হাটহাজারী (চট্টগ্রাম) সংবাদদাতা : চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় এসএসসি বা এইচএসসি পাস করা বহু তরুণের জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার ছায়া। পড়াশোনা শেষ করেও তারা পাচ্ছে না চাকরি, নেই পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের সুযোগ কিংবা উৎপাদনশীল কোনো পেশায় যুক্ত হওয়ার পথ। উপরন্তু, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশগমন—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজার—ছিল তাদের একমাত্র ভরসা। সেই বাজার প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকারত্ব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা যায়, শত শত তরুণ আজ কর্মহীন। কেউ সময় কাটাচ্ছে মোবাইল গেমে, কেউ চায়ের দোকানে আড্ডায়। গ্রামে কর্মক্ষেত্র না থাকায় তারা পরিবারেও বাড়তি বোঝা হয়ে উঠছে। এতে বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ, তরুণদের মধ্যে তৈরি হচ্ছে হতাশা, উদ্বেগ ও লক্ষ্যহীনতা।

মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো—বিশেষ করে সৌদি আরব, ওমান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে দীর্ঘদিন ধরে হাটহাজারীর হাজারো যুবক কাজ করতেন। প্রবাসী আয়ে সমৃদ্ধ ছিল গ্রামের ঘরবাড়ি। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভিসা সংক্রান্ত বিধিনিষেধ, এজেন্টদের প্রতারণা ও নানা রাজনৈতিক কারণে সেই পথ এখন প্রায় রুদ্ধ। নতুন করে বিদেশ যেতে পারছেন না অনেকে, যারা প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তারাও থমকে গেছেন।

এদিকে, বেকারত্বের প্রভাবে কিশোর অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় শিক্ষক ও অভিভাবকরা। তারা বলছেন, লক্ষ্যহীন তরুণরা সামাজিক অবক্ষয়ের পথে পা বাড়াচ্ছে। উদ্দেশ্যহীন ঘোরাফেরা, মোটরসাইকেলে দল বেঁধে চলাফেরা, নেশাজাতীয় দ্রব্যের প্রতি আকর্ষণ—সব মিলিয়ে অপরাধের ঝুঁকি বাড়ছে।

হাটহাজারী থানা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, সম্প্রতি কিশোরদের মধ্যে সংঘবদ্ধ গ্রুপ গড়ে ওঠার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিছু এলাকায় কিশোর গ্যাং সম্পর্কিত অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে।

উপজেলায় কর্মমুখী কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সীমিত হওয়ায় দক্ষতা অর্জনের সুযোগও কম। পুঁজি ও প্রশিক্ষণের অভাবে অনেকে উদ্যোগ নিতে পারছেন না। কিছু উদ্যোক্তা ব্যাংক ঋণের জটিলতায় পিছিয়ে যাচ্ছেন।

হাটহাজারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শাহ-ই-জাহান জানান, “২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত হাটহাজারীতে এক হাজার ছয়শ জন বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। স্থানীয় চাহিদার ভিত্তিতে হাঁস-মুরগি পালন, গবাদি পশু পালন, মাছ চাষ, পোশাক তৈরি, ব্লক-বাটিক, মাশরুম চাষ, মোবাইল ফোন মেরামতসহ প্রায় ৪০টি ট্রেডে এক সপ্তাহ মেয়াদি প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। জেলা কার্যালয়ে পাঠানো হলে ১ মাস থেকে ৬ মাস মেয়াদি উন্নত প্রশিক্ষণও পাওয়া যায়। এছাড়া উপজেলা পরিষদের সহায়তায় ড্রাইভিং, সেলাই, ব্লক, বাটিক, স্ক্রিন প্রিন্টিং বিষয়ে ইতিমধ্যে ১০০ জনকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।”

তিনি আরও জানান, “টেকনিক্যাল বিষয়ে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মসংস্থানের হার বেশি হলেও নন-টেকনিক্যাল বিষয়ে তা ৩০% এর বেশি নয়। বর্তমানে ঊধৎহ প্রকল্প নামে একটি বিশ্বব্যাংক সহায়তাপ্রাপ্ত প্রকল্প হাটহাজারীতে চালু হতে যাচ্ছে, যা কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে।”

কাটিরহাট মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যাপক শেখ আহমদ বলেছেন, শিক্ষার হার বাড়লেও সেই শিক্ষা দিয়ে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না। তাই এখনই কর্মমুখী প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা ও প্রাতিষ্ঠানিক পরামর্শ কেন্দ্র স্থাপন জরুরি। নাহলে সমাজে কিশোর অপরাধ, মাদকাসক্তি এবং হতাশা ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই সংকট সমাধান সম্ভব নয় বলে অভিমত স্থানীয়দের। তাদের মতে, হাটহাজারীর মতো কৃষিনির্ভর উপজেলায় তরুণ সমাজের এই বিপর্যয় অদূর ভবিষ্যতে জাতীয় সমস্যা হয়ে দেখা দিতে পারে।