ইবরাহীম খলিল ও কবির আহমদ সিলেট থেকে : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছন, আমরা এরই মধ্যে যেসব কমিটমেন্ট দেশের মানুষের সামনে উপস্থাপন করেছিলাম, সেই কমিটমেন্টগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছি। তিনি বলেন, ‘দেখুন আড়াই মাস বয়সে একটি শিশু কিন্তু হাঁটতে পারে না। শিশুটাকে হাঁটতে হলে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হয়। বর্তমান সরকারের বয়স আড়াই মাসের মতো। এ সময় প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন। উপস্থাপন করেন দেশের উন্নয়ন নিয়ে তার চিন্তাগুলো।

গতকাল শনিবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে সিলেট সিটি করপোরেশন প্রাঙ্গণে আয়োজিত সুধী সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন । সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দেশে ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। এই ১ লাখের মধ্যে ৮০ শতাংশ থাকবে নারী স্বাস্থ্যকর্মী। এই মানুষগুলোর দায়িত্ব হবে গ্রামে গ্রামে, ঘরে ঘরে যাওয়া। শহরেও তারা থাকবে। তবে আমরা জোর দেব, গ্রামের মানুষের ওপরে বেশি। তারা বিশেষ করে পরিবারের নারীদের কাছে গিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা চালাবে।’

তারেক রহমান বলেন, তারা (নতুন নিয়োগকৃত স্বাস্থ্যকর্মী) বিশেষ করে পরিবারের নারী যারা আছেন, যারা সংসার দেখাশোনা করেন, তাদের সচেতন করবে যে কোন খাবারটি খেলে ডায়াবেটিস হবে না, কোন খাবারটি খেলে কার্ডিও হবে না, বা লাইফস্টাইল কী হলে তার হার্টের সমস্যা হবে না, কোন খাবারটি খেলে কিডনির রোগ হবে বা এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন করবে। হাইজিন সম্পর্কে তাদের সংশোধন করবে।

এরপর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাচ্ছি ধীরে ধীরে সামগ্রিকভাবে পুরা দেশে অসুস্থ যত বেশি সংখ্যক মানুষকে সুস্থ রাখা। তার ফলে স্বাভাবিকভাবে যারা হাসপাতালে আসবে, পরবর্তী সময়ে অসুস্থ হয়ে তাদের যাতে বেটার চিকিৎসা দেওয়া যায়। অসুস্থ মানুষের সংখ্যা যখন কম হবে, আমাদের জন্য সুবিধা হবে টেককেয়ার করতে। আমরা যদি মানুষকে সচেতন করতে পারি, সচেতনতার মাধ্যমে আমরা যদি অসুস্থ মানুষের সংখ্যা কমিয়ে আনতে পারি, তাহলে যারা অসুস্থ হবেন তারা বেটার সার্ভিস পাবেন।’

সুনামগঞ্জসহ হাওরাঞ্চলে পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টি বক্তব্যে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ ছাড়া সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতা সমস্যার বিষয়টি উত্থাপন করে তা সমাধানে সরকার কাজ করছে বলেও তিনি জানান।

সিলেট নগরের সুপেয় পানির চাহিদা পূরণের আশ্বাস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার লেভেল যো আছে, সেটা ধীরে ধীরে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই সকল কিছু বিষয় মাথার মধ্যে রেখে বিবেচনা করে আমরা খাল খনন কর্মসূচি সারা দেশে দিয়েছি। আন্ডারগ্রাউন্ড ওয়াটার লেভেল যো আছে, সেটা শুধু সিলেট সিটি করপোরেশন নয়, এই সমস্যা ঢাকাতে আছে, এই সমস্যা অন্য অনেক শহরগুলোতে আছে। আমাদের জন্য যেটি একটি বড় সমস্যা হচ্ছে। যেভাবে আমরা মাটির নিচে যে পানি আছে, এটিকে যে টেনে তুলছি, এ ছাড়া কৃষিকার্যের জন্য একই কাজ আমরা করছি, এটি ধীরে ধীরে একটি ভয়াবহ অবস্থার দিকে নিয়ে যাচ্ছে।’

পানিবদ্ধতা দূরসহ নানা কারণে খাল খননের প্রাসঙ্গিকতা আছে উল্লেখ করে বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘পানিটাকে যাতে আমরা ব্যবহার করতে পারি, পানিবদ্ধতাও যাতে না হয়, মানুষেরও কষ্ট না হয়, সেটি কৃষির সুবিধার জন্য হোক, পানি থেকে মানুষের ব্যবহার সুবিধার জন্যই হোক, আমরা খালগুলো খনন করতে চাচ্ছি দেশে, যাতে অতিরিক্ত যে পানি থাকবে, সে পানিটাকে যাতে আমরা ধরে রাখতে পারি এবং প্রয়োজনের সময় আমরা সেটিকে মানুষের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে পারি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যে সমস্যাটি শুধু সিলেটে নয়, যে সমস্যাটি আমাদের প্রায় সবগুলো শহরে আছে, সামগ্রিকভাবে হয়তো সমগ্র দেশেই আছে। সুরমা নদীতে বিভিন্ন পলিথিন থেকে আরম্ভ করে, প্লাস্টিক থেকে আরম্ভ করে, পড়তে পড়তে স্তরটা বেশ পুরো হয়ে গিয়েছে।’ লন্ডনের কিছু বিশেষজ্ঞদের মতামতের সূত্র ধরে ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতেও প্রায় দুই মিটার ময়লার স্তর জমেছে বলেও তিনি বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিমানে সিলেটে আসা এবং সড়ক পথে ঢাকা যাওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সিলেট থেকে লন্ডন যেতে খুব সম্ভব সাড়ে ৯ ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু বাই রোডে সিলেট থেকে ঢাকা যাওয়ার অবস্থা এতই খারাপ, প্রায় ১০ ঘণ্টা সময় লেগে যায়। আমরা সরকার গঠন করার পর এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি তখন জানতে পারলাম, জায়গা অধিগ্রহণের সমস্যা রয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিয়ে আমি আশা করছি, ইনশা আল্লাহ দ্রুত সময়ে আমরা এই কাজটি শুরু করতে পারব। কাজটি শুরু করলে ইনশা আল্লাহ শেষ তো একসময় হবে এবং আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আমরা এটা ইনশা আল্লাহ শেষ করতে পারব। তার ফলে যাতায়াতের এত কষ্ট মানুষকে ভোগ করতে হবে না।’

তারেক রহমান আরও বলেন, ‘শুধু রাস্তা আমাদের বাড়ালেই যে সমস্যার সমাধান হবে তা না। একই সাথে আমরা যদি রেলওয়ে ব্যবস্থাকেও ডেভেলপ করতে চাই। সারা দেশে কীভাবে রেল যোগাযোগটাকে বৃদ্ধি করা যায়, রেল যোগাযোগটাকে বৃদ্ধি করলে স্বাভাবিকভাবে অধিকাংশ মানুষ এটিতে যাতায়াত করবেন, এটিতে খরচ কম হবে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এত বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর খাবার তো আমরা বিদেশ থেকে ইমপোর্ট করা সম্ভব না। আমরা আলহামদুলিল্লাহ মোটামুটিভাবে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কাজেই এটিকে আমাদের ধরে রাখতে হবে, সে জন্য অবশ্যই রাস্তার উন্নয়ন দরকার। তারেক রহমান বলেন, ‘সিলেট মেডিকেল কলেজের অধীনে ২৫০ শয্যার একটি হাসপাতাল আছে। এই হাসপাতালটি আমরা চেষ্টা করছি, দ্রুত যাতে চালু হতে পারে। একই সাথে আমরা এরপর এটাকে চেষ্টা করব এক্সপ্যান্ড করে ১২০০ শয্যার একটি হাসপাতালে নিতে।’

