॥ আসিফ আরসালান ॥
রাষ্ট্রীয় সফরে ভারত গমনকারী প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদুর রহমানের দিল্লী বিমানবন্দরে হেনস্তার পর কয়েকদিন পার হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের তরফ থেকে পাল্টা অ্যাকশন নেয়ার কোনো খবর এখনো পাওয়া যায়নি। যেদিন জাহেদ ঢাকায় ফিরে আসেন ঐ দিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন যে, বিষয়টি সম্পর্কে বিস্তারিত খবর নেয়া হচ্ছে। খবর নেয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ একই প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তার অফিসে ঢুকে যান।
ঐ দিকে গত ১৬ জুন মঙ্গলবার ড. জাহেদ এক সংবাদ সম্মেলন করেন। তিনি বলেন যে, তাকে হেনস্তা করার প্রতিবাদ রেকর্ড করার জন্য তিনি ফিরে এসেছেন। কিন্তু তার টিমের অন্য যেসব সদস্য আছেন তারা যথারীতি ভারতে ঢুকে গেছেন এবং সম্মেলন করছেন। তাহলে এটা কি ধরনের প্রতিবাদ হলো? সত্যিকার অর্থে যদি প্রতিবাদ বোঝাতো তাহলে ঐ টিমসহ ড. জাহেদের ফেরত আসা উচিত ছিলো। তাদের উচিত ছিলো ঐ সম্মেলন বয়কট করার। ড. জাহেদ নিজেই বলেছেন যে, যে আড়াই ঘণ্টা তাকে ভারতীয় ইমিগ্রেশন পুলিশ আটকে রেখেছিলো ঐ আড়াই ঘণ্টায় তিনি এবং ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশী রাষ্ট্রদূত রিয়াদ হামিদুল্লাহ ঢাকার সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন এবং তাদের জ্ঞাতসারেই তথ্য উপদেষ্টা ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন।
এখন ঢাকায় জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলছে। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জাতীয় সংসদেও এ বিষয়টি নিয়ে কোনো কথা ওঠেনি। তাহলে ব্যাপারটি কী দাঁড়ালো? ভারত কর্তৃক বাংলাদেশের তথ্য উপদেষ্টার এই অপমানকে কি বাংলাদেশ হজম করে নিলো?
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ইন্টারিম সরকারের সারা সময়টাতেই বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক তিক্ত ছিলো। কারণটি বাংলাদেশীদের কাছে দুর্বোধ্য। শেখ হাসিনার পতন ঘটেছে বিপ্লবের মাধ্যমে। তাতে ভারতের তো কোনো কিছু আসে যাওয়ার কথা নয়। কিন্তু দেখা গেলো কোনো কারণ নেই, কিন্তু ভারতীয়রা বাংলাদেশের ওপর হঠাৎ করে বেজায় চটে গেলো। সম্পর্ক খারাপ হতে লাগলো।
অবনতিশীল সম্পর্কের পটভূমিতে ভারত থেকে ঘোষণা করা হয় যে, ড. ইউনূসের সরকার নাকি অনির্বাচিত সরকার। অনির্বাচিত সরকারের সাথে ভারত কোনো সম্পর্ক করবে না। বাংলাদেশে যদি কোনো নির্বাচিত সরকার আসে তাহলে তার সাথে সম্পর্ক গড়বে ভারত। কারণ ভারত নিজে একটি গণতান্ত্রিক দেশ।
১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে একটি নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এখন তো বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্পর্কের উন্নতি হওয়ার কথা। কিন্তু সেটাও হচ্ছে না কেনো? বাংলাদেশ তো ভারতের কাছে বিশেষ কোনো দাবি উত্থাপন করেনি। তাহলে সম্পর্ক খারাপ হচ্ছে কেনো?
