গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ ‘ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬’ নিয়ে মেতে উঠলো সারাবিশ্ব। বৃহস্পতিবার মেক্সিকোর ঐতিহাসিক ‘এস্তাদিও অ্যাজতেকা’ স্টেডিয়াম বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য এবং আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে রইলো। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ দিয়ে বল গড়িয়েছে মাঠে । বল মাঠে গড়ানোর আগে বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ১১ টায় শুরু হয় জমকালো উদ্বোধন অনুষ্ঠান। মেক্সিকোর উদ্বোধনের প্রধান আকর্ষণ ছিল শাকিরা। তিনি নাইজেরিয়ার বার্না রয়কে সাথে নিয়ে এবারের আসরের অফিসিয়াল থিম সং ‘দাই দাই’-এর পরিবেশনায় সবাইকে মুগ্ধ করেছেন। জে বালভিন, আলেজান্দ্রো ফার্নান্দেজ, বেলিন্ডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার জনপ্রিয় শিল্পী টাইলাও দুর্দান্ত ছিলেন। পুরো আয়োজনে মেক্সিকো ইতিহাস আর ঐতিহ্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে। এই কাজে তারা সফল।
ফিফার পরিকল্পনা অনুযায়ী, আরও দুই আয়োজক দেশ কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রেও হবে পৃথক উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। প্রতিটি অনুষ্ঠানের সূচনা হবে স্বাগতিক দেশের প্রথম ম্যাচের ৯০ মিনিট আগে। সংগীত, সংস্কৃতি এবং ফুটবলের সমন্বয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রতিটি দেশের নিজস্ব পরিচয় যেমন তুলে ধরা হবে, তেমনি উদযাপন করা হবে বিশ্বকাপের বৈশ্বিক ঐক্যও। মেক্সিকোর পর্ব শেষে আজ শুক্রবার রাত ১১টা ৩০ মিনিটে কানাডার টরন্টোর বিএমও ফিল্ড স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে দ্বিতীয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। তৃতীয় ও শেষ উদ্বোধনী আয়োজন হবে আগামীকাল শনিবার (১৩ জুন) বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টা ৩০ মিনিটে লস অ্যাঞ্জেলেসের সোফাই স্টেডিয়ামে।
পেলে ও ম্যারাডোনা
বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের এক অনন্য এবং আবেগঘন মুহূর্তের সাক্ষীও হয়ে রইলো মেক্সিকোর ঐতিহাসিক ‘এস্তাদিও অ্যাজতেকা’ স্টেডিয়াম। বিশ্বের প্রথম স্টেডিয়াম হিসেবে ৩টি বিশ্বকাপ আসর আয়োজনের গৌরবময় রেকর্ড গড়েছে এই ভেন্যুটি। আর এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ফুটবলের দুই প্রয়াত কিংবদন্তি পেলে এবং দিয়েগো ম্যারাডোনাকে বিশেষ শ্রদ্ধাঞ্জলি জানানো হয়।
ফুটবলবিশ্বে মেক্সিকোর এস্তাদিও অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামটি একটি জীবন্ত উপাখ্যান। এর আগে ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপের রোমাঞ্চকর সব ম্যাচ আয়োজন করেছিল এই মাঠ। এবার ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে ম্যাচ আয়োজনের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের প্রথম ভেন্যু হিসেবে ৩টি বিশ্বকাপ আয়োজনের ‘হ্যাটট্রিক’ রেকর্ড নিজেদের করে নিয়েছে অ্যাজতেকা।
এই স্টেডিয়ামের সাথে জড়িয়ে আছে ফুটবল ইতিহাসের দুই চিরস্মরণীয় মহাতারকার নাম। কাকতালীয়ভাবে, পেলে এবং ম্যারাডোনা উভয়েই তাদের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় বিশ্বকাপটি জয় করেছিলেন এই একই মাঠে।
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপে পেলের নেতৃত্বাধীন ব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম সেরা দলটি এই এস্তাদিও অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামেই ইতালিকে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত করে বিশ্বজয় করেছিল। এটি ছিল পেলের ক্যারিয়ারের তৃতীয় ও শেষ বিশ্বকাপ ট্রফি।
আর ১৯৮৬ সালে এই মাঠেই একক নৈপুণ্যে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো ম্যারাডোনা। কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং পরবর্তীতে মাঝমাঠ থেকে একক দৌড়ে করা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’Ñসবেরই সাক্ষী এই অ্যাজটেকা।
ফুটবলের এই দুই রাজপুত্র আজ আর আমাদের মাঝে বেঁচে নেই। ম্যারাডোনা ২০২০ সালে এবং পেলে ২০২২ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন। তবে ফুটবল বিশ্বে তাদের অবদান চিরভাস্বর। যে মাঠে দাঁড়িয়ে তারা বিশ্বজয়ের উল্লাস করেছিলেন, সেই মাঠেই বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই শ্রদ্ধাঞ্জলি শুধু একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং ফুটবল ইতিহাসের দুই শ্রেষ্ঠ সন্তানের প্রতি পুরো ক্রীড়াবিশ্বের ভালোবাসার এক অনন্য বহিঃপ্রকাশ। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই এই বিশেষ আয়োজন ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে এক অন্যরকম আবেগের আবহ তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে বিশ্বকাপ নিয়ে শুরু হয়ে গেছে বিশ্বব্যাপী উন্মাদনা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়, পাড়া-মহল্লায় পতাকা ওড়ানো থেকে শুরু করে কোন দল সেরাÑতা নিয়ে চলছে তর্ক-বিতর্ক। অনেকেই রীতিমতো পার্টির আয়োজন করে খেলা দেখার পরিকল্পনা করছেন, খেলা দেখার সময় কী কী খাবেন ভাবছেন। গভীর রাতে কিংবা ভোরে যেসব ম্যাচ হবে সেগুলো দেখার প্রস্তুতি কেমন হবে, তার চিন্তা করছেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে (বিটিভি) সবগুলো খেলা সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। পাশাপাশি টি-স্পোর্টস ও সময় টিভিও সরাসরি প্রচার করবে সবগুলো খেলা।
উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে হবে প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের অংশগ্রহণে বিশ্বকাপ মহোৎসব। ফুটবল শৈলী, নান্দনিকতা, ড্রিবলিং আর দারুণ কিছু গোলে মেতে থাকবে সারাবিশ্ব। কেউ জিতবে আবার কেউ হারবে। এভাবেই এগিয়ে যাবে লড়াই। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার মোট ১৬টি ভেন্যুতে চলবে ফুটবলের এই বিশ্ব আসর। গ্রুপ পর্বের পর ৪৮ দলের লড়াই নেমে আসবে ৩২ এ। এরপর ধাপে ধাপে ১৬ দলে নেমে আসবে খেলা। প্রি কোয়ার্টারের পর কোয়ার্টারের ৮ দল থাকবে শিরোপা যুদ্ধে। সেখান থেকে ৪ দল যাবে সেমিফাইনালে। দুই দলের লড়াই হবে ফাইনালে। আগামী ১৯ জুলাই ৩৯ দিনের ১০৪ ম্যাচের রাত-দিনের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ফয়সালা হবে শিরোপা জয়ের মধ্য দিয়ে।