শিশুর সুস্থ ও স্বাভাবিক বিকাশের জন্য যেমন বইয়ের পাতা জরুরি, তেমনি প্রজাপতির মতো মুক্ত আকাশের নিচে ডানা মেলার সুযোগ থাকাও সমভাবে প্রয়োজন। খেলাধুলা কেবল বিনোদন নয়; এটি শিশুর শারীরিক, মানসিক সুস্থতা, সামাজিক দক্ষতা ও নেতৃত্বগুণ বিকাশের অন্যতম প্রধান নিয়ামক। অথচ আগামী দিনের স্বপ্নবাজ শিশু, কিশোর ও তরুণদের খেলার মাঠ দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। কোথাও মাঠ বেদখল হয়ে যাচ্ছে, আবার কোথাও অপরিকল্পিত নগরায়ণের করাল গ্রাসে হারিয়ে যাচ্ছে উন্মুক্ত খেলার মাঠ। ফলে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম এক নীরব শারীরিক ও মানসিক সংকটের দিকে ধাবিত হচ্ছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই তীব্র সংকট নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। আমাদের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ক্ষমতায় যাওয়া কিংবা টিকে থাকার জন্য যতটা ফন্দি ফিকির করেন, তার সামান্যতম অংশও যদি শিশুদের খেলার মাঠ নিয়ে ভাবতেন, তবে আজ এই করুণ দশা হতো না। আমাদের শৈশবে দেখেছি, টিফিনের বিরতি কিংবা ছুটির পর মাঠজুড়ে ফুটবল, গোল্লাছুট, দাঁড়িয়াবান্দা, বৌচি, কানামাছির মতো দেশীয় খেলায় মুখর থাকত চারপাশ। আজ সেই চিরচেনা দৃশ্য ক্রমশই বিলীন। প্রযুক্তি নির্ভর জীবনে শিশুরা যত বেশি স্ক্রিনের দিকে ঝুঁকছে, ততটাই দূরে সরে যাচ্ছে মাঠ থেকে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে শহরাঞ্চলে ব্যাঙের ছাতার মতো আবাসিক ভবন কিংবা বাণিজ্যিক আবহে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়লেও, সেই তুলনায় বাড়ছে না খেলার মাঠ কিংবা শিক্ষার কাক্সিক্ষত গুণগত মান। সাম্প্রতিক এক ভয়াবহ পরিসংখ্যান বলছে, দেশের প্রায় ১০ হাজার ৭৪০ টি স্কুলে কোনো খেলার মাঠই নেই। রাজধানী ঢাকার চিত্র আরও উদ্বেগজনক। এখানে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে পাঁচ হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯৫ শতাংশের বেশি বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হলেও এদের প্রায় ৯৮ শতাংশের নিজস্ব কোনো খেলার মাঠ নেই। ফলে গ্যারেজ, বহুতল ভবন কিংবা ছাদের সীমিত পরিসরেই বন্দি হয়ে পড়েছে বহু স্কুলের শৈশব। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবস্থাও আশাব্যঞ্জক নয়। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর ৩৪২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২৫২টিতে কোনো খেলার মাঠ নেই। উচ্চশিক্ষার আঙিনাতেও এই সংকট দৃশ্যমান- দেশে পরিচালিত ১১৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধেকের বেশি এবং প্রায় ৭২ শতাংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষার্থীরা মাঠের সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলের অনেক সরকারি বিদ্যালয়ে মাঠ থাকলেও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেগুলো খেলাধুলার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাঠ, ক্রীড়া ও শরীরচর্চার ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন খুবই সীমিত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, একজন মানুষের জন্য ন্যূনতম ৯ বর্গমিটার খোলা জায়গা প্রয়োজন। অথচ ঢাকা শহরে জনপ্রতি খোলা জায়গা ১ বর্গমিটারেরও কম।

