সিডিএ’তে এখনো ভাঙেনি আওয়ামী সিন্ডিকেট

নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) দীর্ঘ আওয়ামী লীগ শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) নতুন কোনো আবাসন প্রকল্প হাতে নেয়নি। বরং আগের প্রকল্পগুলোর সংরক্ষিত স্থান ও জলাশয় দখল করে নিয়মবহির্ভূতভাবে প্লট তৈরি করে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের মন্ত্রী-এমপি, শীর্ষ নেতা ও দলীয় কোটায় নিয়োগপ্রাপ্ত পেশাজীবীদের মধ্যে। গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের এক বছর পার হলেও এসব অবৈধ প্লট বাতিল হয়নি। সংশ্লিষ্টদের মতে, সিডিএর গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে এখনো আওয়ামী আমলের প্রভাবশালী কর্মকর্তারা বহাল থাকায় প্রতিষ্ঠানটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে।

সূত্র জানায়, গত ১৬ বছরে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম শহরে প্রায় ২৯ হাজার ৭০০টি ভবন গড়ে উঠেছে যার ৯৯ শতাংশের ক্ষেত্রেই সিডিএর নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা করা হয়নি। এসব ভবনের বড় অংশের মালিক আওয়ামী নেতাকর্মী ও তাদের সহযোগীরা। নতুন প্রকল্প না থাকলেও তিন দফায় আগের প্রকল্প থেকে অনিয়মের মাধ্যমে ১৫৫টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

প্লট পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন পলাতক সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী, আফছারুল আমীন, সামশুল হক চৌধুরী, এমএ লতিফ, নুরুল ইসলাম বিএসসি, সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ, এবিএম আবুল কাশেম, দিলীপ বড়ুয়া, মাইন উদ্দিন খান বাদল, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, চেমন আরা তৈয়ব, বীরবাহাদুর উশৈসিং ও দীপংকর তালুকদার। প্লট বাগিয়ে নেওয়া আওয়ামী নেতাদের মধ্যে রয়েছেন চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী এবং এ এইচ এম বাহাউদ্দিন খালেক শাহজী। দলীয় কোটায় নিয়োগ পাওয়া সিডিএর সাবেক বোর্ড সদস্যদের মধ্যে যারা প্লট পেয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম কয়েকজন হলেন- নগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কে বি এম শাহজাহান, জসীম উদ্দীন শাহ, আ ম ম টিপু সুলতান চৌধুরী, আওয়ামী লীগের সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান মুরাদের স্ত্রী জাহেদা বেগম, জসিম উদ্দিন ও সোহেল মোহাম্মদ শাকুর। এদের সবাইকে ২০১৩ সালের ৪০৫তম বোর্ড সভায় সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের অনন্যা ও কল্পলোক আবাসিক প্রকল্প থেকে ৪-৫ কাটার প্লট বরাদ্দ দেওয়া হয়- যেখানে বাস্তবে কোনো খালি প্লট ছিল না। এজন্য পার্ক, খেলার মাঠ, জলাশয় ও কবরস্থানের স্থান সংকুচিত করে নকশা পরিবর্তন করা হয়।

প্লট বরাদ্দের আগে চারটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার নিয়ম থাকলেও সেটি মানা হয়নি। আবার বাজারদরের চেয়ে তিন থেকে ছয়গুণ কম মূল্যে এসব প্লট দলীয় বিবেচনায় বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নিয়মবহির্ভূতভাবে সিডিএর অনুমোদন ছাড়াই নগরীর চেরাগী পাহাড় মোড়ে ২২তলা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে , যদিও প্রতিষ্ঠানটি মাত্র ১৮ তলা পর্যন্ত নির্মাণের আবেদন করেছিল এবং তা সিডিএ খারিজও করেছিল। একইভাবে নগরীর দেওয়ানজী পুকুরপাড়ে হাছান মাহমুদের ২২তলা ভবন নির্মাণাধীন। সিডিএ বলছে, বিধিমালা অনুযায়ী বাণিজ্যিক ভবন সর্বোচ্চ ১৬তলা এবং আবাসিক ভবন ১২তলা পর্যন্ত নির্মাণযোগ্য, তবে তিনি এই সীমা অমান্য করেছেন।

জিইসি মোড়ের পাশে ও আর নিজাম রোডের আবাসিক এলাকায় আবাসিক ভবনকে বাণিজ্যিক হোটেলে রূপান্তর করেছেন সিডিএর সাবেক চেয়ারম্যান। গোলপাহাড় মোড়ে মন্দির সংলগ্ন বিশাল ভবন নির্মাণ করেছেন পলাতক ওয়ার্ড কাউন্সিলরের দখল করা জমিতে কোনো অনুমতিপত্র ছাড়াই। সিডিএর প্রধান প্রকৌশলী জানান, পুরো নগরী নিয়ে একটি অডিট চলছে যেখানে এক শতাংশ ভবনও শতভাগ নিয়ম মেনে হয়নি। রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এতদিন মনিটরিং ব্যাহত হয়েছে বলে তিনি স্বীকার করেছেন।

সিডিএর দুর্নীতিবাজ ১৭ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে (দুদক)-এ মামলা থাকলেও কেউই এখনো বিচারের মুখোমুখি হননি। এদের মধ্যে আছেন কাজী হাসান বিন শামস, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এম এম হাবিবুর রহমান, সহকারী প্রকৌশলী সরোয়ার আলম, সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম, সহকারী অথরাইজ অফিসার আব্দুল হামিদ, অথরাইজ অফিসার তানজিব হোসেন, ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মাহফুজুর রহমান (ফ্লাইওভার প্রকল্পের পিডি), জলাবদ্ধতা প্রকল্পের পরিচালক আহম্মদ মঈনুদ্দিন, নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল আলম (অবসরপ্রাপ্ত), খালেদ শাহাবুদ্দিন (বিদেশে পলাতক), সহকারী অথরাইজ অফিসার ফারুখ আহমেদ, নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মোহাম্মদ হাসান, নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইলিয়াস (নির্মাণ বিভাগ-৩), স্টিমিটর রুপম কুমার চৌধুরী, সহকারী প্রকৌশলী আসাদ বিন আনোয়ার, নির্বাহী প্রকৌশলী আ ফ ম মেজবাহ উদ্দিন। এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে ফ্লাইওভার প্রকল্পের পিডি মাহফুজুর রহমানের বিরুদ্ধে।

গত ৩০ নবেম্বর সিডিএ পরিদর্শনে এসে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান ও মরুহুম উপদেষ্টা হাসান আরিফ। সিডিএর ডকুমেন্টারিতে শেখ হাসিনা সরকারের বন্দনা দেখে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন আদিলুর রহমান খান। তিনি বলেন, “সিডিএতে এখনো ফ্যাসিবাদের ক্ষত রয়ে গেছে।” তবে তার নির্দেশনা বাস্তবায়িত হয়নি, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে চট্টগ্রামের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কুখ্যাতি পাওয়া সিডিএ জুলাই অভ্যুত্থানের পরও এখনো সেই ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি- নগরবাসীর ক্ষোভ এখন সেখানেই।