শনিবার ১১ জুলাই ২০২০
Online Edition

সুপ্রিম কোর্টের সংকট নিরসনে সমঝোতা

নাজমুল আহমান রাজু : অবশেষে বরফ গলেছে। সুপ্রিম কোর্টের উদ্ভূত পরিস্থিতি ও সংকট নিরসনে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন ও এটর্নি জেনারেল সমঝোতার দিকে এগুচ্ছেন। সমঝোতার জন্য সুপ্রিম কোর্ট বারের উদ্যোগ এবং এটর্নি জেনারেলের একগুয়েমির কারণে যে সমঝোতা ভেস্তে যেতে বসেছিল তা এখন সমাধানের পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংকটের সমাধানে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সঙ্গে আলোচনা করেছেন সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন ও সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল। প্রধান বিচারপতির আহবানে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নমনীয় ভূমিকায় একটি সিদ্ধান্তে এসেছে।

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গ্রেফতার না হওয়া আইনজীবীরা আগামী রোববার নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। সেখান থেকে ১৩ আইনজীবী একইদিনে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি গোবিন্দ চন্দ্র ঠাকুর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে আদালত অবমাননার রুলের বিষয়ে ক্ষমা চাইবেন। গত ২ আগস্ট ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতী ফজলুল হক আমিনীর বিরুদ্ধে করা মামলার শুনানিতে এই বেঞ্চেই হট্টগোল ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছিলো। হাইকোর্ট বেঞ্চ বিরোধীদ দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুললে বিএনপি সমর্থক ও সরকার সমর্থক আইনজীবীরা হাতাহাতিতে জড়িয়ে পড়েন। এই ঘটনায় ১৩ আইনজীবীর বিরুদ্ধে পুলিশের মামলা দায়ের, আদালত অবমাননার রুল জারি এবং তাদের আইন পেশার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির ঘটনায় সংকট দেখা দেয়।

এটর্নি জেনারেলের পক্ষ থেকে বার নেতাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে, আইনজীবীরা আত্মসমর্পণ করলে তাদের রিমান্ড চাওয়া হবে না। তাদের নির্যাতন করা হবে না। তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে কোন মামলা দায়ের করা হবে না। এর প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন ও সম্পাদক ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদলসহ জ্যেষ্ঠ আইনজীবীরা আপাতত এ প্রস্তাব মেনে নিয়েছেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার ১৩ আইনজীবীকে পেশা থেকে বিরত থাকতে হাইকোর্টের দেয়া আদেশ স্থগিত রাখতে তাদের দায়ের করা আবেদনের ওপর শুনানির দিন ধার্য থাকায় সকালেই আপিল বিভাগে হাজির হন দু'পক্ষের আইনজীবীরা। সকাল ১০টা ১০ মিনিটের দিকে প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমকে বলেন, সিনিয়র চার আইনজীবী বসে আপনারা সমস্যার সমাধান করেন। তারা (১৩ আইনজীবী) হাইকোর্টে ক্ষমা চাইতে পারেন। যারা কারাগারে আছে তাদের হাজির করার ক্ষেত্রে এটর্নি জেনারেল ব্যবস্থা করবেন। এ সময় ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেন, আপনারা (আপিল বিভাগ) আগুনে তেল না দিয়ে পানি দেন। শুধু যে আমাদের দায়িত্ব আছে তা নয়, আপনাদেরও দায়িত্ব আছে। এ অবস্থায় আপিল বিভাগ আবেদনটি বেলা ১২টা পর্যন্ত স্ট্যান্ডওভার (মুলতবি) করেন।

এর মধ্যে ১১টায় বিচারপতিরা এজলাস কক্ষ ত্যাগ করার পর প্রধান বিচারপতির এজলাস কক্ষতেই এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের সঙ্গে এক দফা আলোচনা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক। পরে বার ভবনে আবার এটর্নি জেনারেল সঙ্গে আলোচনা করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন ও ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল। ১২টার দিকে বিরতি শেষে বিচারপতিরা এজলাসে আসার পর ব্যারিস্টার রফিক-উল হক ও খন্দকার মাহবুব হোসেন আদালতকে জানান, সংকটের সমাধানে আলোচনা চলছে। এ অবস্থায় বিষয়টি স্ট্যান্ডওভার রাখা হোক। তখন আদালত রোববার (১৪ আগস্ট) পর্যন্ত ১৩ আইনজীবীর দায়ের করা আবেদনটি স্ট্যান্ডওভার রাখেন।

