মোঃ শামীম হোসেন, (সাভার) সংবাদদাতা : আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এখন রাজনীতির মাঠ সরগম। সারাদেশে পুরোদমেই বইছে এখন নির্বাচনী হাওয়া। রাজধানীর অদূরে ঢাকা-১৯ (সাভার, আশুলিয়া) আসনটিকে বিএনপি নিজেদের দুর্গ বলে মনে করে। আসন্ন নির্বাচনের মধ্যদিয়ে এ দুর্গকে পুনরুদ্ধার করতে দলটির একাধিক নেতা মনোনয়ন চাইছেন। আর প্রথমবারের মতো আসনটিতে জিততে চাইছে জামায়াতে ইসলামী।
আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এ আসনে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা জেলা সেক্রেটারি মাওলানা মোঃ আফজাল হোসাইনকে একক প্রার্থী করেছে। এর ফলে বহু আগেই নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়েছেন নেতাকর্মীরা।
এ আসনে জামায়াতের একক প্রার্থী ঘোষণা দেওয়ায় বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন দলটির নেতা-কর্মীরা। প্রতিদিনই নির্বাচনী এলাকায় ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট চাচ্ছেন। ফলে এখন সুবিধাজনক স্থানে রয়েছেন দলের এ প্রার্থী।
অপরদিকে এ আসনে বিএনপি প্রার্থী বাছাইয়ে বেশ পিছিয়ে আছে। বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেতে একাধিক প্রার্থী মাঠে থাকলেও দুর্গ পুনরুদ্ধারে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন সাবেক দুই বারের (১৯৯৬-২০০৬) সংসদ সদস্য ডা. দেওয়ান মোঃ সালাউদ্দিন বাবু, সাভার উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিন, ঢাকা জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি খন্দকার শাহ মাইনুল হোসেন বিল্টু, ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক রাশেদুল আহসান রাশেদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান এবং ঢাকা জেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব খান। যাদের নাম শোনা যাচ্ছে তাদের বেশির ভাগই নানাভাবে মাঠে আছেন। আবার অনেকে আনুষ্ঠানিকভাবে মাঠে না নামলেও ভেতরে ভেতরে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এতে দলে দেখা দিয়েছে বিভক্তি। কার পক্ষে ভোট চাইবেন এ নিয়ে নেতাকর্মীরাও শঙ্কায়।
এদিকে গণ অধিকার পরিষদের প্রার্থী এডভোকেট শেখ শওকত হোসেন, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মোহাম্মদ ফারুক খান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস মনোনীত শায়খুল হাদীস মাওলানা মহিউদ্দিন রব্বানী, জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি আলী আশরাফ তৈয়ব ঢাকা-১৯ আসনে সংসদ সদস্য প্রার্থী হিসেবে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে মাঠে গণসংযোগ করছেন। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে এখনো কোনো প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি।
সাভার উপজেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, এ আসনটিতে প্রথম শ্রেণীর ১ টি পৌরসভা ও সাভার উপজেলার ৭টি ইউনিয়ন এবং সেনানিবাস নিয়ে চলমান হালনাগাদে ভোটার সংখ্যা পুরুষ- ৩ লক্ষ ৭৯ হাজার ৭৭ জন, মহিলা- ৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৫৬৬ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ১৩ জনসহ মোট ভোটার ৭ লক্ষ ৫৬ হাজার ৬৫৬ জন। তবে ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ চলমান থাকায় ভোটার সংখ্যা আরো বাড়বে। নির্বাচনে এ আসনে ২৭৫ টি কেন্দ্রের ১ হাজার ৪৭৫ টি ভোট কক্ষ রয়েছে । ইতিমধ্যে প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং এজেন্ট নিয়োগের কাজ চলছে।
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে হবে এমনটা ধরে নিয়েই প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতেসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক নানা কর্মসূচিতে যোগদানের পাশাপাশি নির্বাচনী এলাকায় বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্য দলগুলো পুনরায় মাঠে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সম্ভাব্য প্রার্থীরা জুলাই আন্দোলনে শহীদ কিংবা আহতদের বাড়িতে গিয়ে খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। অনুদান দিচ্ছেন। সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিল এলাকায় এলাকায় উঠান বৈঠক, পথসভা সহ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে জোর তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। নানা সামাজিক কর্মকান্ডে নির্বাচনি এলাকায় বেশির ভাগ সময় ব্যয় করছেন। এ আসনের মানুষ এখন অপেক্ষায় রয়েছেন নিজেদের মত প্রকাশের।
