বাঁচতে হলে খাদ্য প্রয়োজন। একটু ভালো করে বাঁচতে গেলে প্রয়োজন অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান। তবে এই ভালোর যেন শেষ নেই। জীবনদর্শন তথা জীবনদৃষ্টির কারণে ভালোর সংজ্ঞায় তারতম্য লক্ষ্য করা যায়। ছাত্রজীবনে আমরা মানুষের জীবন সংগ্রামের কথা জেনেছি, বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য শুনেছিÑ যার সংক্ষিপ্ত বয়ান হলো ‘মানুষের মৌলিক অধিকার’। মৌলিক অধিকারের সংগ্রাম থেমে নেই, আজও চলছে। উপলব্ধি করা যায়, মানুষ আজও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। প্রশ্ন জাগেÑএতো শিক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির এত চর্চা, এতো উৎপাদন, এতো সম্পদের পরও পৃথিবীর সিংহভাগ মানুষ কেন মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত? জবাবে কেউ বণ্টনে সংকটের কথা বলেন, কেউ রাষ্ট্রের ভ্রষ্টনীতির কথা বলেন, কেউ আবার পরাশক্তির এই জামানায় ‘বিশ্বব্যবস্থাকে’ দায়ী করেন। এইসব বক্তব্যকে বিবেচনার মধ্যে রেখেও বলা যায়Ñপৃথিবীতে সম্পদের অভাব নেই, সম্পদের অপচয় এবং অপব্যবহারও হচ্ছে, তবে কাজের কাজটি হচ্ছে না; আর তা হলো মানুষের এই পৃথিবীতে সব মানুষ তার মৌলিক অধিকার পাচ্ছে না। না পাওয়ার অনেক কারণের মধ্যে রয়েছেÑবর্ণবাদ, সম্প্রদায়িকতা, অভিজাত তন্ত্র, জাতিগত দম্ভ এবং তাত্ত্বিক বিতর্ক। এসব দ্বন্দ্ব ও বিতর্কের মধ্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হলো, মানবজাতি এখন মুখোমুখি নতুন আর এক বিশ্বযুদ্ধের। কেউ কেউ তো বলছেন, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে, মাঝে মাঝে শুধু যতি টানা হচ্ছে। পারমাণবিক যুদ্ধের সর্বগ্রাসী বিপর্যয়ের ভীতিই হয়তো এই যতি টানার কারণ।

তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ যদি তার স্বরূপে আবির্ভূত হয়, তাহলে বোধহয় মানুষের আর মৌলিক অধিকারের প্রয়োজন হবে না। তখন মৌলিক অধিকারের রাজনীতিও আর লক্ষ্য করা যাবে না। কারণ, পৃথিবীতে ‘মানব’ নামক প্রাণীর অস্তিত্ব থাকলে তো এসব বিষয়ের চর্চা হবে। তবে এর আগ পর্যন্ত মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা আমাদের বলে যেতেই হবে। মহান স্রষ্টা তো মানববান্ধব করেই এই পৃথিবীটা সৃষ্টি করেছিলেন, কিন্তু মানুষ কি এই পৃথিবীর সাথে বান্ধবের মত আচরণ করছে? করছে না বলেই তো আজ পৃথিবীতে এতো সংকটÑজলবায়ু সংকট, জীববৈচিত্র্যে সংকট, জ¦ালানি সংকট, বিভিন্ন দূষণের সংকট। এসব সংকটে শুধু দরিদ্র ও কালোরাই ভুগছে না; ধনী ও সাদারাও ভুগছেন। অর্থাৎ মানুষের কর্মে পৃথিবী ক্রমেই মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

