॥ খোরশেদ মুকুল ॥
“কবি আল মুজাহিদী অতীত, বর্তমান, আগামী এ তিন জেনারেশনের মধ্যে একটা সম্পত্তি সূত্র হিসাবে এখনো টিকে আছেন এটা কম কথা নয়। স্বভাবের স্থিরতা এবং সংস্কৃতির প্রতি দৃঢ় নিষ্ঠা অঙ্গীকারের বলেই এটা তিনি সম্ভব করতে পেরেছেন। যে কোন রচনা তার ভালো লাগলে উচ্ছসিত প্রশংসা করতে তার বাঁধে না। এটা একটি দুর্লভ গুণ। মানুষকে আপন করে নেয়ার একটা সহজাত ক্ষমতা ছিলো মুজাহিদীর। তার হাত দিয়ে অনেক তরুণ লেখক-লেখিকার আত্মপ্রকাশ ঘটেছে। তরুণদের তিনি প্রাণ দিয়ে ভালবাসেন।” কথাগুলো বলেছেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও গবেষক আহমদ ছফা। কিন্তু দুজনই আজ আমাদের কাছে অতীত। গত ১৯ জুন শুক্রবার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে ঢাকার ইউনাইটেড হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন বাংলা কবিতার প্রবীণ বৃক্ষ একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি আল মুজাহিদী। তিনি রেখে গেছেন ছয় দশকের একটি বিশাল সাহিত্যভা-ার এবং পাঠকদের হৃদয়ে একটি চিরস্থায়ী শূন্যতা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর। দীর্ঘদিনের হৃদরোগ এবং বার্ধক্যজনিত জটিলতার সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত তিনি হার মানলেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
১৯৪৩ সালের ১ জানুয়ারি টাঙ্গাইলের নারুচি গ্রামে আবদুল হালিম জামালী এবং সাখিনা খানের ঘরে জন্ম নেওয়া এই কবির পুরো নাম ছিল হিশাম আল মুজাহিদী। ভিক্টোরিয়া হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা, করটিয়া সাদত কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা এবং অবশেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তরÑ এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় তিনি গড়ে তুলেছিলেন একটি বিশিষ্ট মননশীল ভুবন। এই ভুবনটি পরে বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
ষাটের দশকের কবি হিসেবে পরিচিত আল মুজাহিদী এসেছিলেন এমন এক সময়ে যখন বাংলা কবিতা আধুনিকতার নতুন নতুন রূপ অন্বেষণ করছিল। ছাত্রজীবনেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়া এই তরুণ কবি ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছিলেন সরাসরি অংশগ্রহণের মাধ্যমেÑ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে। একজন কবির কলম যখন একই সঙ্গে একজন মুক্তিযোদ্ধার হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তাঁর সৃষ্টিকর্মে দেশপ্রেম আর মানবতার যে গভীর ছাপ পড়ে, আল মুজাহিদীর কবিতায় তা সুস্পষ্ট। যুদ্ধবিরোধী মানসিকতা, মানবিক যন্ত্রণার প্রতি তীক্ষè সংবেদনশীলতা তাঁর রচনায় বারবার ফিরে এসেছেÑ বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য তাঁর “কাঁদো হিরোশিমা কাঁদো নাগাসাকি” কাব্যগ্রন্থ। এই গ্রন্থে যুদ্ধের ধ্বংসলীলা ও মানবসভ্যতার আর্তনাদ একসঙ্গে মূর্ত হয়ে উঠেছে। আল মুজাহিদী ছিলেন একজন অসাধারণ কবি। তাঁর লেখার বিস্তৃতি ছিল অসাধারণ। তিনি শতাধিক বই লেখেন। যার মধ্যে ছিল কবিতা, উপন্যাস, গল্প, সমালোচনা এবং শিশুদের গল্প। তাঁর কাব্যগ্রন্থের তালিকা দীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যময়। তাঁর কবিতার বইগুলোর নাম হলো- “হেমলকের পেয়ালা”, “ধ্রুপদ ও টেরাকোটা”, “দূর পারাবত”, “যুদ্ধ নাস্তি”, “মৃত্তিকা অতিমৃত্তিকা”, “ঈভের হ্যালমেট”, “সিলুএট”, “প্রিজন ভ্যান”, “দিদেলাস ও ল্যাবিরিন্থ”, “ঈডিপাসের হ্যামলেট”, “প্রাচ্য পৃথিবী”, “পৃথিবীর ধুলো”, “সৌর জোনাকি”, “সহস্র দিবস সহস্র রজনী”, “একা অনন্তে”, “সমুদ্র মেঘলা”, “কালের বন্দিশে”, “পাথর ও প্যাথিরাস”, “ভিতা নুওভা”, “অ্যাকাডেমাসের বাগান”, “আলবাট্রাস”, “ভঙুর গোলাপ”, “পালকি চলে দুলকি তালে”। প্রতিটি বইই তাঁর কাব্যচিন্তার এক একটি জানালা। তাঁর “মৃত্তিকা অতিমৃত্তিকা” বইটির জন্য তিনি “মৃত্তিকার কবি” নামেই পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁর কবিতাগুলো কখনও বিচ্ছিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হয়ে থাকেনি- বাংলার মাটি, ইতিহাস এবং মানুষের সঙ্গে নিরবধি সংলগ্ন গড়ে তুলেছে।
