মোঃ কায়সার হামিদ (জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাবেক ফুটবলার)
২০২২ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে চলতি আসরের মরক্কো আর ফ্রান্সের কোয়ার্টার ফাইনালে। সেই ২-০ ব্যবধানে মরক্কোকে হারিয়ে সেমিতে উঠে গেছে ফ্রান্স। শক্তি আর সামর্থ্যে এগিয়ে থাকা ফ্রান্স যোগ্য দল হিসেবে জিতেছে। ফ্রান্স না হয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে প্রতিপক্ষ হিসেবে সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম কিংবা নরওয়েকে পেলেও হয়ত সেমিফাইনালে দেখতে পাওয়া যেতো অ্যাটলাস সিংহদের। মরক্কোর খেলোয়াড়রা তো আফ্রিকার সিংহই। ২০১৮ সালে ফিফা র্যাংকিংয়ের ৪১ নম্বরে থেকে বিশ্বকাপে গ্রুপপর্ব পেরুতে পারেনি। ২০২২ বিশ্বকাপে তারাই র্যাংকিংয়ের ২২তম দল হয়ে খেলে বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিতে খেলে। বর্তমানে তাদের র্যাংকিং ৬। মরক্কোর এই উন্নতি একদিনে হয় নি। একটি গোল্ডেন জেনারেশন মরক্কোর পুরো ফুটবলের চিত্র বদলে দিয়েছে। আশরাফ হাকিমি, ব্রাহিল দিয়াজ, ইসমাইল সাইবারিরা খেলেন ইউরোপের শীর্ষ লিগের জায়ান্ট ক্লাবে। তারা পরিপক্ব হয়েই মরক্কো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়েছেন। গোলরক্ষক ইয়াসিন বুনুর জন্ম কানাডায়। আশরাফ হাকিমি আর ইসমাইল সাইবারি স্পেন, ইসা দিওপের জন্ম আর বেড়ে ওঠা ফ্রান্সে। জন্মসূত্রে তাদের ভিন্ন দেশের জাতীয় দলে খেলার সুযোগ ছিল। কিন্তু মরক্কোর ফুটবল কর্তারা সবাইকে আফ্রিকান দেশটিতে খেলার জন্য একাট্টা করতে পেরেছেন। এটা মরক্কোর ফুটবল কর্তাদের দূরদর্শিতা আর কৃতিত্ব।
এখন ফুটবল খেলা পুরোপুরি বৈশ্বিক। শুধুমাত্র লোকাল খেলোয়াড়দের নিয়ে ফুটবলে উন্নতি করা সম্ভব না। ফ্রান্স, স্পেন, বেলজিয়াম, জার্মানির মতো দলে ভিন্ন রক্তধারার ফুটবলার খেলছে। তাদের নিজেদের কি দেশীয় খেলোয়াড় নেই? আছে। তবু তারা ভিন্ন দেশের খেলোয়াড়দের নাগরিকত্ব দিয়ে খেলাচ্ছে জাতীয় দলে। লামিনে ইয়ামালের কথাই ধরা যাক। তার জন্ম স্পেনে। কিন্তু মা ইকুয়েটোরিয়াল গিনি আর বাবা মরক্কোর। তাকে পাওয়ার জন্য গিনি আর মরক্কোর সাথে লড়তে হয়েছে স্পেনকে। লা রোজাদের নিজেদের প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের অভাব নেই। কিন্তু তারা মনে করেছে, ইয়ামাল স্পেনের জন্য উপযুক্ত খেলোয়াড়। তাই তারা গিনি আর মরক্কোর সাথে আইনি লড়াই করে বার্সার তরুণ উইঙ্গারকে দলে ভিড়িয়েছে। আমাদের দেশের বহু প্রতিভাবান ফুটবলার খেলছেন বিদেশের ঘরোয়া লিগে। জামাল ভুঁইয়া, শমিত সোম আর হামজাদের ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছে। বাংলাদেশের উচিত বিদেশে জন্ম নেয়া আর খেলা ফুটবলারদের প্রতি সিরিয়াস হওয়া। দেশীয় খেলোয়াড়দের সাথে ‘প্রবাসী’ বাংলাদেশীদের নিয়ে শক্তিশালী দল গঠন করতে পারলে আমাদের দলটাও এশিয়ায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে। এই বিষয়ে কোন গোঁড়ামি কাম্য না।
