মোহাম্মাদ মনিরুজ্জামান, মোংলা থেকে: বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। এটি বাঘ, হরিণ, কুমির, বানরসহ অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল। এই বনের প্রধান আকর্ষণ রয়েল বেঙ্গল টাইগার, যাকে সুন্দরবনের রাজা বলা হয়। দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটক এ বন দেখতে আসেন এবং ভাগ্যক্রমে অনেকেই এই মহারাজের দেখা পান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বনজ সম্পদ লুণ্ঠন, নির্বিচারে শিকার এবং চোরা শিকারিদের অবাধ বিচরণে সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীরা মারাত্মক সংকটের মধ্যে পড়েছে।
গবেষকরা বলছেন, চোরা শিকারীরা এখন সুন্দরবনের বাঘের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি। বনের বিভিন্ন স্থানে শিকারিরা ফাঁদ পেতে হরিণ শিকার করছে। হরিণই বাঘের প্রধান খাদ্য উৎস, তাই হরিণ কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঘের খাদ্যসংকট তীব্র আকার ধারণ করছে। শুধু তাই নয়, অনেক সময় এসব ফাঁদে আটকা পড়ে বাঘের শাবক কিংবা অন্য বন্যপ্রাণীও প্রাণ হারাচ্ছে। খাদ্যসংকটের কারণে বাঘ মানববসতিতে ঢুকে পড়ছে এবং মানুষ-বাঘ সংঘর্ষের ঘটনাও বেড়ে যাচ্ছে, যা দুই পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর।
বাংলাদেশ অংশের সুন্দরবনের আয়তন প্রায় ৬,০১৭ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে প্রায় ৪,১৪৩ বর্গকিলোমিটার বনাঞ্চল ও আবাসভূমি। এ অঞ্চলের জোয়ার-ভাটার লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকা নিজেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সেখানে শিকার ও বন ধ্বংসের চাপ যুক্ত হয়ে বন্যপ্রাণীর ওপর নতুন করে বিপর্যয় ডেকে আনছে।
পরিবেশবিদ নুর আলম শেখ জানান, “অতিরিক্ত হরিণ শিকারের কারণে বাঘের খাবার কমে যাচ্ছে, আর নদী-খালে বিষ দিয়ে মাছ ধরার ফলে শুধু মাছই নয়, বিষাক্ত পানি পান করে অনেক বন্যপ্রাণীও মৃত্যুবরণ করছে। ফলে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতি এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।”
করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাওলাদার আজাদ কবির বলেন, “শিকারিদের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত আছে। নিয়মিত টহলের পাশাপাশি শিকারিদের আটক করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তবে শিকারিরা চতুরতার সঙ্গে রাতের আঁধারে প্রবেশ করে অপকর্ম চালায়। তাদের প্রতিহত করতে আমাদের পাশাপাশি স্থানীয় জনগণেরও সচেতন ভূমিকা প্রয়োজন।”
পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী দৈনিক সংগ্রামকে জানান, সাম্প্রতিক সময়ে বিপুল সংখ্যক শিকারের ফাঁদ উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি বলেন, “শিকারিদের দমন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের জন্য আমাদের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তবে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, স্থানীয়দের সম্পৃক্ত করা ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষা সম্ভব নয়।”
বর্তমানে সুন্দরবনে দ্বিতীয় প্রজন্মের টাইগার অ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করতে গঠন করা হয়েছে ৪৯টি ভিলেজ রেসপন্স টিম, যারা বন বিভাগকে সহায়তা করছে। এই পরিকল্পনার লক্ষ্য হলো বাঘের আবাস সংরক্ষণ, খাদ্যশৃঙ্খল অক্ষুণ্ণ রাখা এবং স্থানীয় জনগণকে বিকল্প জীবিকার মাধ্যমে বননির্ভরতা কমানো।
সার্বিকভাবে বলা যায়, সুন্দরবনের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নটি এখন শুধু পরিবেশ নয়, জাতীয় স্বার্থের বিষয়ও বটে। চোরা শিকার বন্ধ, বন বিভাগের কঠোর নজরদারি, স্থানীয় জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ কর্মসূচি বাস্তবায়ন ছাড়া রয়েল বেঙ্গল টাইগার ও সুন্দরবনের অন্যান্য বন্যপ্রাণীকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। নতুবা পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন একদিন প্রাণহীন জঙ্গল হয়ে পড়বে।