারতের বস্তাপচা মালের বাজার সৃষ্টি। (সূত্র: আখতারুল আলম, দুঃশাসনের ১৩৩৮ রজনী, ১১৫-১১৬ পৃষ্ঠা)
৯। জয়দেবপুর অর্ডিনেন্স ফ্যাক্টরি থেকে অস্ত্র নির্মাণের কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি ভারতে স্থানান্তরিত হয়। (অলি আহাদ: জাতীয় রাজনীতি ১৯৪৫ থেকে ‘৭৫, ৫২৮-৫৩১ পৃষ্ঠা)
১০. “ঢাকায় এতসব বিদেশী জিনিস পাওয়া যায়! এসব তো আগে দেখেনি ভারতীয়রা। রেফরিজারেটর, টিভি টু-ইন-ওয়ান, কার্পেট, টিনের খাবার-এইসব ভর্তি হতে লাগলো ভারতীয় সৈন্যদের ট্রাক।” (সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, পূর্ব-পশ্চিম, ৯২৩ পৃষ্ঠা)
এগুলো হচ্ছে লুটপাটের সামান্য কিছু ঘটনা। এ লুটপাট ছাড়াও এই সময় এখানকার পাট কল, বস্ত্র কল, চিনি কলের মূলধনির সামগ্রী ও যন্ত্রাংশ এবং উৎপাদিত পণ্য ভারতে নিয়ে যাওয়ার তথ্য লোমহর্ষক।
এছাড়াও তারা পাকিস্তানের টাকশালের তৈরি মুদ্রাসমূহ বিশেষ করে তামার তৈরি ১ পয়সা, ২পয়সা ও ৫ পয়সার কয়েন, রুপার তৈরি শিকি, আধুলি ও ১ টাকার কয়েনসমূহ ভারতে নিয়ে ফাউন্টেন পেন এর নিব ও অলংকার কাজে ব্যবহার করে। তৎকালীন স্টেট ব্যাংক অফ পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ ব্যাংক লুট করে তারা নগদ ও রিজার্ভ এবং স্বর্ণ ভারতে নিয়ে যায়। এগুলো প্রতিবাদ করায় মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিলকে গ্রেফতারির শিকার হতে হয়। মোদ্দাকথা বাংলাদেশ ভারত সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ৭১, ৭১ পূর্ব ও ৭১ উত্তর এই অঞ্চলের প্রতি ভারতের আচরণ আবশ্যিক ভাবে আলোচনা ও বিশ্লেষণ এসে যায়। (চলবে)