মেক্সিকো সিটির ঐতিহাসিক আজতেকা স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচেই দেখা গেল নাটকীয়তা। তিনটি লাল কার্ড, দুই দলের ভিন্নমুখী পারফরম্যান্স এবং স্বাগতিকদের দাপুটে ফুটবলে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ২-০ গোলে হারিয়ে দারুণ সূচনা করেছে স্বাগতিক মেক্সিকো। ঘটনাবহুল ম্যাচে বিশ্বকাপের মঞ্চে পা রাখতেই ফুটবল ইতিহাসের পাতায় নিজের নাম লেখালেন মেক্সিকোর তরুণ মিডফিল্ডার গিলবার্তো মোরা। ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে তিনি মেক্সিকোর বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হওয়ার অনন্য কীর্তি গড়েছেন। একই সঙ্গে তিনি চূর্ণ করেছেন ৯৬ বছর ধরে অক্ষত থাকা এক ঐতিহাসিক রেকর্ড।
ম্যাচের ৬৬তম মিনিটে যখন আলভারো ফিদালগোর পরিবর্তে কোচ গিলবার্তো মোরাকে মাঠে নামান, তখন এই তরুণ মিডফিল্ডারের বয়স ছিল ঠিক ১৭ বছর ২৪০ দিন। মাঠে নামার সাথে সাথেই তিনি ভেঙ্গে দেন ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপে গড়া মেক্সিকান ডিফেন্ডার মানুয়েল রোসাসের রেকর্ড। রোসাস ১৮ বছর ৮৭ দিন বয়সে বিশ্বকাপে খেলে মেক্সিকোর সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হওয়ার রেকর্ডটি এতো বছর ধরে নিজের দখলে রেখেছিলেন। প্রায় এক শতাব্দী পর রোসাসের সেই রেকর্ড ভেঙ্গে নতুন ইতিহাস লিখলেন মোরা।
শুধু মেক্সিকোর ইতিহাসেই নয়,বিশ্বকাপের সামগ্রিক ইতিহাসেও কনিষ্ঠতম ফুটবলারদের তালিকায় বেশ ওপরের দিকেই জায়গা করে নিয়েছেন এই তরুণ তুর্কি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে অভিষেক হওয়া খেলোয়াড়দের তালিকায় মোরা এখন যৌথভাবে ষষ্ঠ স্থানে রয়েছেন।
বৃহস্পতিবার রাতে মেক্সিকো সিটির অ্যাজতেকা স্টেডিয়ামে স্বাগতিকরা জিতেছে ২-০ গোলে। কানায় কানায় পূর্ণ ৮০ হাজারের বেশি দর্শক ধারণ ক্ষমতার গ্যালারির সামনে ম্যাচের দুই অর্ধে একবার করে লক্ষ্যভেদের উল্লাস করে তারা। হুলিয়ান কিনিয়োনোনেস নবম মিনিটে দলকে এগিয়ে দেওয়ার পর ৬৭তম মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন অভিজ্ঞ তারকা স্ট্রাইকার রাউল হিমেনেজ।
কোনো দলই পুরো ১১ জন নিয়ে ম্যাচ শেষ করতে পারেনি।
দ্বিতীয়ার্ধে রেফারি উইলতন সাম্পাইও দেখান তিনটি সরাসরি লাল কার্ডÑ দুটি দক্ষিণ আফ্রিকাকে ও একটি মেক্সিকোকে। ৪৯তম মিনিটে স্ফেফেলো সিথোলে ও ৮৪তম মিনিটে থেম্বা জোয়েন মাঠ ছাড়লে নয় জনের দলে পরিণত হয় দক্ষিণ আফ্রিকা। এরপর যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে সেজার মন্তেস লাল কার্ড দেখলে মেক্সিকো নেমে আসে ১০ জনের দলে।
