নাছির উদ্দিন শোয়েব : র্যাপিড আ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল বহুদিন আগে থেকে। বিশেষ করে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত সাড়ে ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড বা ক্রসফায়ার, বিরোধী নেতা-কর্মীদের গুম, বিরোধী মত দমনে নৃশংসতা, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়সহ গুরুতর অভিযোগ আছে র্যাবের বিরুদ্ধে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবসহ বাহিনীটির সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। তবে এই বাহিনীর (র্যাব) ওপর সবচেয়ে বড় অভিযোগ আসে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় হেলিকপ্টার দিয়ে নির্বিচারে গুলী চালানোর ঘটনায়।
আর এ বিষয়টি সামনে এসেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদনে। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশনের প্রতিবেদনে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র্যাব) বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এই সুপারিশ জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশন (ওএইচসিএইচআর) ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর করা হয়। এদিকে এ প্রতিবেদনকে স্বাগত জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। প্রতিবেদনে র্যাবের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বলা হয়, ‘র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নকে বিলুপ্ত করুন এবং গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে জড়িত নয় এমন কর্মীদের স্ব স্ব ইউনিটে ফিরিয়ে দিন।’ এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের জানান, সরকার জাতিসংঘের এই সুপারিশকে স্বাগত জানিয়েছে, তবে এটি নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এছাড়া গত ১২ ডিসেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনে র্যাব মহাপরিচালক (পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক) এ কে এম শহিদুর রহমান বলেছেন, র্যাবের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ রয়েছে, বিশেষত গুম এবং খুনের। যারা র্যাবের দ্বারা নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন তাদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এসবের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার নিশ্চিত করা হবে। ভবিষ্যতে এ বাহিনী কোনো অনৈতিক কার্যক্রমে জড়াবে না। তিনি আরও বলেন, র্যাব বিলুপ্তির বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নেবে, তা মেনে নেওয়া হবে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা গণঅভ্যুত্থানের সময় র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে গুলীবর্ষণের প্রমাণ পেয়েছে বলে জানিয়েছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি জানান, এ ঘটনায় র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে ‘কমান্ড রেসপন্সিবিলিটি’র অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগে এক আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন ট্রাইব্যুনাল। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই পরোয়ানা জারি করেন। ট্রাইব্যুনালের দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারপতি মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী। ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন মঞ্জুর করার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জানান, গণঅভ্যুত্থানে হেলিকপ্টার থেকে গুলী করার প্রমাণ পেয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। এই মূল কাজটা করেছেন র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হারুন অর রশিদ। তাজুল ইসলাম বলেন, সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আবেদন করে চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়। ট্রাইব্যুনাল সেই আবেদন মঞ্জুর করেন এবং আগামী ২৩ মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেন। হারুন অর রশিদ এখন কোথায় আছেন, তা জানে না চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়। তাজুল ইসলাম বলেন, ছাত্র-জনতাকে গুলী করে হত্যা, নির্যাতন করা এবং হেলিকপ্টার ব্যবহার করে ছাত্র-জনতাকে নির্মূল করার পরিকল্পনা ও এর বাস্তবায়ন করেছিলেন হারুন অর রশিদ। তার অধীন কর্মকর্তারাও এতে জড়িত ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের সময় আটক করা, নির্যাতন করার অভিযোগও আনা হয়েছে হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে।
গত বুধবার জাতিসংঘের মানবাধিকার কার্যালয় বাংলাদেশে জুলাই অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন সংক্রান্ত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং প্রতিবেদনে র্যাব ও টেলিযোগাযোগ নজরদারির জাতীয় সংস্থা ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) বিলুপ্তির সুপারিশের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) কর্মকাণ্ড সীমিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। জাতিসংঘের অনুসন্ধান দলটি জবাবদিহি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত এবং সমস্যার মূল উৎস খুঁজে বের করতে ৫০টির মতো সুপারিশ করেছে। সুপারিশে বলা হয়েছে, নিরপেক্ষভাবে কার্যকর, পক্ষপাতহীনতার সঙ্গে সব বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের ঘটনার তদন্ত করতে হবে। র্যাব ও এনটিএমসিকে বিলুপ্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এনটিএমসিকে বিলুপ্ত করার সুপারিশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থাটি নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা খর্ব করেছে। অন্য সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে বাহিনীর কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ না থাকলে নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠানো; বিজিবি, ডিজিএফআইসহ গোয়েন্দা সংস্থার আইনি ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরা; আনসার, বিজিবিকে সামরিক বাহিনী থেকে মুক্ত রাখা; অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে সামরিক বাহিনী অভ্যন্তরীণ যেকোনো পরিস্থিতিতে কতটা সময় কাজ করবে এবং মাঠে থাকবে, তা নিশ্চিত করা। জনতার বিরোধিতার মুখে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে সাবেক সরকার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নৃশংসতা চালিয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নৃশংস প্রতিক্রিয়া ছিল সাবেক সরকারের একটি পরিকল্পিত এবং সমন্বিত কৌশল, যা জনতার বিরোধিতার মুখে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে করা হয়েছিল।
অন্যদিকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে তিন বছর আগে ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র্যাবের তখনকার সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে পৃথকভাবে এ নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (রাজস্ব বিভাগ) ও পররাষ্ট্র দপ্তর। নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে র্যাবের তখনকার সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ, তখনকার র্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) ও পরবর্তীতে পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন (বর্তমানে কারাগারে), সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) তোফায়েল মোস্তাফা সরোয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) মো. আনোয়ার লতিফ খানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয় মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর পৃথক এক ঘোষণায় বেনজীর আহমেদ এবং র্যাব-৭ এর সাবেক অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দীন আহমেদের ওপর সে দেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেয়। ২০১৮ সালের মে মাসে কক্সবাজারের টেকনাফে পৌর কাউন্সিলর একরামুল হককে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে সম্পৃক্ততার জন্য এ দুজনের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের রাজস্ব বিভাগের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারের মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অংশ হিসেবে র্যাবের যে কার্যক্রম, তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। এ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও আইনের শাসনের প্রতি অবজ্ঞা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থ ও বাংলাদেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতিকে হুমকির মুখে ফেলছে। মার্কিন দপ্তরটি উল্লেখ করেছে, র্যাব ২০০৪ সালে গঠিত হয়। এর সদস্য হন পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী ও বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) থেকে আসা সদস্যরা।