স্টাফ রিপোর্টার : তিন দিনব্যাপী জেলা প্রশাসক সম্মেলন শুরু হচ্ছে আজ রোববার। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের শাপলা হলে সকাল সাড়ে ১০টায় প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস এই সম্মেলনের উদ্বোধন করবেন। সম্মেলনের কার্য-অধিবেশনগুলো হবে ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে। গতকাল শনিবার সচিবালয়ে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এসব তথ্য জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. শেখ আব্দুর রশীদ।
সচিব বলেন, এবার ডিসি সম্মেলনে ৩৪টি কার্য-অধিবেশন হবে। ডিসি সম্মেলন উপলক্ষে বিভাগীয় কমিশনার ও ডিসিদের কাছ থেকে ১ হাজার ২৪৫টি প্রস্তাব পায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। তার মধ্যে কার্যপত্রে অন্তর্ভুক্ত হওয়া ৩৫৪টি প্রস্তাবের ওপর সম্মেলনে আলোচনা হবে।
ভূমি ব্যবস্থাপনা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম জোরদারকরণ; দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম; স্থানীয় পর্যায়ে কর্ম-সৃজন ও দারিদ্র্য বিমোচন কর্মসূচি বাস্তবায়ন; সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন; তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ই-গভর্নেন্স, শিক্ষার মান উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবার কল্যাণ; পরিবেশ সংরক্ষণ ও দূষণ রোধ; ভৌত অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও সমন্বয়ের বিষয়গুলোকে আলোচনার জন্য প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে ডিসিদের মুক্ত আলোচনা, বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ডিসিদের সভা হবে। এ বছর জেলা প্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কোনো অধিবেশন থাকছে না
এ ছাড়া সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে ডিসিরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের সঙ্গে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের সঙ্গে ডিসিদের কার্য-অধিবেশন রয়েছে।
জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে আসা প্রস্তাবের বিষদ তুলে ধরে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এমপিওভুক্তি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যা আয় হয়, তা কিভাবে ব্যয় হয় জানা যায়না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। তার হিসেব রাখার প্রস্তাব করেছেন একজন জেলা প্রশাসক। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে বডিক্যামেরা রাখা, মরণাস্ত্র ও ছররা গুলি না রাখার প্রস্তাব আছে। সার্কিট হাউজে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি থাকলে কেপিআই হিসেবে ঘোষণার প্রস্তাব আছে। পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে অনিয়ম দূর করতে জেলা প্রশাসক কার্যালয় থেকে একজনকে রাখার প্রস্তাব আছে।’
এবারের সম্মেলনে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট ধরে রাখা হবে বলেও জানান তিনি। ড. শেখ আব্দুর রশীদ বলেন, ‘জুলাই-আগষ্টের গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার পর আগের সরকারের দর্শনের সাথে সম্পৃক্ত বিভিন্নজনের নামে সড়ক, সেতুর মতো অবকাঠামোগতসহ কিছু প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা হয়নি। এ বছর ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা বাজেট আছে। কিছু কম হবে বলে আশা করি।’
সাংবাদিক সম্মেলনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব ড. মো: মোখলেস উর রহমান বলেন, ‘অর্পিত সম্পত্তির বিষয় সমাধানে একটি আইন করা যেতে পারে। এই সরকার ৬৪ জন জেলা প্রশাসক ও ৮ জন বিভাগীয় কমিশনার নিয়োগ দিয়েছে। আবার ডিসি ফিটলিস্টের কাজ শুরু হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে যেভাবে আগে বদল হতো, এখন তা হবেনা। সবাই দেশের ভাল চাই।’
এবারের সম্মেলনে ডিসিরা নতুন করে যে ক্ষমতা চাইছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জেলা পুলিশের এসিআর দেওয়া, কনস্টেবল নিয়োগ কমিটিতে তাঁদের প্রতিনিধি রাখা, ডিসির অধীনে বিশেষ ফোর্স গঠন, অপরাধ ডেটাবেইস ও এনআইডি ডেটাবেইস সার্ভারে ডিসি ও ইউএনওদের প্রবেশাধিকার, উপজেলা পরিষদের কর্মচারী নিয়োগ ও বদলির ক্ষমতা এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের বদলে উপজেলার সরকারি বাসা বরাদ্দের ক্ষমতা।
ডিসিদের পাঠানো প্রস্তাবগুলো পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তারা মাঠ প্রশাসনে আরো ক্ষমতা চান। সব কিছুতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চান।
উপজেলা পরিষদের কর্মচারীদের নিয়োগ ও বদলি ডিসিদের হাতে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন ফরিদপুরের ডিসি মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, স্বচ্ছতার সঙ্গে নিয়োগপ্রক্রিয়া সম্পন্ন করার পাশাপাশি কর্মচারীদের জবাবদিহি ও দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করা এবং বদলির মাধ্যমে কর্মচারীদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা। বর্তমানে উপজেলা পরিষদের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয় উপজেলা পরিষদ। গাড়িচালকদের বদলির ক্ষমতা আন্ত উপজেলায় ডিসি এবং আন্ত জেলায় বিভাগীয় কমিশনারদের।
