সোনাগাজী (ফেনী) সংবাদদাতা : ছোট ফেনী নদীর দুই তীরের ভাঙনের শিকার ফেনী, নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলার ১০ উপজেলার লাখো মানুষ। মুছাপুর ক্লোজার পুনঃনির্মাণ এবং টেকসই বাঁধ নির্মাণের দাবিতে সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জে প্রায় প্রতিনিয়ত চলছে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি। ছোট ফেনী নদীর দুই তীরে ভয়াবহ ভাঙনেই চরম আতংকের মাঝে দিন কাটছে নদী পাড়ের হাজার হাজার মানুষের। ঘর-বাড়ি ও ফসলি জমি হারিয়ে অনেকেই এখন দিশেহারা।

বঙ্গোপসাগরের মোহনায় ছোট ফেনী নদীর ভাটিতে ডাকাতিয়া ও পুরাতন ডাকাতিয়া ছোট ফেনী নদী নিষ্কাশন প্রকল্পের অধীন ২৩ ভেন্টের রেগুলেটরটি ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে ভয়াবহ বন্যায় ও ভারতের উজানের পানির চাপে ভেঙে সাগরে ভেসে যায়।

স্থানীয় এলাকাবাসীর দাবি, পাউবোর অসাধু কর্মকর্তাদের সীমাহীন গাফলতি, রেগুলেটর নির্মাণ কাজে ত্রুটি এবং ক্লোজার সংলগ্ন এলাকা হতে সারা বছর অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করায় ২০০৫ সালে নির্মিত মুছাপুর ক্লোজারটি স্বল্প সময়ের ব্যবধানে ভেঙে বন্যার পানির সাথে সাগরে বিলীন হয়ে যায়।

ক্লোজারটির ভাঙন পরবর্তী সময়ে খবর পেয়ে অর্ন্তবর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে দ্রুত সময়ের মধ্যে রেগুলেটটির পুনঃনির্মাণের উদ্যোগ নেবেন বলে আশ্বাস দেন।

এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর নোয়াখালী জেলাধীন কোম্পানীগঞ্জ এবং ফেনীর সোনাগাজী উপজেলায় ছোট ফেনী নদীর উপর অবস্থিত মুছাপুর ক্লোজার ড্যামের স্থান (যা প্রবল বন্যায় সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্তÍ) পরিদর্শনে আসেন নদী রক্ষা কমিশনের পরিচালক (যুগ্ম সচিব) দেলোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের পরিদর্শন টীম।

পানি উন্নয়ন বোর্ড অফিস সূত্রে জানা যায়, বঙ্গপোসাগরের লোনা পানি রোধ, শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টি ও পাহাড়ের মিঠাপানি আটকিয়ে কৃষি জমি আবাদের লক্ষ্যে ছোট ফেনী নদীতে ২০০৫ সালে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে “মুছাপুর ক্লোজার” নির্মাণ করা হয়। রেগুলেটরটি নির্মাণের ফলে কুমিল্লা জেলার ছয়টি উপজেলা কুমিল্লা সদর, সদর দক্ষিণ, বরুড়া, লাকসাম, নাঙলকোট, চৌদ্দগ্রাম, ফেনী জেলার সদর উপজেলা, দাগনভূঞা, সোনাগাজী এবং নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জসহ ১০টি উপজেলায় বোরো মৌসুমে সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হতো। যার মাধ্যমে বার্ষিক আয় হতো প্রায় ২০০ কোটি টাকারও আধিক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ায় ছোট ফেনী নদীতে জোয়ার-ভাটার সময় নদীর দুই তীরে বিশেষ করে সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জ অংশে নদীর ভাঙন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে।

সোনাগাজীর চরমজলিশপুর ইউনিয়নের চর বদরপুর, কুঠির হাট, কাটাখিলা, বগাদানা ইউনিয়নের আলমপুর, আউরারখিল, চরদরবেশ ইউনিয়নের আদর্শ গ্রাম, চর ইঞ্জিমান, পশ্চিম চরদরবেশ, তেল্লার ঘাট, মোল্লার চর, ইতালি মার্কেট, ধনী পাড়া কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর গ্রাম, ছোট ধলী ও চর হাজরী গ্রামসহ বেশ কয়েকটি গ্রামের শত শত ঘর-বাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তা-ঘাটসহ পুল কালভাট নদী গর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় এলাকবাসীদের অভিমত, ছোট ফেনী নদীর অধিকাংশ এলাকার নদীর মাঝখানে চর জেগে উঠায় পাউবো’র পক্ষ হতে নদীতে “লুফ কাটিং” না করায় নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে এঁকে-বেঁকে নদীর দুই তীরে তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। বর্ষা মৌসুমে নদীর নাব্যতা কমে যাওয়াও নদী ভাঙনের অন্যতম কারণ।

এদিকে মুছাপুর রেগুলেটর বিলীন হওয়ায় এবং ছোট ফেনী নদীর অব্যাহত ভাঙনের কবলে পড়ে ফেনী-নোয়াখালী জেলার বিশেষ করে সোনাগাজী ও কোম্পানীগঞ্জের বিশেষ ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষ, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ও সামাজিক সংগঠনের ব্যানারে ভাঙন কবলিত এলাকায় ও সংশ্লিষ্ট উপজেলা সদরে মুছাপুর ক্লোজার পুনঃনির্মাণ, টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও নদীভাঙন রোধে কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও প্রশাসনের নিকট স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী অফিসার কামরুল হাসান স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, মুছাপুর ক্লোজার পুনঃনির্মাণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ হতে ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি (বাস্তবায়ন যোগ্যতা নিরীক্ষা) চলমান। জানা গেছে এ কাজের ৭০% শেষ হয়েছে। আমরাও প্রশাসনের-ঊর্ধ্বতন মহলে জোর দাবি জানাচ্ছি, যাতে দ্রুত সময়ে এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়।

পাউবো ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী আকতার হোসেন মজুমদার বলেন, মুছাপুর ক্লোজার (রেগুলেটর) পুনঃনির্মাণ সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। সরকারের সকল প্রক্রিয়া শেষ করে এটি পুনঃনির্মাণ করতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। তিনি আরো বলেন, মুছাপুর রেগুলেটর ভেঙে যাওয়ায় ছোট ফেনী নদীতে জোয়ার-ভাটার কারণে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এ ভাঙন দিন দিন বাড়ছে। ভাঙনরোধে পাউবোর প্রস্তাবনার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাংকের প্রজেক্ট সাসটেইনেবল ইমারজেন্সি রিকভারি প্রিফাইয়ার্ড নেস বি-স্ট্রং প্রজেক্ট এর আওতায় ১৩ কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণের জন্য ১৫৫ কোটি টাকা সহায়তা প্রদানের প্রস্তাবনা রয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে নদী ভাঙন অনেকটা রোধ হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি (প্রকল্প বাসস্তবায়ন যোগ্যতা নিরীক্ষা) কাজটি ধীর গতিতে করায় এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের গাফলতির কারণে জনগুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পের কাজ আলোর মুখ দেখছে না। ফলে নদী তীরবর্তী অঞ্চলের মানুষ চরম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত হতাশা ও আতংকের মাঝে দিন কাটাচ্ছে।