সবকালেই পৃথিবীর একটা ব্যবস্থা ছিল, সভ্যতা ছিল। কিন্তু এখন আমাদের বিশ্বব্যবস্থা ও সভ্যতার রূপটা কেমন? এ ব্যাপারে অনেকেই কথা বলেছেন। তবে জীবনের একেবারে শেষ পর্যায়ে এসে মৃত্যুর আগে পৃথিবীর অন্যতম শীর্ষ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং তার উপলব্ধির কথা যেভাবে ব্যক্ত করেছেন, তা যে কোনো বিবেকবান মানুষকে স্পর্শ করবে। তিনি বিজ্ঞান, রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি, বৈষম্য, জাতিবিদ্বেষ, এমনকি অভিবাসীদের সংকট নিয়েও কথা বলেছেন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক স্টিফেন হকিংয়ের লেখার শিরোনামটি হলো, ‘বিপজ্জনক সময়ে আমাদের পৃথিবী’। তিনি পুরো পৃথিবী এবং এর সংকট তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। প্রায় ১০ বছর আগে তিনি বিশ্বায়ন এবং প্রাযুক্তিক বিকাশ নিয়ে মানুষের মধ্যে যে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে, তা তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, কারখানা স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ায় বহু মানুষ কাজ হারাচ্ছেন। এর সঙ্গে আছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যার কারণে মধ্যবিত্তের চাকরি হারানোর আশংকা আরও বাড়বে। ফলে বৈষম্যের মাত্রাও বেড়ে যাবে। ইন্টারনেটের বিভিন্ন প্লাটফর্মের মাধ্যমে অল্প কিছু মানুষকে নিয়োজিত করে প্রচুর মুনাফা করার সম্ভব, যার সিংহভাগ ভোগ করবে তার চেয়েও কমসংখ্যক মানুষ। এটা অনিবার্য, যা একই সঙ্গে অগ্রগতিও বটে। কিন্তু এটা সামাজিকভাবে ধ্বংসাত্মক। এমন ব্যবস্থায় অল্প কিছু মানুষ বিপুলভাবে লাভবান হচ্ছেন, আর বাকিদের কাজ হচ্ছে, ওদের সফলতা নিশ্চিত করা। অর্থাৎ আমরা এমন এক পৃথিবীতে বাস করছি, যেখানে মানুষের মধ্যে বৈষম্য শুধু বাড়ছেই। যেখানে বিপুল সংখ্যক মানুষের জীবন-যাপনের মান শুধু নয়, জীবিকা অর্জনের সক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে তারা এখন নতুন সামাজিক চুক্তির সন্ধান করছেন।

স্টিফেন হকিং আরও লিখেছেন-প্রযুক্তি ব্যবহার করে যোগাযোগ করা ইতিবাচক অভিজ্ঞতা, যা আমাদের স্বাধীনতা দেয়। এটা ছাড়াতো আমি এতদিন ধরে কাজই করতে পারতাম না। কিন্তু এর ভিন্নরূপও আছে গরীব মানুষটার হাতে ফোন থাকলে সে ধনীতম মানুষটার জীবন-যাপনটাও দেখতে পাচ্ছে। সাব-সাহারা আফ্রিকা অঞ্চলে যত মানুষ ফোন ব্যবহার করে, তত মানুষ পরিষ্কার পানি পায় না। অর্থাৎ বর্তমান সভ্যতায় অসমতা তথা বৈষম্য থেকে বাঁচার উপায় নেই। এর একটা ফলাফল আছে এবং তা খালি চোখেই দেখা যায়Ñগ্রামের মানুষ শহরে ভিড় করছে, বস্তিতে ঠাসাঠাসি করে থাকছে। এদের অনেকেই আবার উন্নত জীবনের আশায় বিদেশে পাড়ি জমায়। আর তারা অভিবাসী হয়ে যেখানে যায়, সেখানে মানুষের সহিষ্ণুতা কমে যায়, আর এ নিয়ে রাজনীতিতে নতুন ধারাও সৃষ্টি হয়।

