মনিরামপুর (যশোর) সংবাদদাতা : যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর, কেশবপুরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ আবারও জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে। বৃষ্টির পানির চাপ যত বাড়ছে, আতংক যেন ততই ঘূনিভূত হচ্ছে। অথচ গত ১০ বছরে (২০১৪–২০২৪) এ জলাবদ্ধতা নিরসনে নেওয়া হয়েছে একাধিক সরকারি প্রকল্প, খরচ হয়েছে শত শত কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে এই প্রকল্পগুলোর বেশিরভাগই দুর্নীতি, অনিয়ম ও অকার্যকারিতার চিত্র বহন করছে।
‘টিআরএম’ বন্ধ, দুর্নীতির প্রকল্প চালু, ১৯৯৪ সালে খুলনা-যশোর নিষ্কাশন পুনর্বাসন প্রকল্প (কঔউজচ) ও ‘ট্রাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট’ (ঞজগ) চালু করে ভবদহে কিছুটা স্বস্তি আনা সম্ভব হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে শুরু হওয়া নতুন প্রকল্পগুলোতে ঞজগ বাদ দিয়ে বিকল্পভাবে সেচপাম্প ও স্লুইসগেটের ওপর নির্ভরশীল ব্যবস্থা চালু হয়, যা কার্যত ব্যর্থ হয়েছে।
জানা যায়, ২০১৮ সালে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী স্বপন ভট্টাচার্য ও সচিব কবির বিন আনোয়ারের উদ্যোগে ঞজগ বাদ দিয়ে ৬৫৫ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প চালু হয়। ওই প্রকল্পে সরঞ্জাম কেনা, ঠিকাদারি নিয়োগসহ প্রায় সব ধাপে দাম বাড়িয়ে টাকা লোপাটের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয় সংগ্রাম কমিটি ও এলাকাবাসী এর প্রতিবাদ জানালেও প্রকল্প বাস্তবায়ন থেমে থাকেনি। প্রকল্পের টাকা গেছে, জলাবদ্ধতা থাকছেই স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, গত ১০ বছরে ভবদহ অঞ্চলে অন্তত ৫টি প্রকল্পে প্রায় ১২৫০ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বিল খুকশিয়ায় ঞজগ বন্ধ করে সেচপাম্প, আমডাঙ্গা খাল সংস্কার, নদী খননসহ বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। কিন্তু নদীর নাব্যতা ফেরেনি, বরং বেড়েছে পলি, বেড়েছে জলাবদ্ধতা। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরেই বৃষ্টিতে অভয়নগরের ২১টি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রাম পানিতে তলিয়ে যায় স্কুল-কলেজ বন্ধ, ফসল বিনষ্ট, রাস্তাঘাট ডুবে গিয়ে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে ভোগান্তি দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন। ২০০৫ সালে স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নজমুস সাদাতসহ ৪৮৩ ব্যক্তি জেলা প্রশাসকের কাছে বিল কেদারিয়ায় জোয়ারাধার বন্ধের আবেদন করলে প্রশাসনের নির্দেশে ৪৮ দিন স্লুইসগেট বন্ধ থাকে। এর ফলে নদীতে ব্যাপক পলি জমে। পরের বছর অতিবৃষ্টিতে ডুবে যায় শতাধিক গ্রাম। এছাড়াও, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কিছু অংশ ঞজগ পদ্ধতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে অন্য প্রকল্পে স্বার্থ সংরক্ষণে তৎপর হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে ‘ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটি’র।
৬০’র দশকের ‘সমাধান’ আজকের ‘সমস্যা’ ভবদহ জলাবদ্ধতার মূল উৎসের দিকে তাকালে চোখে পড়ে ১৯৬০-৬৭ সালে নির্মিত উপকূলীয় পোল্ডার প্রকল্প। খুলনা অঞ্চলে তৈরি হয় ৩৪টি পোল্ডার, ১৫৬৬ কিমি বেড়িবাঁধ ও ২৮২টি স্লুইসগেট। প্রকল্পটি প্রথমে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিতে সহায়তা করলেও, সময়ের ব্যবধানে এটি হয়ে দাঁড়ায় বিল অঞ্চলের স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার বাধা। পলি সরতে না পারায় জমি হয়ে পড়ে নিচু, এবং বৃষ্টি হলেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা।
নদের বুক ভরাট আর নদীর মৃত্যু চিত্রা নদীর খাত ভরাট করে ১৯৩৮ সালে কেরু অ্যান্ড কোম্পানির চিনিকল নির্মাণ ছিল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পানিপ্রবাহ বন্ধ হওয়ার শুরুর ঘটনা। এরপর থেকে একের পর এক খাল ও নদী ভরাট হতে থাকে। দর্শনার রেলসেতুর নিচ দিয়ে সামান্য পানি প্রবাহ থাকলেও সেটাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে ধীরে ধীরে অঞ্চলটির নদীগুলো মৃতপ্রায় হয়ে পড়ে।
নদী বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলীরা বলছেন, ভবদহের মতো অঞ্চলে শুধু টিআরএম (ঞজগ) পদ্ধতিই কার্যকর। এতে বিলে জোয়ার-ভাটা চালু রেখে জমে থাকা পলি বিলে রেখে নদীর নাব্যতা ও ভূমি গঠন স্বাভাবিক রাখা যায়। অন্য যেকোনো সেচনির্ভর প্রকল্প এখানে দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না।
জনগণের দাবি স্থানীয় জনগণকে প্রকল্প সিদ্ধান্তে সম্পৃক্ত করা এখন সময়, টিআরএমসহ কার্যকর ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনায়। না হলে ভবদহ আবারও হয়ে উঠবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিষফোঁড়া।