সাবেক দুর্নীতি দমন ব্যুরোর পৌণপৌণিক ব্যর্থতা, লাগামহীন স্বেচ্ছাচারিতা ও নানাবিধ অভিযোগের মুখে দেশের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতি দমন কমিশন তার স্থলাভিষিক্ত হয়। অভিযোগ ছিলো যে, দুর্নীতি দমন ব্যুরো প্রকারান্তরে দুর্নীতি লালন ব্যুরোতে পরিণত হয়েছিল। সে অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক বাংলাদেশে দুর্নীতি দমন, নিয়ন্ত্রণ, ও দুর্নীতি প্রতিরোধে গঠিত একটি রাষ্ট্রীয় কমিশন। দুর্নীতি দমন কমিশন একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও স্বশাসিত সংস্থা। এটি ২০০৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ অনুসারে কার্যকর হয়েছে। ২০০৪ সালে আইনটি প্রবর্তনের পর ২০১৩ ও ২০১৬ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়েছে। ২০০৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন বিধিমালা ২০০৭ প্রবর্তন করা হয়েছে। ২০১৯ সালে এ বিধিমালা সংশোধন করা হয়েছে। দুদক চাকরি বিধিমালা প্রবর্তন করা হয়েছে ২০০৮ সালে। একজন চেয়ারম্যান ও দু’জন কমিশনার নিয়ে গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার সেগুনবাগিচায় অবস্থিত। দেশে দুর্নীতি ও দুর্নীতিমূলক কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে একমাত্র স্বীকৃত সংস্থা এটি। যে কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার বিরুদ্ধে কমিশনের এখতিয়ারভুক্ত বিষয়ে কোনো অভিযোগ সমন্বিত জেলা কার্যালয়, বিভাগীয় অথবা সেগুনবাগিচা, ঢাকাস্থ প্রধান কার্যালয় প্রেরণ করার আইনগত সুযোগ রয়েছে।

মূলত, দুর্নীতি দমন ব্যুরোর বিলুপ্তির পর দুর্নীতি দমন কমিশন গঠন করা হলেও যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এটি গঠিত হয়েছিলো দীর্ঘকালের পরিক্রমায় সেসব আজও অর্জিত হয়নি। এ পর্যন্ত কোন সরকারই দুদক সফল ও কার্যকর করার উদ্যোগ গ্রহণ করেনি বরং সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠানটিকে ক্ষমতাসীনদের আজ্ঞাবাহী ও ফরমায়েসী কমিশনে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছে। ক্ষেত্র বিশেষ বিরোধী দলকে দমন ও নাজেহাল করার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এমনকি ১/১১-এর জরুরি সরকারের সময় রাজনীতিকদের চরিত্র হননের কাজে ব্যবহার করেছে দুদকে।

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মূলত সরকারের একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। ফ্যাসিবাদের প্রায় বছর ধরে সংস্থাটি সরকারি দলের মন্ত্রী, এমপি, আমলাদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে বরং বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন ও অপেক্ষাকৃত ছোটখাটো দুর্নীতির ওপর বেশি মনোনিবেশ করেছিল। সরকারপন্থী প্রভাবশালী ব্যক্তিরা প্রায়ই আইনি প্রক্রিয়া থেকে অব্যাহতি পেয়েছিলেন। ফলে প্রতিষ্ঠানটি পরিণত হয়েছিলো সরকারি দলের নেতাকর্মীদের জন্য দায়মুক্তি কমিশনে। এ সময়ে কমিশনের ভূমিকা নিয়ে নানা মহলে ব্যাপক সমালোচনা হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতাসীনরা এ প্রতিষ্ঠানটিকে সে অশুভ বৃত্ত থেকে বের করে আনার জন্য কোন উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। ফলে এক অশুভ বৃত্তেই আটকা পড়েছিলো প্রতিষ্ঠানটি।

আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলে সরকারি দলের সাথে জড়িত দুর্নীতিবাজ নেতা ও ব্যবসায়ীদের বড় অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগ থাকার পরও কমিশন দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। যারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, তাদের বরখাস্ত বা হয়রানি করা হয়েছিল। যেমন, আওয়ামী লীগ আমলে বরখাস্ত হওয়া দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক শরীফ উদ্দিনকে পরবর্তীতে চাকরি ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা হারিয়ে সম্পূর্ণভাবে শাসক দলের স্বার্থরক্ষাকারী সংস্থায় পরিণত হয়েছিল। কিন্তু জুলাই বিপ্লবের পর এ প্রতিষ্ঠান নিয়ে জনগণের মধ্যে নতুন আশাবাদের সৃষ্টি হয়েছিলো। ধরে নেওয়া হয়েছিলো যে, এবার রাষ্ট্রীয় এ প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনভাবে দায়িত্ব পালন করে দেশের দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরতে সক্ষম হবে। এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারও ছিলো বেশ ইতিবাচক। কিন্তু সে আশায় গুঁড়ে বালি পড়তে চলেছে বলেই মনে হচ্ছে।

জনগণের প্রত্যাশাকে সম্মান জানিয়েই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংস্কার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছিল বড় প্রত্যাশা নিয়ে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যেই গঠিত হয় দুদক সংস্কার কমিশন। রাজনীতি ও আমলানির্ভরতা কমিয়ে দুদককে শক্তিশালী করতে কমিশন মোট ৪৭টি সুপারিশ দেয়। কিন্তু সে সুপারিশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোই আমলে নেয়া হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি প্রস্তাব দুদক আইন সংশোধন অধ্যাদেশে স্থান পায়নি। যা অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত।

এ দিকে দুদকের আব্দুল মোমেন কমিশন পদত্যাগ করার তিন মাস পরে নতুন কমিশন গঠনের জন্য সম্প্রতি সার্চ কমিটি গঠন করেছে সরকার। কিন্তু এ সার্চ কমিটিও গঠন হয়েছে আগের নিয়মেই; অর্থাৎ রাজনীতি ও আমলানির্ভরতা কমিয়ে দুদককে শক্তিশালী করতে কমিশন যে সুপারিশ দিয়েছিল, তা আমলে না নিয়ে আগের নিয়মেই দুদক পরিচালিত হতে যাচ্ছে। ফলে দুদক আদৌ রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত থাকতে পারবে কি না, এবং দুদক সংস্কার নিয়ে সরকার কি ভাবছে, সে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যা দেশের আত্মসচেতন মানুষকে খানিকটা উদ্বিগ্ন করে তুলছে।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেয়ার দু’সপ্তাহের মাথায় ৩ মার্চ মেয়াদ পূরণ হওয়ার আগেই পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যান আব্দুল মোমেনসহ ২ কমিশনার। এরপর থেকে নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ে স্বাধীন সংস্থাটি। এতে থমকে গেছে ভিভিআইপি ও ভিআইপির দুর্নীতির অনুসন্ধান, তদন্তসহ কয়েক হাজার মামলার কার্যক্রম।

দুর্নীতি দমন কমিশনকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবমুক্ত রেখে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে ৪৭টি সুপারিশ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত দুদক সংস্কার কমিশন। সে সরকারের জারি করা দুর্নীতি দমন কমিশন অধ্যাদেশ বাতিল করে বর্তমান সরকার দুদক আইন সংশোধনে নতুন যে খসড়া করেছে, সেখানে সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো আমলে নেয়া হয়নি। এমতাবস্থায় দুদকের স্বাধীনতার পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সংস্কার কমিশনের যে সুপারিশগুলোতে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে, আইনের খসড়ায় সেসব বিষয় বিবেচনায় না নেয়াকে হতাশাজনক মনে করছেন দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান।

গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে সংস্কারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে ২০২৪ সালের অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে দুদক সংস্কার কমিশন গঠন করে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালকের নেতৃত্বাধীন দুদক সংস্কার কমিশন ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনা, আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা বৃদ্ধি, রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত করা, কালো টাকা সাদা করার সুযোগ বন্ধ করা, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি তদন্তে বিশেষ ব্যবস্থাসহ ৪৭টি সুপারিশ করা হয়।

কমিশনের অন্যতম সুপারিশের মধ্যে ছিল-দুদকের বিতর্কিত চাকরিবিধির ধারা বাতিল [বিধিমালার ৫৪(২)], কমিশনের মেয়াদ কমিয়ে চার বছর করা, পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠন, নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট প্রতিষ্ঠা, গুরুত্বপূর্ণ পদে নিজস্ব জনবল নিয়োগ, প্রতি জেলায় দুদকের কার্যালয় চালু এবং বিদ্যমান বাছাই কমিটির পরিবর্তে বাছাই ও পর্যবেক্ষক কমিটি গঠন।

এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ ইন্টিগ্রিটি ইউনিট চালু, বাজেট অনুমোদন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের ওপর নির্ভরতা কমানো, অভিযোগ গ্রহণ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়াকে আরো স্বচ্ছ ও সময়াবদ্ধ করা, কমিশনার নিয়োগে রাজনৈতিক প্রভাব কমানো এবং দুদকের কার্যক্রমে জন-আস্থা ফেরানোর বিষয়েও কমিশন গুরুত্ব দেয়।

২০২৫ সালের নভেম্বরে উপদেষ্টা পরিষদ দুদক আইন সংশোধন অধ্যাদেশ অনুমোদন করে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, সংস্কার কমিশনের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ সেখানে বাদ পড়েছে বা দুর্বলভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ নিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। যা কোন ভাবেই কাক্সিক্ষত ছিলো না।

সংস্কার কমিশন দুদক কমিশনের সদস্য তিন থেকে বাড়িয়ে পাঁচজন করার প্রস্তাব করেছিল। একই সাথে কমিশনে আবশ্যিকভাবে নারী সদস্য ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ রাখার প্রস্তাব রাখা হয়েছিল। এ ছাড়া কমিশন দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে। সংশোধিত আইনের খসড়ায় এগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সংস্কার কমিশন দুদকের কমিশনার পদে আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, বিচার, শৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, হিসাব ও নিরীক্ষা পেশা কিংবা সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে কমপক্ষে ১৫ বছরের অভিজ্ঞতা আছে, এমন ব্যক্তিদের নিয়োগের সুপারিশ করেছিল। খসড়ায় এ বিষয়ে কিছু বলা নেই।

দুদক আইনে কমিশনের নিজস্ব প্রসিকিউশন ইউনিট থাকার বাধ্যবাধকতা থাকলেও গত দু’দশকে তা হয়নি। সংস্কার কমিশন প্রাথমিকভাবে ১০-২০ শতাংশ হারে নিজস্ব কর্মকর্তা নিয়োগের মাধ্যমে নিজস্ব প্রসিকিউশন গঠনের সুপারিশ করে ধাপে ধাপে প্রতি বছর ১০ শতাংশ নিয়োগ বাড়ানোর কথা বলেছিল। কিন্তু সংশোধিত খসড়ায় নিজস্ব প্রসিকিউশন গঠনে কোনো প্রস্তাব নেই। দুর্নীতি দমন কমিশন (কর্মচারী) চাকরি বিধিমালার ৫৪(২) বিধিতে বলা হয়েছে, উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই দুদকের কোনো কর্মচারীকে ৯০ দিনের নোটিশ দিয়ে অথবা ৯০ দিনের বেতন পরিশোধ করে চাকরি থেকে অপসারণ করতে পারবে। সংস্কার কমিশন এ বিধি বাতিলের সুপারিশ করলেও খসড়ায় এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

নতুন খসড়ায় সংস্কার কমিশনের একটি পরামর্শের সাথে মিল রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন আইনের ৩২ক ধারা বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই ধারায় জজ, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করতে হলে দুদককে আবশ্যিকভাবে আগে সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন নিতে হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি), বিএফআইইউ, নিবন্ধন অধিদফতর থেকে দুদককে প্রয়োজনীয় তথ্য দেয়ার সুপারিশ করেছিল সংস্কার কমিশন। তবে সংশোধিত আইনের খসড়ায় এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের আদেশে দুদককে তথ্য সরবরাহ ও সহযোগিতা করার বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে।

২০০৪ সালের দুদক আইনে কমিশন গঠনের জন্য ‘সার্চ কমিটি’ করার বিধান আছে। আইন সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশে ‘বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি’ গঠনের বিধান করা হয়। এ কমিটিতে অন্য সদস্যদের সাথে সংসদ নেতা ও বিরোধীদলীয় নেতার মনোনীত একজন করে প্রতিনিধি রাখার কথা বলা হয়েছিল। নতুন খসড়ায় এ বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