ভারত বাংলাদেশের ওপর তার রাগ আর চেপে রাখেনি। গত পরশু অর্থাৎ ১৪ জুন মহাসাগর সম্পর্কে একটি সম্মেলনে যোগ দেয়ার জন্য সরকারের তথ্য উপদেষ্টা ড. জাহেদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল দিল্লী গিয়েছিলো। কিন্তু সেখানে প্রতিনিধি দলের অন্যান্য সদস্যকে কিছু বলা হলো না। কিন্তু প্রতিনিধি দলের নেতা ড. জাহেদুর রহমানকে আড়াই ঘণ্টা ভারতীয় ইমিগ্রেশন পুলিশ আটকে রাখে এবং জেরা করে।
দেশের অভ্যন্তরে ড. জাহেদুর রহমান বা বিএনপির সাথে অনেকের মতদ্বৈধতা থাকতে পারে। কিন্তু যখন সরকারের একটি প্রতিনিধি দল রাষ্ট্রীয় সফরে অন্য দেশে যায় তখন সেটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল। সে দল অন্য দেশে গিয়ে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের প্রতিনিধি হিসাবে যে মর্যাদা এবং প্রটোকল পাওয়ার কথা সেটিই পাবেন, এটিই আন্তর্জাতিক নীতি। কিন্তু বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের নেতা জাহেদুর রহমানকে আড়াই ঘণ্টা আটকে রাখা হয় এবং বিভিন্ন প্রশ্ন করা হয়। তখন ড. জাহেদ এটিকে বাংলাদেশের আত্মসম্মানের প্রশ্ন হিসাবে বিবেচনা করেন।
দিল্লীতে বিমানবন্দরে বোর্ডিং ব্রিজ থেকে বেরোনোর পর তার সাথে সারাক্ষণ ছিলেন দিল্লীতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার রিয়াদ হামিদুল্লাহ। বোর্ডিং ব্রিজ পার হওয়ার পর তারা যখন বেরিয়ে আসেন তখন ভারতীয় ইমিগ্রেশন ড. জাহেদকে আটকে দেন। আড়াই ঘণ্টা পর যখন তাকে ছেড়ে দেয়া হয়, অর্থাৎ ভারতে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয় তখন তথ্য উপদেষ্টা ভারতে প্রবেশে অস্বীকার করেন এবং তার পাসপোর্ট ফেরত চান। অতঃপর ভারতের এ অসৌজন্যমূলক এবং অশোভন আচরণের প্রতিবাদে তিনি প্রথমে কলম্বো আসেন এবং পরে সেখান থেকে ঢাকা ফেরেন। এসব ঘটনা আপনারা সকলেই জেনে গেছেন। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বাংলাদেশের বিগত ৫৫ বছরের ইতিহাসে সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রীর বিদেশ সফরে হোস্ট কান্ট্রির এমন অভদ্র ব্যবহার আর ঘটেনি। কেনো এটা করা হলো?
এখন যে খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে দেখা যায় যে, ভারত বাংলাদেশের সাথে ক্রমান্বয়েই অভদ্র আচরণ করে যাচ্ছে। এ পোস্ট লেখার সময় জানা গেলো যে, নেপাল থেকে বাংলাদেশ ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির যে চুক্তি করেছিলো সে বিদ্যুৎ আমদানিতে ভারত বাধ সেধেছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আনতে গেলে ভারতের ওপর দিয়ে সেটি আনতে হবে এবং ভারতের গ্রিড ব্যবহার করতে হবে। এভাবে তৃতীয় কোনো দেশের ওপর দিয়ে তাদের গ্রিড ব্যবহার করে বিদ্যুৎ আমদানির নজির অনেক রয়েছে। ভারত কিন্তু আগে এই বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তিতে একটি পক্ষ হয়েছিলো। এখন তারা হঠাৎ করে সে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ালো। এ খবরটি দিয়েছে ‘কাঠমান্ডু পোস্ট’ নামক নেপালী পত্রিকা।
ভারতের অসহযোগিতা এবং বাংলাদেশের ওপর অবাঞ্ছিত চাপ প্রয়োগের ঘটনা বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরেও থামেনি। ড. ইউনূসের সময় তারা যে চাপ প্রয়োগ করে আসছিলো এখনো সেগুলি অব্যাহত আছে। সবচেয়ে আপত্তিকর ভারতীয় চাপ হলো সীমান্তে পুশ ইন এবং বর্ডার কিলিং। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের গোলামীর শাসনে ভারতের এ পুশ ইন এবং সীমান্ত হত্যার কোনো প্রতিবাদ করা হয়নি। কিন্তু ড. ইউনূসের সময় থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিবাদ করা হচ্ছে এবং সে প্রতিবাদ হচ্ছে বলিষ্ঠ। গত বুধবার জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ সংসদকে জানিয়েছেন যে, বর্তমান সরকার ক্ষমতা নেয়ার পর এ পর্যন্ত ভারত ৩৬ বার পুশ ইনের চেষ্টা করেছে।
আরো ঘটনা রয়েছে। সীমান্ত হত্যা এবং ভারতের পুশ ইন নিয়ে দিল্লীতে ভারতের বিএসএফ এবং বাংলাদেশের বিজিবির মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিলো। সে বৈঠকও নিষ্ফল হয়েছে। এছাড়া শেখ হাসিনা এবং তার প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের প্রত্যর্পণের বিষয় তো রয়েছেই।
বেগম খালেদা জিয়া ইন্তিকাল করার পর তার জানাযা উপলক্ষে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি সাথে করে নরেন্দ্র মোদির শুভেচ্ছা বার্তা নিয়ে এসেছিলেন এবং সেটি তারেক রহমানের হাতে অর্পণ করেছেন। এরপর তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকারের শপথ গ্রহণের দিন ভারতের শুভেচ্ছার নিদর্শন স্বরূপ ভারতের লোকসভার স্পীকার ওম বিড়লাকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছিলো। কিন্তু তারপর থেকেই সম্পর্ক অকস্মাৎ শীতল হতে থাকে। শীতল হতে হতে এখন তো দেখা যাচ্ছে যে, বরফ জমে যাচ্ছে। তাহলে ঘটনার পেছনে আসল ঘটনা কী?