আল মুজাহিদী বাংলা ছাড়াও উর্দু, হিন্দি এবং ইংরেজিতেও স্বচ্ছন্দে কথা বলতেন। এই বহুভাষিক দক্ষতা তাঁর লেখাগুলোতে আন্তর্জাতিক প্রসারিত দৃষ্টিভঙ্গি এনে দিয়েছে। “দিদেলাস ও ল্যাবিরিন্থ” বা “ঈডিপাসের হ্যামলেট” বইগুলোর নামকরণেও এটা প্রতিফলিত হয়। তিনি গ্রিক পুরাণ এবং পশ্চিমা ক্লাসিক সাহিত্যের সঙ্গে বাংলার লোকজীবনের নিজস্ব আঙ্গিককে এক বুনটে গেঁথে দেওয়ার সাহিত্যিক প্রয়াস করেছেন। এটি তাঁকে এক স্বতন্ত্র পরিচয় দিয়েছে, যা তাকে সমকালীন অনেক কবি থেকে আলাদা করে রাখে। দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে দৈনিক ইত্তেফাকের সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন আল মুজাহিদী। এই দায়িত্ব ছিল বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাঙ্গণ নির্মাণের কাজ। তিনি অনেক তরুণ কবি-লেখককে সাহিত্যের জগতে পরিচিতি পেতে সাহায্য করেছেন। তাঁর সম্পাদকীয় দৃষ্টিভঙ্গি ছিল কেবল কারিগরি যাচাই-বাছাইয়ে সীমাবদ্ধ না, বরং হয়ে ওঠে এক নিবিড় সাহিত্যিক পরিচর্যা।
আল মুজাহিদী শুধু একজন কবি ছিলেন না, ছিলেন বাংলাদেশের সাহিত্য-প্রতিষ্ঠানের এক অভিভাবকতুল্য পুরুষ। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের সাংবাদিকতা ও সাহিত্য যখন একসঙ্গে নিজেদের আধুনিক রূপ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করছিল, তখন তাঁর মতো একজন কবি-সম্পাদকের উপস্থিতি দুই অঙ্গনকেই সমৃদ্ধ করেছে। শিশুসাহিত্যের প্রতি তার দরদও প্রকাশ পায় নানা রচনায়। বড়দের জন্য লেখা জটিল কবিতার পাশাপাশি তিনি শিশুদের জন্যও লিখেছেন সহজ, সরল ভাষায়। বিদেশি শিশুসাহিত্য অনুবাদের মাধ্যমে বাংলাভাষী শিশুদের জন্য খুলে দিয়েছেন বিশ্বসাহিত্যের নতুন নতুন দুয়ার।
তাঁর সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি এসেছে নানা মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারের মাধ্যমে। তিনি জীবনানন্দ দাশ একাডেমী পুরস্কার, কবি জসীমউদ্দীন একাডেমী পুরস্কার, মাইকেল মধুসূদন একাডেমী পুরস্কার, শেরে বাংলা সংসদ পুরস্কার, বঙ্গবন্ধু সাহিত্য সংসদ পুরস্কার পেয়েছেন। আর ২০০৩ সালে রাষ্ট্র তাকে ভূষিত করে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদকে। ২০১৮ সালে পেয়েছেন বাসাসপ কাব্যরতœ পদক।
আল মুজাহিদী আর নেই, কিন্তু তাঁর কবিতায় পাঠক খুঁজে পায় নিজেদের যুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশের যন্ত্রণা, মাটির প্রতি মমত্ব, আর মানবতার প্রতি অবিচল বিশ্বাস। তাঁর চলে যাওয়ায় বাংলা সাহিত্য হারাল এমন একজন কবিকে, যিনি একই সঙ্গে যোদ্ধা, সম্পাদক, গবেষক ও স্রষ্টা ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে একটি প্রজন্মের সাহিত্যিক সংযোগসূত্র যেন ছিন্ন হলোÑ যে প্রজন্ম একাত্তরকে দেখেছে নিজের চোখে, এবং সেই অভিজ্ঞতাকে রূপান্তরিত করেছে কবিতার ভাষায়। তিনি থেকে যাবেন বাংলা কবিতার পাঠকের কাছে চিরকালীন এক উপস্থিতি হয়ে। একজন কবির মৃত্যু হয়, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি মাটির গভীরে শিকড় গেড়ে বেঁচে থাকেÑ ঠিক যেমন তিনি নিজেই লিখে গেছেন মৃত্তিকার কথা, মাটির কথা। শোকের এই সময়ে বাংলাদেশের সাহিত্যজগত তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানায় এবং তাঁর পরিবার, সহকর্মী ও অসংখ্য গুণগ্রাহীর প্রতি জানায় সমবেদনা। তিনি স্ত্রী পলিন পারভীন, ছেলে শাবিব আল মুজাহিদী, মেয়ে মারিয়ামা জাবীন আল মুজাহিদী, নাতি-নাতনিসহ অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট।