মুহাম্মদ রোমান হোসাইন
আমরা এমন এক সময়ে বেঁচে আছি, যেখানে অনেক কিছু করার আগেই হাত ফোনের দিকে চলে যায়। দান করার আগে ছবি। উমরাহতে গিয়ে পোস্ট। সিজদায় থেকেও সেলফি। কুরআন খতমের পর মানুষের সামনে ঘোষণা।
সমস্যা শুধু “দেখানো” না। আসল সমস্যা হলো—আমার অন্তরে তখন কে বড় হয়ে উঠছে? আল্লাহ, নাকি মানুষ?
রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাদের জন্য এক ভয়ংকর ব্যাপারের কথা বলেছেন। তিনি বলেন—
“আমি তোমাদের ব্যাপারে যে জিনিসটিকে সবচেয়ে বেশি ভয় করি, তা হলো ছোট শিরক।”
সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, “ছোট শিরক কী?”
তিনি বললেন, “রিয়া—লোক দেখানো।”—মুসনাদ আহমদ: ২৩৬৩০
এই হাদীসটি খুব ছোট, কিন্তু এর ভেতরে ভয়ংকর এক সতর্কবার্তা আছে। আমরা অনেক সময় বড় গুনাহকে ভয় পাই, হারামকে ভয় পাই, শিরককে ভয় পাই—কিন্তু “ছোট শিরক” যে আমাদের নেক আমলের ভেতর ঢুকে যেতে পারে, সেটা নিয়ে খুব কম মানুষই চিন্তা করি।
রিয়া এমন একটি রোগ, যা অনেক সময় বাইরে থেকে বোঝা যায় না। মানুষ দেখে—সে নামাজ পড়ে, কুরআন পড়ে, দান করে, উমরাহ করে, ইসলামিক পোস্ট দেয়। বাহ্যিকভাবে সবই ভালো। কিন্তু অন্তরে যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির সঙ্গে মানুষের প্রশংসার চাহিদা মিশে যায়, তাহলে সেই আমলের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
আল্লাহ তাআলা বলেন— “তাদেরকে তো কেবল এ নির্দেশই দেওয়া হয়েছিল যে, তারা একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর ইবাদত করবে…” —সূরা আল-বাইয়্যিনাহ: ৫
ইবাদতের মূল সৌন্দর্য বাহ্যিকতায় নয়, ইখলাসে। আমল বড় না ছোট—এটাই আসল প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হলো, কার জন্য?
একটি দান হয়তো টাকার অঙ্কে ছোট, কিন্তু যদি সেটা একান্ত আল্লাহর জন্য হয়, তবে তা আল্লাহর কাছে অনেক মূল্যবান। আবার একটি বড় আমল মানুষের চোখে অসাধারণ হলেও, যদি তা লোক দেখানোর জন্য হয়, তাহলে তার ভেতর শূন্যতা থেকে যায়।
এক হাদীসে আল্লাহ তাআলা বলেন— “আমি শরিকদের অংশীদারিত্ব থেকে সর্বাধিক অমুখাপেক্ষী। যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করে, যাতে সে আমার সঙ্গে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি তাকে ও তার শিরককে ছেড়ে দিই।”
—সহিহ মুসলিম
কী ভয়ংকর কথা! অর্থাৎ আমলটা হয়তো আমি করছি, কষ্টও করছি, সময়ও দিচ্ছি—কিন্তু যদি এর মধ্যে মানুষের জন্য অংশ রেখে দিই, তাহলে আল্লাহ সেটি প্রত্যাখ্যানও করতে পারেন।
তবে এখানে একটি ভারসাম্য খুব জরুরি। সব প্রকাশই রিয়া নয়।
কখনো কোনো ভালো কাজ প্রকাশ করা হয় মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য, শিক্ষার জন্য, দাওয়াহর জন্য, অথবা বাস্তব উপকারের জন্য। সাহাবিদের আমল থেকেও আমরা তা দেখি। কিন্তু পার্থক্যটা অন্তরে।
নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করুন....