আমলাতান্ত্রিক প্রভাব কমাতে সংস্কার কমিশন উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় দুদকের সচিব নিয়োগের সুপারিশ করেছিল। একই সাথে যেকোনো সরকারি কর্মকর্তার ছুটি নিয়ে দুদকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ রাখার সুপারিশ করেছিল কমিশন। কিন্তু খসড়ায় এ বিষয়ে কোনো পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়নি। নতুন সংশোধনী প্রস্তাবে দুদক সচিবের ক্ষমতা আরো বাড়ানোর প্রস্তাব করে একটি উপধারা যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, কোনো কারণে কমিশনে শূন্যতা দেখা দিলে বিশেষ প্রয়োজনে কার্যক্রম অব্যাহত রাখার স্বার্থে কমিশন সচিব মহাপরিচালকদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।

তবে সচিবের ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাবকে আপত্তিকর ও অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করছেন দুদকের কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের অভিমত হলো, প্রস্তাবে কমিশনকে দীর্ঘদিন শূন্য রাখার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং দুদক সচিবকে কমিশনের সব কাজ করার ক্ষমতা দেয়া হচ্ছে। এটি হলে স্বাধীন, স্বশাসিত ও নিরপেক্ষ কমিশন হিসেবে দুদকের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এ বিষয়ে দুদক সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামানের বলেন, আইনের খসড়ায় দুদকের কার্যক্রম পরিচালনায় কর্মী পর্যায়ে গতি আনতে সহায়ক কিছু ইতিবাচক বিষয় রয়েছে, যা বিবেচনার দাবি রাখে। তবে কমিশনহীন অবস্থায় এখন যারা দুদকের নেতৃত্বে আছেন, তাদের কাছে আমলাতান্ত্রিক প্রভাবমুক্ত, বাস্তবে স্বাধীন, কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক কমিশন নিয়ে সুপারিশ আশা করার কোনো যুক্তি নেই; বরং আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণের অধিকতর আইনি কাঠামো প্রতিষ্ঠার প্রয়াস দৃশ্যমান। এ জন্যই কমিশনহীন বর্তমান অবস্থার সুযোগে সচিবের হাতে কমিশনের নির্বাহী ক্ষমতা অর্পণের সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরো কমিশনের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে এখন এককভাবে সচিবের হাতে অর্পণের সুপারিশ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। এ প্রস্তাব গৃহীত হলে শুধু কমিশনহীন অবস্থায় নয়, বরং কমিশন থাকাকালীন আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্বের অধিকতর ক্ষমতায়ন হবে এবং কমিশনের ক্ষমতা আরো খর্ব হবে।

সার্বিক দিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে দুদকের মত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটি অতীতের মত অশুভ বৃত্তেই রয়ে যাচ্ছে। কোন সরকারই যেমন দুদককে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসাবে দেখতে চায় নি, ঠিক তেমনিভাবে নতুন সরকারও সে পথেই অগ্রসর হচ্ছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার বিষয়ক যেসব সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হয়েছিলো, বর্তমান সরকার তা মোটেই আমলে নিচ্ছে না। এমতাবস্থায় প্রতিষ্ঠানটি সরকার ও আমলাতান্ত্রিক প্রভাব মুক্ত হতে পারছে না। এমতাবস্থায় দুদক রীতিমত সাক্ষী গোপাল প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে যাচ্ছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, পতিত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের মত বর্তমান সরকারকে দুদকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে নিজেদের সুবিধাজনক কাজে ব্যবহার করবে।

লাগামহীন দুর্নীতি আমাদের জীবনের প্রধান সমস্যাগুলোর অন্যতম। তাই একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দুর্নীতিমুক্ত করতে দুদককে কার্যকর ও ফলপ্রসূ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। আর এজন্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত ও সুপারিশমালা বাস্তবানের কোন বিকল্প নেই। বিষয়টি সরকার সহ সংশ্লিষ্টরা যত তাড়াতাড়ি উপলব্ধি করবে ততই মঙ্গল।

www.syedmasud.com