কামাল হোসেন আজাদ ও শাহনেওয়াজ জিল্লু, কক্সবাজার থেকে : দফায় দফায় সংর্ঘষ, ভাঙচুর এবং মাঠে অগ্নিসংযোগ সহ নানা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত ডিসি গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৫-এর ফাইনাল ম্যাচটি স্থগিত করা হয়েছে।
এতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ছুটা-ছুটিতে কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নিলুফা ইয়াসমিন সহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। ভাংচুরের ঘটনায় স্টেডিয়ামের মূল ভবন, গ্যালারি সহ ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সকাল থেকেই ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি দশক গ্যালারী সহ আশপাশের জায়গাগুলোতে অবস্থান নিয়েছিলো। মাঠের বাইরেও টিকেট নেওয়া কয়েক হাজার দর্শক তখন মাঠে প্রবেশের চেষ্টা চালাতে থাকে। ফলে সঠিক সময়ে খেলা শুরু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। একারণে টিকিট কেটে গ্যালারি ও মাঠে প্রবেশ করা দর্শকরা উত্তেজিত হয়ে ভাঙচুর শুরু করেন। তাদের ছোড়া ইটপাটকেল ও চেয়ার নিক্ষেপে প্রেস বক্স, জেলা ক্রীডা সংস্থার অফিস তছনছ হয়ে যায়।
গত শুক্রবার বেলা আড়াইটার দিকে কক্সবাজার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম ও এর আশপাশের এলাকাজুড়ে এ ঘটনা ঘটে। গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলা ছিল গত শুক্রবার।
সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় ৭ শতাধিক জনের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে বলে নিশ্চিত করেছে জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা ও ক্রীড়াসংস্থার সদস্য সচিব মো. আলাউদ্দিন। তিনি আরও জানান- ফাইনাল ম্যাচের আগের দিন ১১ তারিখ এডিসি জেনারেল শহীদুল আলম টিকিট ইজারাদারদের ডেকে অ্যাডহক কমিটির সবার সামনে বলে দিয়েছেন- আমাদের যে ধারণ ক্ষমতা আছে এর বেশি যদি টিকেট বিক্রি হয় এবং কোনো বিশৃঙ্খলা হয় এর দায়ভার ইজারাদারদের নিতে হবে। তবও কেনো এতো অতিরিক্ত টিকিট বিক্রি হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন- কালোবাজারিরা ছাপাখানা থেকে নকল টিকিট ছাপিয়ে বিক্রি করেছে। তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
টিকিট কালোবাজারি এবং অতিরক্তি টিকিট বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে ইজারাদার ইব্রাহীম বাবু জানান- আমরা মোট ৬ লাখ ২০ হাজার টাকা খরচ করে এটা ইজারা নিয়েছি। ফাইনাল খেলার দিনের জন্য ৫ হাজার টিকিট ছাপানো হয়। এগুলো খেলার আগের রাতেই বিক্রি হয়ে যায়। সকালে টিকিটের অপর পাশের অংশ থেকে হাজার দুয়েক বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে সাড়ে ৭ হাজার টিকিট বিক্রি করি। কিন্তু কালোবাজারিরাই বিক্রি করেছে ১৫ থেকে ২০ হাজারের উপরে। ফলে দর্শকদের উপস্থিতি আকস্মিক ভাবে সকাল থেকেই বেড়ে যায়। পরিস্থিতি সামাল দিতে বারবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা চেয়েছি। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত সহযোগীতা পাওয়া যায়নি। পুলিশ মাঠে এসেছে বেলা ১টার দিকে। ততক্ষণে মাঠে সংঘর্ষ লেগে যায়। একারণে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়ানো যায়নি। এছাড়াও কর্তৃপক্ষের কাছে নিরাপত্তার বিষয়টি একাধিকবার অবগত করেও কোনো ফল পাওয়া যায়নি। এর আগে গত ১১ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে বিভিন্ন ছাপাখানা থেকে নকল টিকিট জব্দ করা হয়। এর সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।
দর্শকরা অভিযোগ করেছেন- স্টেডিয়ামের ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত ৬ গুণ টিকেট বিক্রি করা হয়েছে। টিকেট বিক্রি হয়েছে অতিরিক্ত মূল্যে, যার ফলে বসার জায়গার অভাব সৃষ্টি হয়েছে এবং বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। বড় আয়োজনে নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নও উঠেছে। রামু ও টেকনাফ উপজেলা একাদশের মধ্যে বেলা ৩টায় খেলা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও সকাল ৭টায় দর্শকরা এসে টিকেট সংগ্রহ শুরু করেন। টিকেটের মূল্য ৫০ টাকা হলেও পরে দাম বাড়তে থাকে। দুপুর ২টা পর্যন্ত আয়োজক কমিটি অতিরিক্ত মূল্যে ৩০ হাজার টিকেট বিক্রি করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
স্টেডিয়ামের ধারণ ক্ষমতা ৫ হাজার হলেও অতিরিক্ত দর্শক গ্যালারিতে বসার জায়গা না পেয়ে গেইট ভেঙে আড়াইটার দিকে মাঠ দখল করে নেন। এতে মাঠে খেলা পরিচালনা করা সম্ভব হয়নি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হয়। তবে বিকাল ৫টার দিকে মাঠে প্রবেশ করা লোকজনকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী লাঠি চার্জ করে বের করে দিতে সক্ষম হন। এরপরও গ্যালারি ও মাঠে দর্শকরা একযোগে হামলা চালিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাংচুর শুরু করেন।
কক্সবাজার জেলা পুলিশের মুখপাত্র অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন জানান- খেলার আয়োজক কমিটি কিংবা ক্রীড়াসংস্থার কেউই আমাদের সাথে উক্ত ইভেন্টের বিষয়ে সরাসরি যোগাযোগ করেনি। তবুও আমরা এডিএম এর মাধ্যমে অবগত হয়ে সর্বোচ্চ সহায়তা দিতে চেষ্টা করেছি। একাধিক ফাঁড়ি ও থানা থেকে পুলিশ এনে ডেপ্লয় করেছি। সকাল থেকে পুলিশ মোতায়েন করা হয়নি কেনো জানতে চাইলে তিনি জানান- খেলা অনুষ্ঠিত হবার কথা বিকেল ৩টার দিকে। আমরা দুপুর ১টার দিকে পুলিশ মোতায়েন করেছি। যথা নিয়ম মেনে খেলা শুরুর দুই ঘন্টা আগে দর্শক প্রবেশ করা হলে এই ঘটনা ঘটতো না। কিন্তু আয়োজক কমিটি সকাল থেকেই মাঠে দর্শক প্রবেশ করিয়ে কানায় কানায় ভর্তি করে ফেলে। ফলে দর্শকের ধৈর্য্যচুতি ঘটেছে এবং এই অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিয়েছে।