কেউ না দেখলে কি আমি এই আমলটা করতাম? পোস্ট দিতে না পারলে কি আমার আগ্রহ কমে যায়? মানুষ প্রশংসা করলে কি আমলটা বেশি “সার্থক” মনে হয়? লাইক, কমেন্ট, বাহবা না পেলে কি মন খারাপ হয়? আমি কি আল্লাহর কবুলিয়াতের চেয়ে মানুষের প্রতিক্রিয়া বেশি দেখি?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই অনেক সময় আমাদের অন্তরের অবস্থা বলে দেয়।
আজকাল রিয়া শুধু মসজিদের ভেতরে হয় না—social media-ও এর বড় দরজা হয়ে গেছে।
আগে হয়তো মানুষ সামনে দাঁড়িয়ে দেখত। এখন পর্দার ওপাশে শত মানুষ, হাজার মানুষ, লাখ মানুষ দেখতে পারে। তাই নিজেকে সামলানো আরও কঠিন।
এ জন্য কিছু আমল গোপন রাখা খুব জরুরি। সব দান সবার জানার দরকার নেই। সব তাহাজ্জুদ পোস্ট করার দরকার নেই। সব কান্না ক্যামেরাবন্দি করার দরকার নেই। সব খতম ঘোষণা করার দরকার নেই।
আপনার আর আল্লাহর মাঝে কিছু আমল থাকুক—যেটা শুধু আপনিই জানেন, আর আপনার রব জানেন।
আমরা অনেক সময় মনে করি, মানুষ জানলে অনুপ্রেরণা পাবে। হতে পারে। কিন্তু আগে নিজেকে যাচাই করুন—আমি কি সত্যিই মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে চাই, নাকি আমি নিজে প্রশংসিত হতে চাই? এই দুইয়ের পার্থক্য সূক্ষ্ম, কিন্তু আখিরাতে তার ফল ভয়ংকরভাবে আলাদা হবে।
রিয়া থেকে বাঁচার কিছু বাস্তব পথ আছে:
প্রথমত, আমল শুরু করার আগে নিয়ত ঠিক করুন।
দ্বিতীয়ত, আমলের মাঝখানে অন্তর বদলাচ্ছে কি না খেয়াল করুন।
তৃতীয়ত, আমল শেষে আল্লাহর কাছে ইখলাসের দু‘আ করুন।
চতুর্থত, নিয়মিত কিছু নেক আমল একেবারে গোপনে করুন।
পঞ্চমত, মানুষের প্রশংসা শুনলে ভয় পান—কারণ তা অন্তরকে নষ্ট করে দিতে পারে।
মনে রাখুন, আখিরাতে আমাদের পোস্ট দেখা হবে না—আমলের নিয়ত দেখা হবে।
মানুষ বলেছে, “মাশাআল্লাহ” — এটা শেষ কথা নয়।
আল্লাহ বলেছেন কি, “কবুল করলাম” — আসল প্রশ্ন এটা।
তাই নেক আমলকে মানুষের চোখে সুন্দর বানানোর চেয়ে, আল্লাহর দরবারে কবুলযোগ্য বানানোর চেষ্টা করুন।
হয়তো অল্প একটি গোপন দান, নিভৃতে পড়া দুই রাকাত নামাজ, কারও না জানা একটি কান্না, বা নিরবে করা একটি তাওবা—এসবই আখিরাতে আপনাকে বাঁচিয়ে দেবে। মনে রাখতে হবে:
১. সব নেক কাজ প্রকাশ করা প্রয়োজন হয় না; কিছু আমল শুধু আপনার আর আল্লাহর মাঝেই থাকুক।
২. আমলের পর মানুষ কী বলল—তার চেয়ে বড় প্রশ্ন, আল্লাহ কবুল করলেন কি?
৩. social media-র যুগে রিয়া আরও সূক্ষ্ম হয়ে গেছে—তাই আত্মপরীক্ষা আরও জরুরি।
৪. যে আমল আল্লাহর জন্য, সেটা মানুষের প্রশংসার জন্য নষ্ট করবেন না।
৫. ইখলাসবিহীন বড় আমলের চেয়ে, ইখলাসভরা ছোট আমল অনেক মূল্যবান।