ফ্রান্সের বিপক্ষে মরক্কোকে চেনা ছন্দে পাওয়া যায় নি। হয়ত ফ্রান্সের মতো বড় দলের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভুগেছে! শুরুতে পেনাল্টি মিস করলেও কিলিয়ান এমবাপ্পে অসাধারণ এক গোলে দলকে লিড এনে দেন। দ্বিতীয় গোল উসমান দেম্বেলে। বিশ্বকাপ ফুটবল সব সময়েই বড় খেলোয়াড়দের জন্য পেনাল্টি শটের ক্ষেত্রে কঠিন পরীক্ষা নেয়। জিকো, মিঁশেল প্লাতিনি, সক্রেটিস, ড্রাগন স্তয়কোভিচ, হ্যারি কেইন, রবার্ট লেভেন্ডস্কি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর মতো মহান খেলোয়াড়রা পেনাল্টি মিস করেছেন। লিওনেল মেসি তো বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ পেনাল্টি মিসের রেকর্ড গড়ে বসে আছেন। চলতি বিশ্বকাপেই নরওয়ের বিপক্ষে শুরুতে পেনাল্টি মিস করে ব্রাজিলের মধ্যমাঠের নিউক্লিয়াস ব্রুনো গুইমারেস দলের বিদায়ে ভূমিকা রেখেছেন। ইতিহাসের সেরাদের একজন হয়েও ইতালির রবার্টো ব্যাজ্জিও ১৯৯৪ সালের ফাইনালের টাইব্রেকারে শট মিস করে পুরো দেশকে কান্নায় ভাসিয়েছেন। এ যেন নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস।
কিলিয়ান এমবাপ্পে পেনাল্টি মিসের পর ৬০ মিনিটে যে গোল করলেন, সেটা চলতি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা গোল। আট গোল নিয়ে তিনি এখন মেসির সমান্তরালে। বিশ্বকাপ ইতিহাসে মেসির (২১) পরেই সর্বোচ্চ গোল তার (২০)। গোল্ডেন-বুটের লড়াইয়ের সাথে তাদের মধ্যেই ভাগাভাগি হবে ‘গোল্ডেন বল’ অনুমান করা যায়। ফ্রান্সকে অভিনন্দন প্রথম দল হিসেবে ২০২৬ সালের বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নাম লেখানোর জন্য। মরক্কোকে ধন্যবাদ আফ্রিকান ফুটবলকে বিশ্ব দরবারে উঁচু অবস্থানে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
১১ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত একটায় স্পেনের মুখোমুখি হবে বেলজিয়াম। দুই ইউরোপিয়ান প্রতিপক্ষের লড়াই জমজমাট হওয়ার আশা করছি। স্পেন আর বেলজিয়াম কোন একক খেলোয়াড়নির্ভর দল না। স্পেনের আছে ইয়ামাল, কুকুরেয়া, ওলমো, পেবদ্রি, রদ্রি, লাপোর্তেদের নিয়ে দলটার টিম ওয়ার্ক দারুণ। সমস্যা একটাই, অতিরিক্ত পাস খেলার প্রবণতা। পুরনো টিকিটাকার অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না স্পেন। অন্যদিকে, কেভিন ডি ব্রুইন, রুমেলু লুকাকুদের মতো অভিজ্ঞদের বেলজিয়াম ব্যবহার করছে রয়েশয়ে।
কেতেলায়েরে, তিয়েলেমান্স, রাসকিনদের মতো তুলনামুলক তরুণদের কাজে লাগাচ্ছে কোচ রুদি গার্সিয়া। তিনি সোনালি প্রজন্মের নামী খেলোয়াড়দের খ্যাতির চেয়ে তরুণদের বর্তমান ফর্মকে মূল্যায়ন করছেন। গার্সিয়ার সিদ্ধান্তকে স্যালুট না জানিয়ে উপায় নেই। পর্তুগালের রবার্টো মার্টিনেজ যা পারেন নি, গার্সিয়া সেটা করে দেখাচ্ছেন। যাই হোক , বেলজিয়াম আর স্পেনের ম্যাচে কে জিতবে বলা মুশকিল। ম্যাচটি টাইব্রেকারে গড়ালেও অবাক হব না। আমার দৃষ্টিতে কাগজে কলমে স্পেন এগিয়ে। কিন্তু জয়ের সম্ভাবনা দুই দলের সমান।