তৌফিক রুবেল, দাউদকান্দি (কুমিল্লা) : ভোর হওয়ার আগেই দাউদকান্দি কেরোসিন ঘাটে শুরু হয় এক অন্যরকম নাট্যমঞ্চ। নদীর বুক ফুঁড়ে ভেসে আসে ট্রলার, বাল্কহেড আর নৌকার গর্জন। ঢেউয়ের ছলাৎ ছলাৎ শব্দের সাথে মিশে যায় শ্রমিকদের হাঁকডাক। আলো ফোটার আগেই যেন সাজানো হয়ে যায় এক মঞ্চযেখানে নেই ঝলমলে আলো বা পর্দা, আছে কেবল মানুষের ঘামে লেখা বেঁচে থাকার গল্প। কারও কাঁধে ইট, কারও হাতে বালুর ঝাঁপি। কেউবা পাথরের বোঝা নামাচ্ছে, আবার কেউ রশি টানছে নদীর বুক থেকে। রোদ ঝলসানো দুপুর হোক বা ভ্যাপসা গরম, কাঁধ ঝুঁকিয়ে তারা খেটে যায় অবিরত। তাদের প্রতিটি ঘামের ফোঁটা মানেই ঘরে ভাতের হাঁড়ি, সন্তানের স্কুল ফি, কিংবা অসুস্থ মায়ের ওষুধের দাম। এই ঘাট তাই কেবল পণ্য নামানোর জায়গা নয়; এটি আসলে হাজারো শ্রমজীবী মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি। দিন শেষে বিশ্রামের কোনো আলাদা জায়গা নেই তাদের। ট্রলারের ছাদই হয়ে ওঠে শোবার ঘর, রান্নাঘর আর সংসারের আসন। পুরোনো কাপড়ের খুঁটি ও বাঁশে ঝুলে থাকা মশারিই তাদের আশ্রয়। আকাশের তারা, নদীর বাতাস আর মশারির দুলুনি মিলে তৈরি করে এক ভ্রাম্যমাণ সংসার। বৃষ্টি নামলেই ছুটতে হয় ট্রলারের অন্ধকার কুঠুরিতে। এভাবেই চলে দিন, এভাবেই গড়ায় জীবন। এক সন্ধ্যায় ঘাটের ধারে দাঁড়িয়ে হঠাৎ চোখে পড়ল এক শ্রমিককে। অল্প আলোয় মোবাইল জ্বালিয়ে মশারির ভেতরে বসে মশা মারছেন তিনি। ক্ষীণ আলোয় তার মুখমণ্ডল স্পষ্ট হয়ে উঠল—ক্লান্ত অথচ দৃঢ়, পরিশ্রান্ত অথচ জীবন্ত। মনে হলো, এ দৃশ্যই যেন শ্রমিকজীবনের প্রতিচ্ছবি: যতটুকু আলো আছে, ততটুকুতেই লড়াই; যত কষ্টই থাকুক, বেঁচে থাকাই তো আসল নাম জীবন।ঘাটের ইজারা আদায়কর্মী বললেন, “ওরা শরীয়তপুরের জাজিরা থেকে ইট আনে, যমুনা থেকে বালু আনে। সারাদিন খেটে রাতেও ট্রলারের উপরেই খায়-শোয়। এই নদীই তাদের ঘর, এই নদীই তাদের ভরসা।”স্থানীয় ব্যবসায়ী মাহবুব সরকার যোগ করলেন, “তাদের জীবন নদীর স্রোতের মতোই শান্ত অথচ অন্তহীন। সুখ-দুঃখের কথা এই নদীই জানে। নদীই হলো তাদের জীবিকার হাতিয়ার, তাই সব দুঃখ তারা নীরবেই বয়ে বেড়ায়।”ঘাটের গজারিয়া থেকে আসা এক ইট শ্রমিক জানালেন,“ইটখলা থেকে ইট আনি দাউদকান্দি, গৌরীপুর, তিতাসে। সারাদিন খাটি, রাতে ট্রলারের ছাদে মশারি টানাইয়া শুই। বৃষ্টি আসলে ভেতরে যাই। এইভাবেই চলে জীবন।”তার কণ্ঠে ছিল অবসন্নতা, আর চোখে ছিল অদৃশ্য বেদনা।এই শ্রমিকদের ঘামে, কষ্টে, পরিশ্রমে দাঁড়িয়ে যায় শহরের অট্টালিকা, সেতু, সড়ক আর কলকারখানা। অথচ সেই অট্টালিকার ছায়া কখনোই তাদের জীবনে এসে পড়ে না। অর্থনীতির চাকা তাদের কাঁধে ঘুরলেও, তারা বঞ্চিত থাকে স্থায়ী আশ্রয় ও নিশ্চিন্ত জীবনের স্বপ্ন থেকে।কেরোসিন ঘাট আসলে এক নিঃশব্দ ইতিহাসের দলিল। এখানে প্রতিটি শ্রমিক একেকটি কাব্য, প্রতিটি ঘামের বিন্দু একেকটি স্তবক। তারা গান গায় না, কবিতা লেখে না—তবু তাদের জীবনই হয়ে ওঠে এক অদৃশ্য কবিতা; সংগ্রামের কবিতা, আত্মত্যাগের কবিতা, ঘামে ভেজা জীবনের নিঃশব্দ কাব্য।