মো: রাশেদুল হাসান আমিন
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো সময়ের সাথে সাথে একটি ফৌজদারি তদন্তের গণ্ডি পেরিয়ে বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়। বাংলাদেশের তরুণ রাজনৈতিক নেতা শরীফ ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ড ক্রমেই তেমন একটি ঘটনায় রূপ নিচ্ছে।
হাদীর হত্যার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বিচার ও তদন্ত নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়ে গেছে। এরই মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, হত্যাকাণ্ড-সংশ্লিষ্ট কিছু তথ্য তাঁর জানা আছে এবং পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের বিশেষ টাস্কফোর্স (এসটিএফ) সন্দেহভাজনদের গ্রেফতারও করেছিল। আরও বিস্ফোরক ছিল তাঁর সেই দাবি, যেখানে তিনি ইঙ্গিত দেন যে কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে তাঁকে বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল।
মমতার বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই এখনো হয়নি। কিন্তু, তাঁর মন্তব্য এমন এক প্রশ্নকে সামনে এনেছে, যা গত কয়েক বছরে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে ছিল-ভারত কি তার নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষার নামে সীমান্তের বাইরে আরও আক্রমণাত্মক গোয়েন্দা তৎপরতা চালাচ্ছে?
ভারতের বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থা Research and Analysis Wing-সংক্ষেপে ‘RWA’ বা ‘র’ দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থার দায়িত্ব বিদেশে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ পর্যবেক্ষণ এবং ভারতের কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করা।
গোটা বিশ্বেই বৈদেশিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সাধারণত গোপনীয়তার আড়ালে কাজ করে। কিন্তু, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘র’-কে ঘিরে যে আন্তর্জাতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছেÑতা নজিরবিহীন।
একসময় পাকিস্তান বা কাশ্মীর ইস্যুকে কেন্দ্র করে ‘র’ নিয়ে আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় গণমাধ্যমেও সংস্থাটির নাম আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।
কানাডা থেকে শুরু : ২০২৩ সালের জুনে কানাডার ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় খালিস্তানপন্থী নেতা হরদীপ সিং নিজ্জারকে গুলী করে হত্যা করা হয়। নিজ্জারকে ভারত সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। কিন্তু হত্যাকাণ্ডের পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, এর সাথে ভারতীয় সরকারি এজেন্টদের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে “বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ” রয়েছে।
পরবর্তীতে জানা যায়, তদন্তে ‘ফাইভ আইস’ গোয়েন্দা জোটভুক্ত দেশগুলোর তথ্যও ব্যবহৃত হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কানাডা ও ভারতের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তীব্র আকার ধারণ করে। ভারত অভিযোগ অস্বীকার করলেও ঘটনাটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ : নিজ্জার হত্যাকাণ্ডের বিতর্ক থামার আগেই যুক্তরাষ্ট্রে সামনে আসে গুরপতওয়ন্ত সিং পান্নুনকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ।
মার্কিন বিচার বিভাগের অভিযোগপত্রে বলা হয়, খালিস্তানপন্থী এই নেতাকে হত্যার একটি পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং এতে ভারতীয় এক সরকারি কর্মকর্তার নাম উঠে আসে। মামলাটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এটি গুরুত্বপূর্ণ এই কারণে যে, প্রথমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের বিচারিক প্রক্রিয়ায় ভারতীয় রাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে।
পাকিস্তানে রহস্যময় হত্যাকাণ্ড : দ্য গার্ডিয়ান, এপি, রয়টার্স-সহ একাধিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পাকিস্তানে কয়েকজন কাশ্মীরি ও ভারতবিরোধী নেতার হত্যাকাণ্ড নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
এসব প্রতিবেদনে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে যে সীমান্তের বাইরে লক্ষ্যভিত্তিক হত্যার একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে। ভারত সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।
‘মোসাদ মডেল’ বিতর্ক : ‘র’-কে ঘিরে আন্তর্জাতিক আলোচনায় আরেকটি শব্দ বারবার ফিরে আসেÑ “মোসাদ মডেল”। ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের বিরুদ্ধে বহু দশক ধরে বিদেশে লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, ভারত হয়তো ধীরে ধীরে এমন একটি নীতির দিকে এগোচ্ছে, যেখানে দেশের নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের সীমান্তের বাইরেও নজরদারি বা লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
এই তত্ত্বের সমর্থনে সরাসরি প্রমাণ নেই। তবে কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান-সংক্রান্ত অভিযোগগুলো এই বিতর্ককে আরও জোরালো করেছে।
হাদী হত্যাকাণ্ড : প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে কেন?