শুধু শহর নয়, গ্রামীণ জনপদেও খেলাধুলা আজ ভাটার টান। একসময় গ্রামের স্কুলগুলো বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও নানামুখী খেলার আয়োজনে মুখরিত ও প্রাণবন্ত থাকত; আজ সেই চঞ্চল পরিবেশ অনেকটাই বিলীন। এর পেছনে রয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যৌথ পরিবারের ভাঙন, পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সামাজিক বন্ধনের শিথিলতা, সহজলভ্য স্মার্টফোন-ইন্টারনেট এবং পড়াশোনা কেন্দ্রিক অতিরিক্ত প্রতিযোগিতার চাপ। আজ বহু শিশুর বিকেল মাঠের সবুজ ঘাসে কাটে না, কাটে মোবাইল ফোনের পর্দায়। ‘ফ্রি ফায়ার’ বা পাবজির মতো কৃত্রিম অনলাইন গেম তাদের খেলাধুলার জায়গা দখল করে নিচ্ছে। আজকের দিনে আমাদের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা ও সামাজিক মানসিকতা যেন এক আত্মঘাতী অন্ধ ইঁদুর দৌড়ে মেতে উঠেছে। যেখানে একটি শিশুর মেধা, মানবিকতা কিংবা শারীরিক সুস্থতার চেয়ে দিনশেষে তার প্রাপ্ত নম্বরের খতিয়াটিই বড় হয়ে দাঁড়ায়। ভোর থেকে শুরু হয় কোচিংয়ের তাড়া, তারপর স্কুলের চার দেয়ালের বন্দিদশা, আর বিকেলে মাঠের বদলে প্রাইভেট শিক্ষকের টেবিল-এই চক্রে পিষে যাচ্ছে একটি পুরো প্রজন্মের চঞ্চলতা। আমরা যেন শিশুদের মানুষ নয়, বরং জিপিএ-৫ কিংবা গোল্ডেন প্লাস তৈরির একেকটি রোবট বানানোর প্রতিযোগিতায় নেমেছি। এই অন্ধ ইঁদুর দৌড় শুধু তাদের খেলার মাঠটুকুই কেড়ে নেয়নি, কেড়ে নিয়েছে তাদের স্বাভাবিক সামাজিক মানুষ হয়ে ওঠার সুযোগও। এর ফলে একদিকে যেমন তৈরি হচ্ছে একদল আত্মকেন্দ্রিক ও চরম হতাশায় ভোগা কিশোর, অন্যদিকে সমাজ হারাচ্ছে তার ভবিষ্যৎ প্রাণশক্তি। একসময় প্রায় প্রতিটি স্কুলেই একজন করে নিবেদিত ক্রীড়া শিক্ষক থাকতেন, যিনি শিক্ষার্থীদের শরীরচর্চা ও খেলাধুলা সুশঙ্খলভাবে পরিচালনা করতেন। বর্তমানে বহু প্রতিষ্ঠানে এই গুরুত্বপূর্ণ পদটি শূন্য, আবার কোথাও অন্য বিষয়ের শিক্ষককে দিয়ে স্রেফ আনুষ্ঠানিকতার খাতিরে নামকাওয়াস্তে দায়িত্ব পালন করানো হচ্ছে। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক স্তরে সুশৃঙ্খল উপায়ে খেলাধুলা শেখার বা চর্চা করার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অন্যদিকে শহরাঞ্চলের চিত্র আরও দমবন্ধ করা। এখানকার অধিকাংশ বহুতল ভবন কিংবা জরাজীর্ণ ভবনের অন্ধকার খুপরিতে সকাল সাড়ে ৭টায় শিশুরা ঢোকে এবং দুপুর ২ টায় ক্লান্ত শ্রান্ত শরীর ও মন নিয়ে বের হয়। তাদের না আছে একটু স্বস্তিতে বসার ব্যবস্থা, না আছে খেলাধুলার সুযোগ। অথচ একটি উন্মুক্ত মাঠ ছাড়া একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কখনোই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ে যায় বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার সেই বিখ্যাত উক্তি-খেলাধুলার মধ্যে পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার এক মহাশক্তি লুকিয়ে রয়েছে। এটি মানুষকে এমনভাবে অনুপ্রাণিত ও ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, যা অন্য কোনো মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি যুবসমাজের কাছে এমন এক ভাষায় কথা বলে, যা তারা সহজেই হৃদয়ে ধারণ করতে পারে।

