॥ মুন্সী আবু আহনাফ ॥
২০২৬ সালের ১২ জুন বাংলাদেশে নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে প্রবেশের পরপরই ‘দুই দেশ এক হলে বিশ্বশক্তি হবে’ বলে যে মন্তব্য করেন, তা বাংলাদেশের কূটনৈতিক মহল ও সুশীল সমাজে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়। এদিকে গত ১৪ জুন নয়াদিল্লীর ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নীতি ও কৌশলবিষয়ক, তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানকে আড়াই ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা করার ঘটনায় ঢাকা-দিল্লীর কূটনৈতিক সম্পর্কে আবারও নতুন করে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এই নজিরবিহীন ও ‘অপ্রীতিকর’ ঘটনার তীব্র প্রতিক্রিয়ায় গত সোমবার বিকেলে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার পাওয়ানকুমার বঢ়েকে তলব করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই মতামত কলামে সেই মন্তব্যের ঐতিহাসিক ও মতাদর্শগত প্রেক্ষাপট, ‘অখণ্ড ভারত’ ধারণার উৎস ও বিকাশ, এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে এর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
১. ২০২৬ সালের ১২ জুন শুক্রবার দুপুরে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন নবনিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। বাংলাদেশে পা রাখার পরপরই সাংবাদিকদের সামনে তিনি বলেন: ‘ভারতের ১৪০ কোটি জনসংখ্যা আর বাংলাদেশের ২০ কোটি যদি একসঙ্গে করা হয় ১৬০ কোটি। দুই গণতান্ত্রিক দেশের শক্তি এক হলে বিশ্বশক্তিতে পরিণত হবে।’ তিনি আরও বলেন, উভয় দেশের মানুষের স্বপ্ন অভিন্ন এবং ভারত ও বাংলাদেশকে তিনি ‘আলাদা’ ভাবছেন না। একজন নবনিযুক্ত কূটনীতিকের জন্য কোনো দেশে প্রথম পদার্পণের মুহূর্তটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রটোকল অনুযায়ী এ সময় সংশ্লিষ্ট দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শনই রেওয়াজ। কিন্তু দীনেশ ত্রিবেদীর মন্তব্য এই প্রটোকলের বাইরে গিয়ে ‘দুই দেশকে এক’ করার কথা বলে বাংলাদেশে তীব্র আলোচনার ঝড় তোলে। সাথে সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই মন্তব্যের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। দেশের রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ মানুষ তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে বলেন, ‘ভারত যেমন স্বাধীন, বাংলাদেশও তেমনি স্বাধীন।’ হাইকমিশনারের মন্তব্যের আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা চাইতে সরকারকে আহ্বান জানান তিনি। এ ছাড়া অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল এর প্রতিবাদ জানায়।
২. ‘অখণ্ড ভারত’ (Akhand Bharat) ধারণাটি ভারতীয় উগ্র হিন্দুত্ববাদী আন্দোলনের একটি মূল রাজনৈতিক স্লোগান। ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (RSS) এই ধারণার সবচেয়ে বড় প্রচারক। আন্তর্জাতিক গবেষণা পত্রিকা International Affairs-এ প্রকাশিত একটি গবেষণায় (২০২৩) শিবাশিস চ্যাটার্জি এবং উদয়ন দাস দেখিয়েছেন যে, ২০১৪ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতের দক্ষিণ এশিয়া নীতিতে হিন্দুত্ববাদী প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। The Wire-এ প্রকাশিত (জানুয়ারি ২০২৬) একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ‘অখ- ভারত’ ধারণাটি কেবল একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি নয়, এটি একটি রাজনৈতিক-ধর্মীয় প্রকল্প। এটি মূলত ইসলামের আগমনের পূর্বের একটি দক্ষিণ এশিয়ার কল্পনা করে, যা স্বভাবতই বহুত্ববাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধী। বিশেষজ্ঞরা এই ধারণাকে একটি ‘ভিত্তিহীন রাজনৈতিক স্লোগান’ বলে মনে করেন, যা ঐতিহাসিক বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। RSS-এর সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকে ‘অখণ্ড ভারতে’র একটি মানচিত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান এবং মিয়ানমারকেও ভারতের অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছে। RSS-এর সাবেক প্রধান M. S. Golwalkar ১৯৪৯ সালের আগস্ট মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, ‘পাকিস্তান একটি অনিশ্চিত রাষ্ট্র। যতটা সম্ভব আমাদের দুই দেশকে একত্রিত করার চেষ্টা করা উচিত।’ ১৯৬৫ সালে ভারতীয় জনসংঘ (বর্তমান বিজেপি) আনুষ্ঠানিকভাবে একটি প্রস্তাব পাস করে, যাতে অখণ্ড ভারতকে লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
Foreign Policy-তে (মে ২০২২) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়, ‘অখণ্ড ভারতে’র ধারণা হিন্দুত্ব মতাদর্শের একটি মূল স্তম্ভ, যা একশ বছরের পুরনো হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের অংশ। এটি এখন ভারতজুড়ে RSS পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হচ্ছে। বিজেপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও RSS নেতা রাম মাধব আল-জাজিরাকে (২০১৫) বলেছিলেন: ‘RSS এখনো বিশ্বাস করে যে এই ভূখণ্ড গুলো; যা ৬০ বছর আগে আলাদা হয়েছে; একদিন জনগণের সম্মতিতে আবার একত্রিত হবে এবং অখণ্ড ভারত তৈরি হবে।’
৩. ঐতিহাসিক গবেষণা স্পষ্টভাবে দেখায় যে ‘অখণ্ড ভারত’ বলে কোনো ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র বাস্তবে কখনো অস্তিত্বে ছিল না। পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের Center for the Advanced Studz of India (CASI)-এর গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, অধিকাংশ ইতিহাসবিদই মনে করেন, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার বা শ্রীলঙ্কাকে প্রাচীনকালেও ভারতের অংশ বলা ঐতিহাসিকভাবে ভুল। ভারতীয় উপমহাদেশ সবসময়ই শত শত স্বাধীন রাজ্যে বিভক্ত ছিল। সম্রাট অশোক, মুঘল সম্রাট আকবর বা আওরঙ্গজেব; কেউই পুরো উপমহাদেশ একচ্ছত্রভাবে শাসন করতে পারেননি। বাংলা বরাবরই একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সত্তা ছিল। দিল্লীর সুলতানি আমলেও বাংলার স্বাধীন সুলতানরা দিল্লীর আধিপত্য প্রত্যাখ্যান করে শাসন করেছেন। এই পুরো অঞ্চলকে জোর করে একটি সীমানার নিচে প্রথম এনেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তি-নিজেদের শোষণের সুবিধার্থে।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ রমিলা থাপার তাঁর Early India: From the Origins to AD 1300 (Penguin, 2002) গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, প্রাচীন ভারত কখনো একটি রাজনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ সত্তা ছিল না। বিভিন্ন রাজনৈতিক কেন্দ্র, সংস্কৃতি ও জাতিগত বৈচিত্র্য নিয়ে এই অঞ্চল গঠিত ছিল। ঐতিহাসিক বিপান চন্দ্রও তাঁর India’s Struggle for Independence (Penguin, 1988) গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ব্রিটিশ শাসনের আগে ‘একক ভারত’ ধারণাটি ছিল মূলত একটি ভূগোলভিত্তিক ধারণা, কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়।
৪. বাংলাদেশ কোনো দুর্ঘটনাবশত স্বাধীন হওয়া দেশ নয়। ১৯৭১ সালে ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতার শিকড় অনেক গভীরে। ভাষা আন্দোলন (১৯৫২), ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬), গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯), মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান; এই দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয় গড়ে উঠেছে। সেই পরিচয় ধর্মীয় বা জাতিগত একক পরিচয়ের চেয়ে অনেক গভীর এবং বহুমাত্রিক। ভারত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় সহায়তা করেছিল সত্য, কিন্তু সেই সহায়তা বাংলাদেশকে ‘ভারতের অংশ’ বানানোর জন্য নয়, দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সার্বভৌম সম্পর্কের ভিত্তিতে। জাতিসংঘ সনদ, আন্তর্জাতিক আইন এবং দ্বিপাক্ষিক চুক্তি; সবকিছুই বাংলাদেশের সম্পূর্ণ স্বাধীন সত্তাকে স্বীকৃতি দেয়।