শরীফ ওসমান হাদী ছিলেন ভারতের আঞ্চলিক নীতির একজন প্রকাশ্য সমালোচক। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি, সীমান্তনীতি ও ভারতীয় প্রভাব নিয়ে তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচিত ছিল।
এই প্রেক্ষাপটে তাঁর হত্যাকাণ্ডকে অনেকে বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনীতির আলোকে দেখতে শুরু করেছেন। সমর্থকদের একটি অংশের প্রশ্ন হলোÑ যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘র’-কে ঘিরে এত গুরুতর অভিযোগ উঠতে পারে, তাহলে হাদী হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রেও কি সেই সম্ভাবনাকে একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায়?
অন্যদিকে সমালোচকেরা মনে করিয়ে দেন, সন্দেহ এবং প্রমাণ এক জিনিস নয়। কোনো অভিযোগের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা থাকতে পারে, কিন্তু সেটি বিচারিক সত্য হয়ে যায় না।
মমতার বক্তব্যের তাৎপর্য : মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যের গুরুত্ব এখানেই যে, তিনি সরাসরি দাবি করেছেন ঘটনাটির কিছু তথ্য তাঁর জানা আছে। যদি তাঁর বক্তব্য সত্য হয়, তাহলে এটি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা নয়; বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা রাজনীতির একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবে। কিন্তু তাঁর বক্তব্য এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই হয়নি। ফলে এটিকে আপাতত রাজনৈতিক দাবি হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
দীর্ঘসূত্রতা কি নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে? হাদী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা জনমনে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সন্দেহভাজনদের অবস্থান, প্রত্যর্পণ-সংক্রান্ত জটিলতা এবং তদন্তের ধীরগতি নানা জল্পনার জন্ম দিয়েছে।
বাস্তবতা হলো, দক্ষিণ এশিয়ায় বহু আলোচিত রাজনৈতিক হত্যা বছরের পর বছর ঝুলে থাকার নজির রয়েছে। তাই দীর্ঘসূত্রতা নিজে কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্ততার প্রমাণ নয়। তবে এটি জনমনে সন্দেহের জায়গা তৈরি করে-এ কথাও অস্বীকার করা যায় না।
অমীমাংসিত প্রশ্নের সামনে : আজ পর্যন্ত প্রকাশ্য কোনো আদালত বা স্বাধীন তদন্ত সংস্থা হাদী হত্যাকাণ্ডে ‘র’-এর সম্পৃক্ততা প্রমাণ করেনি। একই সাথে এটাও সত্য যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ‘র’-কে ঘিরে যে অভিযোগগুলো উঠেছে, সেগুলো এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। ফলে বিষয়টি এখনো একটি খোলা প্রশ্ন হিসেবেই রয়ে গেছে।
হাদী হত্যাকাণ্ড কি কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা? নাকি এর পেছনে আরও বড় কোনো আঞ্চলিক বা আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট রয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো অজানা। তবে একটি বিষয় স্পষ্টÑকানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান ঘিরে ‘র’-সম্পর্কিত বিতর্ক এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য হাদী হত্যাকাণ্ডকে নতুন আলোয় দেখার সুযোগ তৈরি করেছে।
আর যতদিন না পূর্ণাঙ্গ, বিশ্বাসযোগ্য ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাচ্ছে, ততদিন এই হত্যাকাণ্ড দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অমীমাংসিত রহস্য হিসেবেই আলোচিত হতে থাকবে।