বন্ধ কলকারখানা চালুর কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি এই কলকারখানাগুলোকে যত দ্রুত সম্ভব চালু করব। যদি দরকার হয় আমরা প্রাইভেটাইজ করব সেগুলোকে। যারা এগুলো চালাতে আগ্রহী, তাদের কাছে আমরা হ্যান্ডঅভার করব। এই কাজটি শুরু করতে পারলে একদিকে সারা দেশে বহু কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে।

তারেক রহমান বলেন, ‘সিলেটে একটি আইটি পার্ক করা হয়েছিল। পার্কটি সেভাবে সচল নেই। এই আইটি পার্কটি নিয়ে অলরেডি আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমাদের যে মন্ত্রণালয় আছে, তারা কাজ করছে। ইনশা আল্লাহ, দ্রুত সময়ে আমরা এটা চালু করতে সক্ষম হব। আমাদের তরুণ সমাজের অনেক সদস্য আছে, যারা ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ করেন, আইটির বিভিন্ন কাজ করেন, ডাটা প্রসেসিংয়ের কাজ করেন, তাদের আমরা ওখানে সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার চেষ্টা করব।’

সুধী সমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির ও জাতীয় সংসদের হুইপ জি কে গউছ। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সিলেট সিটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার। অনুষ্ঠান সঞ্চালন করেন সিটি করপোরেশনের প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা সুনন্দা রায়। অনুষ্ঠানে দর্শক সারিতে প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানসহ সিলেটের বিভিন্ন আসনের সংসদ সদস্য, শিক্ষাবিদ, রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজসহ নানা শ্রেণি-পেশার কয়েক শ প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সকালে ঢাকা থেকে উড়োজাহাজে করে সিলেটে আসেন প্রধানমন্ত্রী। পরে সাড়ে ১০টার দিকে তিনি নগরের দরগাগেট এলাকায় হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত করেন। পরে ১০টা ৫৫ মিনিটে সিলেট সার্কিট হাউস-সংলগ্ন সুরমা নদীর পাড়ের চাঁদনিঘাট এলাকায় সুরমা নদীর উভয় পাড়ে সৌন্দর্যবর্ধনসহ বন্যাপ্রতিরোধী অবকাঠামো নির্মাণ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন কাজের উদ্বোধন করেন।

পরে সিলেট সদর উপজেলার কান্দিগাঁও ইউনিয়নে বাসিয়া খালের উদ্দেশে রওনা দেন প্রধানমন্ত্রী। সেখানে দুপুর ১২টায় বাসিয়া খাল পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তিনি। সেখান থেকে ফিরে সিলেট জেলা স্টেডিয়ামে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শিশু ও কিশোরদের ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণে ‘নতুন কতড়ি স্পোর্টস’ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন তিনি। বিকেল পাঁচটায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে দলীয় সভায় যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী।

নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬ -এর উদ্বোধন

এদিকে শিশু-কিশোরদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দেশকে একদিন তোমরাই নেতৃত্ব দিবে। মন্ত্রী এমপি সংসদ সদস্য হবে তোমরাই। তবে তার আগে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও অংশগ্রহণ করতে হবে। তোমাদের সবাইকেই বাংলাদেশের অ্যাম্বাসেডর হতে হবে।

যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের এই দেশটা একসময় পরাধীন ছিল। যুদ্ধ করে স্বাধীন করেছেন আমাদের পূর্বপুরুষরা। তারপর আরও অনেক ঘটনা প্রবাহের পর ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতা আন্দোলন করে আবার স্বাধীন করে।

এসময় উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী ডা. জুবাইদা রহমান, বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদীর. প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, পানিসম্পদমন্ত্রী শহিদ উদ্দিন চৌধুরী অ্যানি, সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য এমএ মালিক, সিলেট-৬ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী, মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য শাম্মি আখতারসহ সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এবং প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ। সব শেষ জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে দলীয় কর্মসূচীতে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।