৫. দীনেশ ত্রিবেদী ভারতের একজন প্রাক্তন রাজনীতিবিদ, যিনি পশ্চিমবঙ্গ থেকে লোকসভার সদস্য ছিলেন এবং ২০১২ সালে রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তৃণমূল কংগ্রেস ত্যাগ করে পরবর্তীতে তিনি বিজেপির ঘনিষ্ঠ হয়ে পড়েন। এই রাজনৈতিক পটভূমির আলোকে তাঁর ‘দুই দেশ এক হওয়া’র মন্তব্যকে সহজ কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। Deccan Herald-এ প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বিজেপি ও RSS-এর অস্তিত্বের মূলভিত্তিই হলো ‘অখণ্ড ভারত’ এজেন্ডা, যা মূলত পাকিস্তান ও বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে পুনর্মিলিত করা এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীকে হিন্দু আধিপত্যের অধীনে আনার রাজনৈতিক স্বপ্ন। আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা সতর্ক করেছেন যে, ‘অখণ্ড ভারত’ প্রচারণা দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে, কারণ বাংলাদেশ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় এরই মধ্যে চীন ভারতের প্রভাব সফলভাবে হ্রাস করেছে।
৬. ত্রিবেদীর মন্তব্যের পর বাংলাদেশের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক ও বহুমাত্রিক। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক নেতা, সকলেই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া প্রতিক্রিয়াগুলো দেখায়, বাংলাদেশের মানুষ তাদের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে কোনো আপোষ করতে রাজি নয়। তবে এটিও মনে রাখা দরকার যে, ত্রিবেদী পরে স্পষ্ট করেছেন যে তিনি দুই দেশকে ‘আলাদা’ ভাবছেন না; এই বক্তব্যের অর্থ ‘একত্রিত করা’ নাও হতে পারে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যখন ভারতে BJP-RSS-এর ‘অখণ্ড ভারত’ মতাদর্শ সক্রিয়, তখন এই ধরনের মন্তব্য সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সংবেদনশীলতার অভাব বলেই বিবেচিত হবে। বাংলাদেশ সরকারের উচিত কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই মন্তব্যের ব্যাখ্যা তলব করা। একই সঙ্গে প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের নীতি অনুসরণ করা জরুরি। আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের আলোকে বাংলাদেশের সার্বভৌম মর্যাদার প্রশ্নে কোনো আপস কাম্য নয়।
পরিশেষে; দীনেশ ত্রিবেদীর বেনাপোল মন্তব্য একটি বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে: ভারত কি বাংলাদেশকে একটি সমতুল্য স্বাধীন প্রতিবেশী হিসেবে দেখে, নাকি তার ‘পেছনের উঠোন’ হিসেবে? ইতিহাস বলে, অখ- ভারত কোনো বাস্তব রাষ্ট্রসত্তা ছিল না। আন্তর্জাতিক আইন বলে, সীমানা বদলানো যায় শুধু যুদ্ধ বা জনগণের ইচ্ছায়; কোনো কূটনীতিকের জনসংখ্যা যোগের হিসাবে নয়। Foreign Policy (মে ২০২২)-এর বিশ্লেষণে স্পষ্ট করা হয়েছে, ‘অখ- ভারত’ প্রচারণা ভারতের আঞ্চলিক অবস্থানকে দুর্বল করে; কারণ প্রতিবেশীরা এতে সতর্ক হয়ে যায় এবং বিকল্প অংশীদার খোঁজে। এই পরিস্থিতিতে চীনের মতো শক্তি দক্ষিণ এশিয়ায় তার প্রভাব বাড়াচ্ছে। কাজেই ভারতের উচিত এই আত্মঘাতী মতাদর্শ থেকে বেরিয়ে আসা এবং বাংলাদেশের সঙ্গে প্রকৃত সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়া। বাংলাদেশের ১৭ কোটি মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের ত্যাগের ইতিহাস ভুলতে রাজি নয়। ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের পতন পর্যন্ত যে দীর্ঘ লড়াই; সেই লড়াই কোনো ‘বৃহত্তর ভারতের অংশ’ হওয়ার জন্য নয়, নিজস্ব পরিচয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য। সেই পরিচয়ে আঘাত করার ক্ষমতা কোনো হাইকমিশনারের নেইÑআজও নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না।
লেখক: সাংবাদিক।