সর্বশেষ ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে মাত্র চারটি লাল কার্ড দেখানো হয়েছিল। আর এর আগে টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী ম্যাচে কখনোই তিনটি লাল কার্ড দেখানো হয়নি। এসব নাটকীয় ঘটনার অনেক আগেই মেক্সিকো দল তাদের সমর্থকদের আনন্দে ভাসায়। ম্যাচের মাত্র নবম মিনিটের মাথায় তারা প্রথম গোলটি করে। ডি-বক্সের সামনে দক্ষিণ আফ্রিকার মিডফিল্ডার সিথোলের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ট্যাকল করেন এরিক লিরা। বল গিয়ে পড়ে কিনিয়োনেসের সামনে। তার জোরালো শট গোলরক্ষক রনওয়েন উইলিয়ামসের দুই পায়ের ফাঁক দিয়ে জালে জড়ায়।
বিরতির ঠিক আগে কিনিয়োনেস ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু ১২ গজ দূর থেকে নেওয়া তার শটটি ডান পাশের পোস্টের নিচের দিকে লেগে ফিরে আসে। দ্বিতীয়ার্ধের চতুর্থ মিনিটে সিথোলে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। গোল করার উদ্দেশ্যে এগিয়ে যাওয়া ব্রায়ান গুতিয়েরেজকে তিনি ফাউল করে ফেলে দিয়েছিলেন। একজন খেলোয়াড় বেশি থাকায় আয়োজক মেক্সিকোর কাজ অনেক সহজ হয়ে যায়।
১৭ বছর ২৪০ দিন বয়সী তরুণ মিডফিল্ডার গিলবার্তো মোরা এই টুর্নামেন্টের কনিষ্ঠতম খেলোয়াড়। ম্যাচের ৬৬ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে তিনি এক নতুন কীর্তি গড়েন। তিনি মেক্সিকোর ইতিহাসে বিশ্বকাপে খেলা সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড়ে পরিণত হন। দেশটির হয়ে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে বিশ্বকাপে খেলার রেকর্ড দীর্ঘ ৯৬ বছর ধরে ছিল মানুয়েল রোসাসের। ১৯৩০ সালে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপে তিনি মাঠে নেমেছিলেন ১৮ বছর ৮৭ দিন বয়সে।
পরের মিনিটেই ৩৫ বছর বয়সী হিমেনেজ মেক্সিকোর জয় অনেকটা নিশ্চিত করে ফেলেন। রবার্তো আলভারাদোর ক্রস থেকে দূরের পোস্টে জোরালো হেডে তিনি জাল কাঁপান। বিশ্বকাপের মঞ্চে নিজের প্রথম গোল করার আবেগঘন মুহূর্তে তার চোখে পানিও চলে এসেছিল। ২০১০ সালে বিশ্বকাপ আয়োজন করার পর এবারই প্রথম দক্ষিণ আফ্রিকা মূল পর্বে খেলার সুযোগ পেয়েছে। তবে উপলক্ষটি রাঙাতে না পেরে তাদের ম্যাচটি শেষ করতে হয় নয় জন খেলোয়াড় নিয়ে। বদলি খেলোয়াড় জোয়েনকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। আলভারাদোর মুখে আঘাত করায় তাকে এই শাস্তি দেওয়া হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকা আক্রমণে তেমন কোনো চাপ তৈরি করতে পারেনি। পুরো ম্যাচে বল দখলে মেক্সিকোর আধিপত্য ছিল স্পষ্ট, ৬১ শতাংশ বল ছিল তাদের নিয়ন্ত্রণে, বিপরীতে দক্ষিণ আফ্রিকার দখলে ছিল ৩৯ শতাংশ। শট নেয়ার ক্ষেত্রেও ব্যবধান ছিল বড়, মেক্সিকো নেয় ১৫টি শট যার মধ্যে ৫টি ছিল লক্ষ্যে, আর দক্ষিণ আফ্রিকার ৪টি শটের মধ্যে ৩টি ছিল অন টার্গেটে। ম্যাচের শেষদিকে মেক্সিকোও একটি লাল কার্ড পায়। কারণ, ডি-বক্সের বাইরে মন্তেস ফাউল করে বসেন খুলিসো মাদাওকে। তবে শেষ বাঁশি পর্যন্ত হাভিয়ের আগুইরের শিষ্যরা তাদের দুই গোলের ব্যবধান ধরে রেখে আনন্দে মেতে উঠে,সমর্থকদের মাতিয়ে তোলে।