পুলিশের এসিআর নিয়ে প্রস্তাব দিয়েছেন একাধিক ডিসি।তাঁরা পুলিশ প্রবিধান ১৯৪৩-এর ‘৭৫/এ’ ধারা উল্লেখ করে বলেছেন, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্রতিবছর জানুয়ারিতে জেলায় কর্মরত পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাজ নিয়ে তাঁর সাধারণ মূল্যায়ন বিভাগীয় কমিশনারের কাছে দেবেন। বিভাগীয় কমিশনার সেই প্রতিবেদনে নিজের মতামত যুক্ত করে তা পাঠাবেন সংশ্লিষ্ট রেঞ্জের উপপুলিশ মহাপরিদর্শকের (ডিআইজি) কাছে।
গাইবান্ধার ডিসি চৌধুরী মোয়াজ্জম আহমদ বলেছেন, অনেক আগে থেকেই জেলার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের প্রধান দায়িত্ব। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা কার্যক্রমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে মূলত পুলিশ বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হয়। কিন্তু পুলিশ কর্মকর্তাদের সার্বিক আচার-আচরণ ও জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক প্রতিফলিত হয়—এমন বার্ষিক প্রতিবেদন বিধানসংবলিত পুলিশ প্রবিধানের ধারাটি কার্যকর নেই। এ কারণে প্রায়ই সরকার ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়।
সাতক্ষীরার ডিসি মোস্তাক আহমেদ প্রস্তাবে লিখেছেন, জেলা পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভাপতি ডিসি। উপজেলা পর্যায়ে সভাপতি থাকেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর ওপর ডিসি ও ইউএনওদের কোনো দাপ্তরিক নিয়ন্ত্রণ নেই। ফলে অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। এ কারণে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর কর্মকর্তাদের কাজ নিয়ে প্রতিবেদন দেওয়ার বিষয়টি ডিসি ও ইউএনওদের নিয়ন্ত্রণে রাখা প্রয়োজন।
মাগুরার ডিসি অহিদুল ইসলাম বলেছেন, নিয়োগটি স্থানীয়ভাবে হয়ে থাকে। তাই সেই নিয়োগে ডিসির প্রতিনিধি থাকলে নিয়োগপ্রক্রিয়া অধিকতর স্বচ্ছ, ফলপ্রসূ ও গ্রহণযোগ্য হবে। এ ছাড়া পিআরবি ও ১৯৪৩ সালের পরিদর্শক ও এর নিচের পদমর্যাদার পুলিশ সদস্যের সক্ষমতা ও পারফরম্যান্স দেখার দায়িত্ব জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের এখতিয়ারভুক্ত। একই ব্যাখ্যা তুলে ধরে প্রস্তাব করেছেন মানিকগঞ্জের ডিসি ড. মনোয়ার হোসেন মোল্লা।
ডিসির অধীনে বিভিন্ন বাহিনীর সমন্বয়ে ১০ থেকে ১৫ জনের একটি বিশেষ ডিটেক্টিভ ফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন মাগুরার ডিসি অহিদুল ইসলাম। তিনি বলেন, এ ধরনের ফোর্স থাকলে অবৈধ উচ্ছেদ অভিযান, মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ ঝুঁকিপূর্ণ কাজে সুরক্ষা পাওয়া যাবে। এ ধরনের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে বিদ্যমান বিভিন্ন বাহিনীর সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে প্রস্তুতি নিতে সময়ক্ষেপণ হয়।
তিনি অপরাধ ডেটাবেইস ও এনআইডি ডেটাবেইস সার্ভারে ডিসি ও ইউএনওদের প্রবেশাধিকারের প্রস্তাব করেছেন। কারণ হিসেবে বলেছেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে আইন-শৃঙ্খলাসংক্রান্ত কমিটির সভাপতি ডিসি ও ইউএনওরা। তাঁদের এ ক্ষমতা দেওয়া হলে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
ইউএনওদের বাসভবন ও শারীরিক নিরাপত্তায় অঙ্গীভুত আনসারের বদলে সার্বক্ষণিক ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্য নিয়োগের প্রস্তাব করেছেন মাগুরার ডিসি।
উপজেলার সরকারি বাসা বরাদ্দ ও ব্যবস্থাপনা কমিটি পুনর্গঠন করার প্রস্তাব করেছেন পিরোজপুরের ডিসি মোহাম্মদ আশরাফুল আলম খান। তিনি বলেছেন, বর্তমানে সরকারি বাসা বরাদ্দ কমিটির সভাপতি উপজেলা চেয়ারম্যান ও সদস্যসচিব উপজেলা প্রকৌশলী। উপজেলায় বিদ্যমান সরকারি বাসা-বাড়ি ও ভবনাদি ব্যবস্থাপনা টেকসইভাবে কার্যকর করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দিলে কার্যক্রম বেগবান হবে।
এ ছাড়া জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট কিছু প্রস্তাবও দিয়েছেন অনেক ডিসি। পুলিশের হাতে চায়নিজ রাইফেল, সাব-মেশিনগান (এসএমজি), ৯ এমএম পিস্তলের মতো প্রাণঘাতী অস্ত্র না রাখার প্রস্তাব দিয়েছেন সিলেটের ডিসি মোহাম্মদ শের মাহবুব মুরাদ। তিনি বলেন, জনবিশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্র ও ছররা গুলি নিষিদ্ধ করা প্রয়োজন। জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, ছররা গুলিও মানবদেহে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী কর্তব্যরত অবস্থায় বাধ্যতামূলকভাবে তাদের বডি ক্যামেরা ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রস্তাব দিয়েছেন সিলেটের ডিসি। এ ছাড়া সার্কিট হাউস, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, পুলিশ সুপারের কার্যালয় ও ডিসির বাসভবনকে কেপিআই (কী পয়েন্ট ইনস্টলেশন) ঘোষণা করা এবং সে অনুযায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং বগুড়ায় সিটি করপোরেশন করা ও উড়োজাহাজের বাণিজ্যিক ফ্লাইট চালুর সুপারিশ করেছেন সেখানকার ডিসি হোসনা আফরোজা।