ভারতের অনলাইন টেলিভিশন ‘দ্যা ওয়াল’ এবং দৈনিক পত্রিকা ‘দ্যা ওয়াল’ বাংলাদেশ নিয়ে প্রতিদিন একাধিক খবর এবং মন্তব্য প্রচার এবং সম্প্রচার করে। ‘ক্যালকাটা ডায়ালগ’ বলে আরেকটি ইউটিউব চ্যানেল আছে যেখানে নিয়মিত বাংলাদেশ সম্পর্কে বক্তব্য দেন মনোজ দাস। এর আগে দি রিপাবলিক বলে আরেকটি অনলাইন টেলিভিশন ছিলো। সেটি চরম বাংলাদেশ বিরোধী ছিলো। ইদানীং দি রিপাবলিক এবং তার অ্যাঙ্কর ময়ূখ রঞ্জন ঘোষকে আর দেখা যায় না।
দ্যা ওয়াল এবং ক্যালকাটা ডায়ালগ ১৫ এবং ১৬ জুন একাধিক সম্প্রচারে বলেছে যে, শেখ হাসিনা সম্পর্কে ড. ইউনূস যে বৈরি আচরণ গ্রহণ করেছিলেন সেক্ষেত্রে তারেক রহমানের সরকার নমনীয় হবে বলে ভারত মনে করেছিলো। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ চেয়েই যাচ্ছে। অথচ তারা জানে যে, ভারত কোনো অবস্থাতেই শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবে না। এ দুটি প্রচার মাধ্যম ছাড়াও ভারতের নেতৃস্থানীয় দুটি দৈনিক পত্রিকা এ মর্মে রিপোর্ট করেছে যে, তারেক রহমান নাকি দেশে ফেরার আগে ভারতকে কথা দিয়েছিলেন যে, বাংলাদেশে যে ইলেকশন হবে সেটি হবে ইনক্লুসিভ বা অংশগ্রহণমূলক। অন্য কথায় সে ইলেকশনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেলো, বিএনপি সরকার ইলেকশনে আওয়ামী লীগকে অংশগ্রহণ করার সুযোগ দেয়া তো দূরের কথা, তারা বরং আওয়ামী লীগের ব্যাপারে ড. ইউনূসের গৃহীত পদক্ষেপকেই আরো শক্তভিত দিয়েছে। ড. ইউনূস নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু বিএনপি সরকার পার্লামেন্টে আইন পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।
তারেক রহমান ক্ষমতায় আসার অব্যবহিত পর চীন যেমন চেয়েছে যে, তারেক রহমান প্রথমে চীন সফর করুন, তেমনি ভারতও চেয়েছে যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী প্রথমে ভারত সফর করুন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন বা ভারত কোথাও প্রথম সফরে যাচ্ছেন না। তিনি প্রথমে যাচ্ছেন মালয়েশিয়াতে। ১৬ জুন মঙ্গলবার একটি নেতৃস্থানীয় বাংলা দৈনিকের রিপোর্টে দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দু’দিনের মালয়েশিয়া সফর শেষ করে সেখান থেকে সরাসরি চীনে যাবেন। মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি চীনে যান, আর দেশে ফিরে তারপর চীনে যান, উভয় ক্ষেত্রেই ভারত খুব নাখোশ।
এছাড়া এ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পদ্মা বাঁধ নির্মাণের। সরকার আরো সিদ্ধান্ত নিয়েছে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চীনকে দেয়া হবে। এসব খবরেও ভারত অনেক রুষ্ট।
ভারতের এ অসন্তোষ এবং ক্রোধ প্রকাশিত হচ্ছে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দেয়া, সীমান্ত হত্যা, বিএসএফ ও বিজিবির শীর্ষ বৈঠক ব্যর্থ হওয়া, ওদের পুশ ইন এবং বাংলাদেশ কর্তৃক সেটি রুখে দেয়া এবং সবশেষে বিদ্যুৎ আমদানিতে বাগড়া দেয়া এবং ড. জাহেদকে দিল্লীতে হেনস্তা করা। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক যে দিকে গড়াচ্ছে সেটি খুব স্বস্তিদায়ক বলে মনে হচ্ছে না। তাই বলে ভারতের অসন্তোষকে আমলে নিয়ে বাংলাদেশ শেখ হাসিনার নতজানু নীতিতে ফিরে যেতে পারে না।