বর্তমান সময়ে সভ্যতার সংকটের সমাধানের কথাও বলেছেন স্টিফেন হকিং। তিনি লিখেছেনÑ বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের এক সঙ্গে কাজ করতে হবে, যার প্রয়োজনীয়তা আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। আমাদের কাছে এখন এমন প্রযুক্তি আছে, যা দিয়ে আমরা পৃথিবী ধ্বংস করতে পারি, অথচ সেই ধ্বংসযজ্ঞ এড়ানোর প্রযুক্তি আমরা নির্মাণ করতে পারিনি। আমাদের আছে একটাই পৃথিবী। একত্রে কাজ করে আমাদের একে রক্ষা করতে হবে। এর জন্য জাতিতে জাতিতে যে বৈরিতা, তাদের মধ্যে বিভেদের যে দেয়াল, তা ভেঙ্গে ফেলতে হবে। আর সেটা করতে গেলে বিশ্বনেতাদের এটা স্বীকার করতে হবে যে, তারা ব্যর্থ ছিলেন। তারা প্রতিনিয়ত নানাভাবে ব্যর্থ হচ্ছেন। তারা অন্য অনেক মানুষকে ব্যর্থ করেছেন। বিশ্বের সম্পদ ক্রমাগত অল্প কিছু মানুষের হাতে পুঞ্জীভূত হচ্ছে, এটা মেনে নেওয়া যায় না। কিভাবে সম্পদ আরও বেশি মানুষের মধ্যে ভাগাভাগি তথা বণ্টন করা যায়, তা আমাদের শিখতে হবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো, পৃথিবী থেকে চাকরি-বাকরিই শুধু হারিয়ে যাচ্ছে না, শিল্প খাতও হারিয়ে যাচ্ছে। তাই মানুষকে নতুন পৃথিবীর জন্য উপযুক্ত করতে হবে। তাদের আর্থিকভাবেও স্বচ্ছল করতে হবে। সমাজ ও অর্থনীতি যদি অভিবাসীদের স্রোত সামলাতে না পারে, তাহলে আমাদের বৈশ্বিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে হবে। সেটা করা গেলেই কেবল তারা ঘর ছেড়ে যাবে না, নিজ দেশেই কাজ পাবে। আমরা এটা করতে পারি। কিন্তু তার জন্য লন্ডন থেকে হার্ভার্ড এবং ক্যামব্রিজ থেকে হলিউড পর্যন্ত সব অভিজাতকে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে। তবে সবার ওপরে তাদের সংযম শিখতে হবে, নম্র হতে হবে।

বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার উপলব্ধি ও অভিজ্ঞানের কথা প্রকাশ করে গেছেন। তিনি চলমান বিজ্ঞান প্রযুক্তি চর্চা, রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বিশেষভাবে বৈষম্যের সমালোচনা করেছেন। বর্তমান সভ্যতা ও সভ্যতার শাসক তথা বিশ্বনেতাদের ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। আর জাতিতে জাতিতে যে বৈরিতা ও বিভেদের দেয়াল, তা ভেঙে ফেলার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি আরো উল্লেখ করেছেনÑ পৃথিবীর সম্পদ কিছু দেশ ও মানুষের কাছে পুঞ্জিভূত হয়ে পড়েছে। এ সম্পদ মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল শিখতে হবে। অভিবাসীদের প্রতি সহিষ্ণু হতে হবে, কারণ তারা বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার শিকার। বিশ্বের সব অভিজাতকে অতীত থেকে শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্টিফেন হকিং। আর তাদের সংযমী ও নম্র হওয়ার বিষয়কে সবার ওপরে গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। তবে প্রশ্ন হলো, কারো আহ্বানেই কি মানুষ সংযমী ও বিনম্র হয়ে যাবে? আসলে এর জন্য প্রয়োজন সৃষ্টিতত্ত্বের গভীরতর উপলব্ধি। স্রষ্টার নেয়ামত ভোগকারী মানুষ যখন স্রষ্টাকে মান্য করবে, তার বিধানের আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে যাবে; তখন সে তার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করবে। দায়িত্ববোধ ও জবাবদিহিতার এমন চেতনাই মানুষকে সংযমী ও বিনম্র করতে পারে।