মাঠের এই অভাব কেবল শিশুর শরীরেই নয়, তার মানসিক বিকাশেও মারাত্মক আঘাত হানছে। আইসিডিডিআর, বি এর এক সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার স্কুলপড়ুয়া শিশুদের একটি বড় অংশ ডিজিটাল ডিভাইসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তারা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা মোবাইল, ট্যাব, টেলিভিশন কিংবা কম্পিউটারের পর্দার সামনে কাটাচ্ছে। ফলে চোখের সমস্যা, তীব্র মাথাব্যথা ও স্থুলতার মতো শারীরিক ঝুঁকি যেমন বাড়ছে, তেমনি দলগত খেলাধুলার সুযোগ না থাকায় নেতৃত্বগুণ, সহনশীলতা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও সামাজিক দক্ষতার বিকাশও মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চোখের সামনে নিজের কলিজার টুকরা সন্তানের মেধা, মনন, সামাজিক ও সৃজনশীলতার এই অনাকাক্সিক্ষত অপমৃত্যু দেখে আজ অসংখ্য মা-বাবার চোখে-মুখে চরম উদ্বেগ ও বুকভরা উৎকণ্ঠার কালো ছায়া। অনেকে হয়তো ভাবছেন এই সংকট কেবল তাঁদের নিজেদের সন্তানের। অথচ বাস্তব অনুসন্ধান বলছে ভিন্ন কথা-এই নীরব মহামারি আজ প্রতিটি ঘরের চেনা গল্প। তাই এই ভয়াবহ বিপর্যয় থেকে আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করতে হলে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশ্বের অনেক দেশ ইতিমধ্যে কার্যকর কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। জাপানে জায়গার তীব্র সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তারা পকেট পার্ক এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য যৌথ খেলার মাঠ এর ব্যবস্থা করেছে। অন্যদিকে সিঙ্গাপুর ও দক্ষিণ কোরিয়ায় শিশুদের শারীরিক কর্মকাণ্ডে উৎসাহিত করতে পরিকল্পিত উন্মুক্ত খেলার স্থান এবং নানামুখী রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি চালু রয়েছে। আমাদের দেশও এই পথে হাঁটতে পারে।

এই বিপর্যয় রুখতে হলে নগর পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। পর্যাপ্ত খেলার মাঠ ছাড়া নতুন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমোদন না দেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত কঠোরতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। গ্রামীণ বিদ্যালয়ের বেদখল বা অব্যবহৃত মাঠগুলো জরুরি ভিত্তিতে পুনরুদ্ধার করতে হবে; অন্যদিকে শহরের ছোট ছোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সরকারি উদ্যোগ যৌথ খেলার মাঠ গড়ে তোলা যেতে পারে। একই সঙ্গে প্রতিটি স্কুল ও কলেজে দক্ষ শারীরিক শিক্ষকের শূন্যপদ পূরণ এবং নিয়মিত ক্রীড়া কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিজস্ব মাঠ নেই, তাদের জন্য সপ্তাহে অন্তত একদিন নিকটবর্তী মাঠ বা স্টেডিয়ামে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। পাশাপাশি বাড়াতে হবে আন্তঃশ্রেণি ও আন্তঃস্কুল ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন। এক্ষেত্রে অভিভাবকদের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের স্ক্রিন-নির্ভর জীবনের বৃত্ত থেকে বের করে আনতে পরিবারকেই সবার আগে উদ্যেগী হতে হবে। ছুটির দিনে সন্তানকে প্রকৃতির কাছে নিয়ে যাওয়া, ঘরে গল্প ও ইনডোর খেলাধুলার পরিবেশ তৈরি করা এবং কিছু সময় মুক্ত খেলাধুলার সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মাঠবিহীন শিক্ষা কখনো পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা হতে পারে না। তাই আগামী প্রজন্মের সুস্থ ও প্রাণবন্ত বিকাশ নিশ্চিত করতে খেলার মাঠকে শিশুদের মৌলিক অধিকার হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।