কামাল উদ্দিন সুমন : পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম কমানোর জন্য বিইআরসির কাছে আবেদন করছে দেশের তৃণমূলে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা আরইবি। আরইবি জানিয়েছে, নি¤œ আয়ের মানুষের জন্য পল্লী বিদ্যুতের দাম না বাড়নোর ফলে তাদের বিপুল পরিমাণে রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিও একই কথা বলছে। ফলে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোর জন্য খুচরা পর্যায়ের পর এবার পাইকারি পর্যায়েও বিদ্যুতের দাম কমাতে যাচ্ছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ সপ্তাহে কিংবা আগামী সপ্তাহের শুরুর দিকে বিইআরসি এ সংক্রান্ত আদেশ দিতে পারে। তবে পাইকারি বিদ্যুতের দাম কতটা কমানো হবে, তা এখনো নির্ধারণ করতে পারেনি কমিশন।

পাইকারি বিদ্যুতের দাম কমানোর বিষয়টি নিশ্চিত করে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। কতটা কমানো হবে, তা এখনো ঠিক হয়নি।

তিনি আরও বলেন, এরই মধ্যে আরইবি তাদের কাছে চিঠি দিয়ে রাজস্ব ঘাটতির কথা জানিয়েছে। অন্যান্য বিতরণ কোম্পানিও একই কথা বলছে। সংগত কারণেই পাইকারি বিদ্যুতের দাম কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ৩ জুন বিইআরসি পাইকারি এবং গ্রাহক পর্যায়ে খুচরা বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির আদেশ দেয়। এর ঠিক এক দিন পর বিইআরসি দাম বৃদ্ধির বিষয়টি সংশোধন করে শূন্য থেকে ৫০ এবং শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট এই দুই ধাপে আগের দাম বহাল রাখে। এতে বিদ্যুতের খুচরা মূল্য গড়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে ২৩ পয়সা কমে ১০ টাকা ৪০ পয়সায় দাঁড়ায়। দাম কমার ফলে বিতরণ কোম্পানিগুলোর রাজস্ব আদায় ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা কমবে। এর মধ্যে এককভাবে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) রাজস্ব কমবে ১ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা।

বিইআরসি সূত্র জানায়, আরইবি এরই মধ্যে বিইআরসিকে চিঠি দিয়ে তাদের রাজস্ব আদায় কমে যাওয়ার বিষয়টি জানিয়েছে। অন্য বিতরণ কোম্পানিগুলোও তাদের আর্থিক ক্ষতির কথা তুলে ধরেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিতরণ কোম্পানিগুলোর জন্য নির্ধারিত গড় পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৮ টাকা ৩৯ পয়সা থেকে খানিকটা দাম কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সূত্র বলছে, বৃহস্পতিবার নতুন আদেশ আসতে পারে। তবে বিষয়টি অনেকটাই সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। এর আগে বিদ্যুতের পাইকারি দাম বৃদ্ধির সময় জানানো হয়েছিল, সরকারকে আগামী অর্থবছরে বিদ্যুৎ খাতে ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। সেই হিসাব ধরেই সরকার বাজেট প্রণয়ন করেছে। এখন নতুন করে ২ হাজার ৩০০ কোটি টাকা সমন্বয় করা হলে ভর্তুকি বেড়ে ৪৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় দাঁড়াবে। অন্যদিকে সরকারকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি ৪০ হাজার কোটি টাকার নিচে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। ভর্তুকির পরিমাণ বেড়ে গেলে আইএমএফের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধাপ্রাপ্তিতে জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে আগামী ৩০ জুন পর্যন্ত বাজেট পাস হওয়ার আগে বাজেটে কিছু সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, সব বিতরণ কোম্পানিতে ০-৫০ ইউনিট পর্যন্ত মোট সংযোগ রয়েছে ১ কোটি ৮৬ লাখ ১৯ হাজার ২৭৬টি এবং ০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত সংযোগ রয়েছে ৯২ লাখ ৮৩ হাজার ৮৯৫টি।

এর মধ্যে পিডিবির ০-৫০ ইউনিট পর্যন্ত ৮ লাখ ৫৮ হাজার ১৮৩টি এবং ০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ৪ লাখ ৮০ হাজার ৩০১টি সংযোগ রয়েছে। আরইবির ০-৫০ ইউনিট পর্যন্ত ১ কোটি ৬১ লাখ ৪৭ হাজার ৫৯১টি এবং ০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ৭৭ লাখ ৬৭ হাজার ২৮৭টি সংযোগ রয়েছে। ডিপিডিসির ০-৫০ ইউনিট পর্যন্ত ২ লাখ ৩৪ হাজার ৩২৬টি এবং ০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ৬২ হাজারটি সংযোগ রয়েছে। ডেসকোতে ০-৫০ ইউনিট পর্যন্ত ৮৮ হাজার ২৭৫টি এবং ০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ৪৮ হাজার ৫৫৯টি সংযোগ রয়েছে। ওয়েস্ট জোনে ০-৫০ ইউনিট পর্যন্ত ৫ লাখ ৬৫ হাজার ৩৯৩টি এবং ০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ৪ লাখ ৫ হাজার ৪৬২টি সংযোগ রয়েছে। নেসকোর ০-৫০ ইউনিট পর্যন্ত ৭ লাখ ২৫ হাজার ৫০৮টি এবং ০-৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ৫ লাখ ২০ হাজার ২৮৬টি সংযোগ রয়েছে।

বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতার কারণে বিএনপি সরকার ক্ষমতা গ্রহণের আড়াই মাসের মাথায় জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি মাসের ৩ তারিখ মাত্র এক মাসের ব্যবধানে বাড়ানো হয় পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম। বিইআরসি ঘোষিত নতুন ওই দাম অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯.৮৫ শতাংশ বাড়ানো হয়। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে দাম বাড়ানো হয় গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ। এ ছাড়া সঞ্চালন চার্জ ২৩.৯৬ শতাংশ বাড়ানো হয়। এর মধ্যে গ্রাহক পর্যায়ে সর্বনি¤œ লাইফলাইন গ্রাহকের ১৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৯.৯৪ শতাংশ দাম বাড়ানো হয়। শুধু তাই নয় সেচ, রাস্তার বাতি, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও ব্যাটারি চার্জিংয়ে নি¤œচাপে সেচে ৫.২৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬.০৪ টাকা এবং ব্যাটারি চার্জিংয়ে পিকে ১২.১৪ টাকা বাড়িয়ে ১৪.২০ টাকা অফ-পিকে ৮.৬৬ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০.২২ টাকা করা হয়। বাড়তি দামের কবল থেকে বাদ যায়নি শিক্ষা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালগুলোও। এসব খাতে ৭.৫৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৯.০৫ টাকা করা হয়। কিন্তু এর এক দিন পর বিদ্যুৎ বিভাগের অনুরোধে লাইফলাইন গ্রাহকদের পূর্বের দাম বহাল রাখা হয়। এবার পাইকারি পর্যায়েও এমন সিদ্ধান্ত দিতে যাচ্ছে বিইআরসি।