শিল্পাঞ্চল খ্যাত এ আসনে বড় একটি অংশ চাকরি ও ব্যবসা সূত্রে এখানে এসে ভোটার হয়েছেন। এই ভোটাররাই প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রে বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করেন স্থানীয়রা। রাজধানীর সন্নিকটে হওয়ায় রাজনীতিতে এই আসনের গুরুত্বও অনেক বেশি। তবে যাই হোক না কেন এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে। কারণ এ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী হচ্ছে জামায়াতের।
ঢাকা ১৯ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মোঃ আফজাল হোসাইন বলেন, আমি নির্বাচিত হলে আমার নির্বাচনী এলাকায় বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে প্রধান সমস্যা মহাসড়কের যানজট সমস্যার সমাধান করা, সকল ধরনের রাস্তাঘাট সংস্কার ও প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ করা, মাদক, কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণ করা, চাঁদাবাজ, দখলদারমুক্ত সমাজ গড়ার অঙ্গীকার করেন।
মাওলানা মোঃ আফজাল হোসাইন আরো বলেন, প্রতিদিন ভোটারের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি, গরীব ও অসহায় মানুষের চাহিদার আলোকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি, বিধবা-অসহায় নারীকে সহযোগিতা করছি। রাস্তাঘাট সংস্কার, ছোট ছোট রাস্তাঘাট নির্মাণ, গভীর নলকূপ বসানো, শুকনো খাবার বিতরণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বাউন্ডারির কাজ করা, মসজিদ-মাদরাসার উন্নয়নে সহযোগিতা করা, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান নির্বিঘেœ পালন করার সার্বিক সহযোগিতা করছি। আগামীতে নির্বাচিত হলে ব্যাপক পরিসরে বিপুল সংখ্যক জনগণের জন্য কাজ করার সুযোগ পাবো।
বিএনপির ত্যাগী নেতাদের অভিযোগ যারা আন্দোলন সংগ্রামে জীবন বাজি রেখে মাঠে থেকেছেন, তাদের যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে না। বরং অনুপ্রবেশকারীরা টাকা-পয়সার জোরে অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এতে করে প্রকৃত ও ত্যাগী নেতাদের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে।
সাভারের সাবেক সংসদ সদস্য ও ঢাকা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ডাঃ দেওয়ান মোঃ সালাউদ্দিন বলেন, এই আসনে আমার পিতা মরহুম দেওয়ান ইদ্রিস ১৯৭৯ সালে বিএনপি মনোনিত ধানের শীষ প্রতীকে এমপি নির্বাচিত হয়ে ছিলেন। আমিও ১৯৯৬ ও ২০০১ এ দুই বারে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছি। নির্বাচনী এলাকায় প্রতিনিয়ত মানুষের কাছে যাচ্ছি, তাদের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন ও সাড়া পাচ্ছি।
বিএনপি একটি বড় দল, এই দলে আগেও একাধীক প্রার্থী ছিলো, এখনো আছে, ভবিষ্যতে থাকবে । দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করলে সকল দ্বিধা বিভক্তি ভুলে, ধানের শীষের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে সকলেই এক মঞ্চে কাজ করবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
মনোনয়ন প্রত্যাশী সাভার পৌর বিএনপির সভাপতি খন্দকার শাহ্ মাইনুল হোসেন বিল্টু বলেন, বিএনপি একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দল। এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশী প্রার্থী একাধীক থাকবে এটাই স্বাভাবিক। তবে কোন কোন্দল নেই। পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর বিল্টু আরো বলেন, দীর্ঘদিন দল করি- আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে ছিলাম। এখন দল থেকে যাকে যোগ্য মনে করবে তাকেই মনোনয়ন দিবে। আগামীতে এ আসনটি পুনরুদ্ধার করতে ধানের শীষের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করবো।
এদিকে গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী দলটির ঢাকা জেলার আহ্বায়ক এডভোকেট শেখ শওকত হোসেন বলেন, তারুণ্যের নেতৃত্বের দল গণঅধিকার পরিষদ থেকে আমাকে ঢাকা ১৯ আসনের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে, আমি আমার আসনে এমপি নির্বাচিত হলে, দুনীতি ও মাদকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিবো। এছাড়া যুবকদের কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে কাজ করবো।
তবে ভোটাররা বলছেন, এই আসন থেকে বিজয়ী হয়ে অতীতে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেছেন আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা। এবার রাজনীতি ও নির্বাচনী মাঠ থেকে ‘আউট’ আওয়ামী লীগ। জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থাও নড়বড়ে। ফলে আগামী নির্বাচনে বিএনপির মুল প্রতিদ্বন্দ্বি এক সময়ের জোটসঙ্গী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম।
তারা আরো বলছে, দীর্ঘ ১৭ বছরে ভোট দিতে পারেনি এ আসনের ভোটাররা। তাই এবার অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু পরিবেশে ভোট দিতে উন্মুখ এ অঞ্চলের জনগণ।