পরে বার ভবনে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন খন্দকার মাহবুব হোসেন। খন্দকার মাহবুব বলেন, এটর্নি জেনারেল এখন অনেক নমনীয়। আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ। রোববার গ্রেফতার না হওয়া আইনজীবীরা ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আত্মসমর্পণ করবেন। এটর্নি জেনারেল আমাদের আশ্বস্ত করেছেন আত্মসমর্পণের পর তাদের রিমান্ড আবেদন বা নির্যাতন করা হবে না। তাদেরকে নতুন কোন মামলায়ও জড়ানো হবে না। ওই দিনই আইনজীবীরা হাইকোর্টে এসে আবেদন দিবেন। আত্মসমর্পণের পর আশা করি আইনজীবীরা জামিনেও মুক্তি পাবেন। ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, আমরা অ্যাটর্নি জেনারেলকে বোঝাতে চেষ্টা করেছি যেন রোববারের আগে আর কোন আইনজীবীকে গ্রেফতার করা না হয়। অন্যদিকে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, আমার সঙ্গে বার সভাপতির কথা হয়েছে, গ্রেফতার না আইনজীবীরা নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন। এরপর তারা সেখান থেকে এসে হাইকোর্টের ওই বেঞ্চে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন। যদি তারা জামিন পান তাহলে তারা নিজেরাই হাইকোর্টে আসতে পারেন। অন্যদিকে, তারা যদি জামিন না পান তাহলে আপিল বিভাগের নির্দেশ অনুযায়ী তাদেরকে হাইকোর্টে হাজির করার ব্যাপারে আমি আইন-শৃক্মখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথা বলবো। তিনি বলেন, আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি, যারা আদালতের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন, তারা ক্ষমা না চেয়ে হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন পেতে পারেন না। তাদের নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই।

এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, তারা আমার কাছ থেকে আশস্ত হতে চেয়েছেন যেন আইনজীবীদের রিমান্ডে নেয়া না হয়, তাদের নির্যাতন না করা হয়। রাষ্ট্রের এটর্নি জেনারেল হিসেবে আমি চাইবো না কোন আইনজীবীকে নির্যাতন করা হোক। কোন আইনজীবীকে নাজেহাল করা হবে তা আমি চাই না।

এদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এম ইউ আহমেদকে গ্রেফতার ও নির্যাতনের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন। নির্যাতন প্রসঙ্গে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেছেন, অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার এম ইউ আহমেদকে গ্রেফতার করে নির্যাতন চালানো হয়েছে। তিনি এখন মৃত্যুশয্যায়। একজন আইনজীবীকে যদি এভাবে নির্যাতন করা হয় তবে সাধারণ মানুষের কী অবস্থা। আমরা দেশবাসীর কাছে এর বিচার চাই। ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। এম ইউ আহমেদকে গ্রেফতার ও নির্যাতনের প্রতিবাদে আইনজীবী সমিতি ভবনের দক্ষিণ হলে সভা করে আইনজীবী সমিতি। এতে সমিতির বিএনপিপন্থী নেতারা বক্তব্য দেন।

গত ২ আগস্ট হাইকোর্টে সরকার ও বিরোধীসমর্থক আইনজীবীদের মধ্যে হাতাহাতি ও হট্টগোলের ঘটনা ঘটে। মুফতী ফজলুল হক আমিনীর মামলায় বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার দেশপ্রেম নিয়ে আদালতের পর্যবেক্ষণ নিয়ে ওই ঘটনা ঘটে। হট্টগোলের ঘটনায় ওই দিন রাতেই শাহবাগ থানায় ১৪ বিএনপিপন্থী আইনজীবীর বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দায়ের করে। পুলিশকে হত্যা চেষ্টার অভিযোগে ৪ আগস্ট রাতে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়। এ মামলায় আসামী করা হয় নয় আইনজীবীকে। ১৩ আইনজীবী হাইকোর্টে জামিন চেয়ে আবেদন করলেও হাইকোর্টের একজন বিচারপতি এ আবেদনের শুনানিতে বিব্রতবোধ করেন। পরে প্রধান বিচারপতি আবেদনটি শুনানির জন্য বিচারপতি মোহাম্মদ আনোয়ার উল হক ও বিচারপতি একেএম জহিরুল হক সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চে পাঠান। গত বুধবার হাইকোর্ট বেঞ্চ তাদের জামিন আবেদন নাকচ করে দেন। আইনজীবীদের মধ্যে মামলার আসামী তিন জনকে এ পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে।  এদিকে ৩ আগস্ট ১৩ আইনজীবীর বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার রুল জারি করেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে তাদের পেশা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। এ নির্দেশ স্থগিত চেয়ে আপিল বিভাগে আবেদন করেন সৈয়দা আশিফা আশরাফি পাপিয়া, কামরুল ইসলাম সজল, শহিদুজ্জামান, মির্জা আল মাহমুদ, শরিফ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল্লাহ আল মাহবুব, এনামুল হোসেন গাফফার, এম ইউ আহমেদ, মোহাম্মদ মো. আশরাফুজ্জামান খান, তৌহিদুল ইসলাম, গোলাম নবী ও রেজোয়ান আহমেদ।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